সিলেট ২৫শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৭:৪০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০২৬
কুরআনের নির্দেশনা, হাদিসের ব্যাখ্যা ও আলেমদের বিশ্লেষণ
মসজিদ ইসলামের রিসালাত-তাওহীদ ও হেদায়েতের কেন্দ্রবিন্দু, আর মিম্বার হলো আম্বিয়ায়ে কেরামের দাওয়াতের পবিত্র আমানত। নবী-রাসুলগণের রেসালাত ও আদর্শের সুবাদেই মসজিদের এই সুউচ্চ সম্মান, আর সেই মসজিদে দায়িত্ব পালন করার কারণেই একজন ইমামকে সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধার আসনে বসায়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সম্প্রতি কিছু মসজিদে কথিত কিছু দায়িত্বশীল—যাঁরা সাধারণ মানুষের নিকট ইমাম হিসেবে পরিচিত—নিজেদের সর্বোত্তম ও স্বঘোষিত জান্নাতি মনে করে নিজের পবিত্রতা জাহির করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
এমনকি ভিন্ন ধর্মের সমসাময়িক পূজা-পার্বণকে মুশরিকদের কর্মকাণ্ড হিসেবে বোঝাতে গিয়ে অত্যন্ত হঠকারী ও আত্মঘাতী মন্তব্য করে বসেছেন। নিজেদের সর্বজ্ঞ বা ‘হরফুন মওলা’ জাহির করতে গিয়ে তাঁদের অনেকেই আমাদের প্রিয়াতিপ্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানীয় পিতা-মাতা এবং মুসলিম মিল্লাতের আধ্যাত্মিক পিতা হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের পিতাকে অজুহাত বানিয়ে কুৎসিত বক্তব্য প্রদান করছেন। কুরআনের সূক্ষ্ম ভাষাগত ব্যবহার তো দূরের কথা, সাধারণ শিষ্টাচার ভুলে গিয়ে হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর চাচা ‘আজর’-কে তাঁর জন্মদাতা পিতা আখ্যা দিয়ে নবীদের পিতা-মাতাকে প্রকাশ্যে ‘কাফের-মুশরিক’ বলতেও তাঁদের জবান কাঁপে না! (নাউযুবিল্লাহ)।
একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে—“কার উসিলায় সিন্নি খাবি মনা, মোল্লাকে চিনলি না!” যে নবীদের উসিলায় আমরা দ্বীন পেলাম, মর্যাদা পেলাম, মসজিদের মিম্বারে বসে কথা বলার অধিকার পেলাম—সেই নবীগণের মর্যাদা এবং তাঁদের সম্মানিত পিতা-মাতার ব্যাপারে এমন অসম্মানজনক ও আপত্তিকর শব্দ উচ্চারণ করতে গিয়ে এসব লোকের বিবেক একবারও দংশন করে না? এই ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও দায়িত্বহীন বক্তব্য আজ আহলে হক ওলামা-মাশায়েখ, চিন্তাশীল বুদ্ধিজীবী এবং সচেতন মুসলিম নারী-পুরুষের হৃদয়ে তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
নবী-রাসুলগণ মানবজাতির হেদায়েতের জন্য মহান আল্লাহর মনোনীত ও নিষ্পাপ প্রতিনিধি। তাঁদের মর্যাদা, পারিবারিক পরিচয়, বংশধারা ও পিতা-মাতার প্রসঙ্গ আলোচনা করার সময় অন্ধ আবেগ, ব্যক্তিগত জাহিলিয়াত কিংবা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্যের পরিবর্তে কুরআন, নির্ভরযোগ্য হাদিস, আরবি ব্যাকরণ এবং সুন্নী আকাইদের স্বীকৃত মূলনীতির আলোকে বিষয়গুলো অনুধাবন করা জরুরি।
এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য হলো—কোনো মনগড়া মতবাদ নয়, বরং নবীদের পিতা-মাতার পবিত্রতা ও নাজাতের পক্ষে যেসব সুস্পষ্ট কুরআনিক ইঙ্গিত, উসূলে ফিকহ ও আকাইদের যুক্তি এবং ওলামায়ে কেরামের সুচিন্তিত ব্যাখ্যা রয়েছে, সেগুলোকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করে তথাকথিত জাহেলদের বিভ্রান্তির কড়া জবাব দেওয়া।
১. আল্লাহর মনোনীত বংশধারা: সূরা আলে ইমরানের সর্বজনীন শিক্ষা
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَىٰ آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِينَ ﴿৩৩﴾ ذُرِّيَّةً بَعْضُهَا مِنْ بَعْضٍ ﴿৩৪﴾
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আদম, নূহ, ইবরাহিমের পরিবার এবং ইমরানের পরিবারকে সমগ্র জগতের ওপর মনোনীত করেছেন। তারা পরস্পরের বংশধর।”
— (সূরা আলে ইমরান, ৩:৩৩–৩৪)
প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ ও যুক্তি:
‘ইসতিফা’ (اصطفاء)-এর তাৎপর্য: ‘ইসতিফা’ শব্দের অর্থ নিষ্কলঙ্ক করা, বেছে নেওয়া বা শ্রেষ্ঠত্ব দান করা। আয়াতে সরাসরি বলা হয়েছে যে, আল্লাহ এসব পরিবারকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের ওপর মনোনীত করেছেন।
পরম্পরাগত ধারাবাহিকতা: পরবর্তী আয়াতের ‘জুুররিয়্যাতাম বা‘জুহা মীম বা‘জ’ (তারা পরস্পরের বংশধর) বাক্যটি প্রমাণ করে যে, এই মনোনয়ন কেবল বিচ্ছিন্ন কয়েকজন ব্যক্তির জন্য ছিল না; বরং এই বংশীয় ধারাবাহিকতাটাই ছিল বিশেষ মর্যাদাপ্ত ও ঈমানি শক্তিতে উদ্ভাসিত।
যুক্তির ভিত: যদিও কোনো কোনো তাফসিরকারক এটিকে কেবল নবুওয়াতের মনোনয়ন হিসেবে দেখেন, কিন্তু সুন্নী আকাইদের আলেমদের মতে, কুফর বা শিরকের মতো চরম আত্মিক অপবিত্রতা নিয়ে গঠিত বংশধারার মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহর ‘মনোনীত’ সূচি প্রবাহিত হওয়া যুক্তিসংগত নয়। অতএব, এটি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পূর্বপুরুষদের সর্বাত্মক পবিত্রতার পক্ষে একটি মৌলিক কুরআনিক সনদ।
২. নবী ﷺ-এর বংশধারা ও ‘সাজিদীন’-এর তাফসির
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:
الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ ﴿২১৮﴾ وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ ﴿২১৯﴾
“যিনি আপনাকে দেখেন যখন আপনি দাঁড়ান, এবং সিজদাকারীদের মধ্যে আপনার স্থানান্তরও (তিনি দেখেন)।”
— (সূরা আশ-শুআরা, ২৬:২১৮–২১৯)
মুফাসসিরদের বিশ্লেষণ ও হাদিসের মানদণ্ড:
ইবনে আব্বাস (রা.)-এর তাফসির: হাদিস ও তাফসির শাস্ত্রের প্রবাদপুরুষ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন—রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নূর মোবারক এক সিজদাকারী (একত্ববাদী) পূর্বপুরুষের ঔরস থেকে অন্য সিজদাকারীর ঔরসে স্থানান্তরিত হতে হতে অবশেষে হযরত আমিনা (রা.)-এর গর্ভে এসে পৌঁছেছে। (তাফসিরে ইবনে জারীর তবারি, তাফসিরে ইবনে কাথীর)।
ইমাম রাজী ও সুয়ূতী (রহ.)-এর বক্তব্য: ইমাম ফখরুদ্দিন আর-রাজি (রহ.) এবং পরবর্তীতে ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতি (রহ.) প্রমাণ করেছেন যে, এই আয়াতে ‘সাজিদীন’ (সিজদাকারী) বলতে রাসুল ﷺ-এর সমস্ত পূর্বপুরুষকে বোঝানো হয়েছে। আর সিজদাকারী কখনো ‘মুশরিক’ হতে পারে না, কারণ কুরআনে শিরককে নাজাসাত (অপবিত্রতা) বলা হয়েছে।
বংশধারার শ্রেষ্ঠত্বের সহিহ বর্ণনাসমূহ: সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন: “আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম (আ.)-এর সন্তানদের মধ্য থেকে ইসমাইল (আ.)-কে নির্বাচিত করেছেন… এবং কুরাইশদের মধ্য থেকে বনু হাশিমকে এবং বনু হাশিম থেকে আমাকে নির্বাচিত করেছেন।” (সহিহ মুসলিম: ২২৭৬)। দুর্বল সূত্রের কিছু বাক্য বাদ দিলেও, এই হাদিসের মূল বক্তব্য মুতাওয়াতির ও সহিহ সনদে প্রমাণিত যে নবীজি ﷺ-এর বংশধারা ছিল জাহেলিয়াতের সমস্ত ব্যভিচার ও কুলুষমুক্ত।
৩. ভাষাগত ও তাফসিরি বিশ্লেষণ: ‘আব’ (أب) শব্দের অর্থ কি কেবল জন্মদাতা পিতা?
হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর প্রসঙ্গ আলোচনায় অনেকে সূরা আল-আনআমের ৭৪ নম্বর আয়াতের দোহাই দিয়ে দাবি করেন যে, তাঁর পিতা ‘আজর’ কাফের ছিলেন:
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيهِ آزَرَ
“এবং স্মরণ করুন, যখন ইবরাহিম তাঁর ‘আব’ আজরকে বলেছিলেন…”
— (সূরা আল-আনআম, ৬:৭৪)
ভাষাগত ও ঐতিহাসিক ভুল ভাঙানি:
১. আরবি ভাষার রূপক ও বিস্তৃত ব্যবহার: আরবি ব্যাকরণে ‘আব’ (أب) শব্দটির প্রাথমিক অর্থ পিতা হলেও, তা চাচা, দাদা বা লালন-পালনকারী অভিভাবকের ক্ষেত্রেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
২. কুরআনিক প্রমাণ: সূরা আল-বাকারায় হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর সন্তানরা বলেছিলেন: “আমরা আপনার ইলাহ এবং আপনার ‘আবা’ (آبَائِكَ) ইবরাহিম, ইসমাইল ও ইসহাকের ইলাহের ইবাদত করব।” (সূরা বাকারাহ, ২:১৩৩)। এখানে হযরত ইসমাইল (আ.) ছিলেন ইয়াকুব (আ.)-এর চাচা, কিন্তু কুরআনে তাঁর জন্য ‘আব’-এর বহুবচন ‘আবা’ ব্যবহৃত হয়েছে।
৩. ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়ার দলিল: ইবরাহিম (আ.) তাঁর বার্ধক্যে—কাবার দেয়াল নির্মাণের পর—দোয়া করেছিলেন: “হে আমাদের রব! শেষ বিচারের দিনে আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে (وَلِوَالِدَيَّ) এবং মুমিনদের ক্ষমা করুন।” (সূরা ইবরাহিম, ১৪:৪১)।
কুরআনিক ব্যাকরণে জন্মদাতা পিতাকে নির্দেশ করতে ‘ওয়ালিদ’ (والد) শব্দ ব্যবহার হয়। আজরের জন্য ইবরাহিম (আ.) ‘আব’ শব্দে সম্বোধন করেছিলেন এবং তার হেদায়েতের আশা ছেড়ে দেওয়ার পর তার জন্য দোয়া বন্ধ করে দেন। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে নিজের আসল জন্মদাতা পিতার (ওয়ালিদ) জন্য তিনি المغفرة (ক্ষমা) প্রার্থনা করেছিলেন—যা প্রমাণ করে তাঁর প্রকৃত ওয়ালিদ মুমিন ছিলেন, আর কাফের আজর ছিলেন তাঁর চাচা।
৪. ‘আহলুল ফাতরাহ’ ও আল্লাহর অবধারিত ন্যায়বিচার
ইসলামি আকাইদের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো, কোনো জাতির কাছে আল্লাহ তাআলা সুনির্দিষ্ট বার্তা বা রাসুল না পাঠানো পর্যন্ত তাদের শাস্তি দেন না।
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:
وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبْعَثَ رَسُولًا
“আমরা কোনো রাসুল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকেই শাস্তি প্রদান করি না।”
— (সূরা আল-ইসরা, ১৭:১৫)
প্রাসঙ্গিক প্রয়োগ:
ফাতরাহ যুগের সংজ্ঞা: হযরত ঈসা (আ.) এবং হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর মধ্যবর্তী সময়কালকে ‘ফাতরাহ’ (বার্তা পৌঁছানো স্থগিত থাকার যুগ) বলা হয়।
নবীজি ﷺ-এর পিতা-মাতার অবস্থান: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পিতা হযরত আবদুল্লাহ এবং মাতা হযরত আমিনা (রা.) নবুওয়াত প্রকাশের পূর্বেই এই ফাতরাহ যুগে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁদের কাছে কোনো জীবিত রাসুলের দাওয়াত সরাসরি পৌঁছায়নি।
আকাইদের নীতি: ইমাম আশ-শাফেয়ী, ইমাম আল-আশ’আরী এবং ইমাম আল-মাতুরিদী (রহ.)-এর উসূল অনুযায়ী—ফাতরাহ যুগের মানুষেরা মূলগতভাবে নাজাতপ্রাপ্ত (আহলুন নাজাত)। সুতরাং, এই উসূল অনুযায়ীও নবীজি ﷺ-এর পিতা-মাতা অবশ্যই জান্নাতি ও নাজাতপ্রাপ্ত।
৫. সহিহ মুসলিমের হাদিস (হাদিস ৯৭৬) ও তার ভারসাম্যপূর্ণ তাফসির
আলোচনায় একটি আপত্তি প্রায়ই তোলা হয়—সহিহ মুসলিমে বর্ণিত আবু হুরায়রা (রা.)-এর হাদিস, যেখানে এসেছে: নবী ﷺ তাঁর মাতার কবরের পাশে কেঁদেছিলেন এবং তাঁর জন্য ক্ষমা চাওয়ার অনুমতি চাইলে আল্লাহ অনুমতি দেননি, তবে জিয়ারতের অনুমতি দিয়েছিলেন।
জমহুর ওলামায়ে কেরামের জবাবে ৩টি শক্তিশালী ব্যাখ্যা:
১. হুকুমের সময়কাল (শরয়ি বিধানের অগ্রগতি): উলামায়ে কেরাম বলেন, এই ঘটনাটি ঘটেছিল শরিয়তের প্রাথমিক যুগে, যখন আহলুল ফাতরাহ বা মুশরিকদের জন্য এস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা)-সংক্রান্ত চূড়ান্ত বিধান স্পষ্ট হচ্ছিল।
২. ‘ক্ষমা চাওয়া’ না পাওয়ার কারণ: হযরত আমিনা (রা.) কোনো গুনাহই করেননি যে তাঁর জন্য ‘ক্ষমা’ চাইতে হবে, কারণ তিনি ফাতরাহ যুগে তাওহীদের ফিতরাতের ওপর ইন্তেকাল করেছিলেন। যার ওপর কোনো শরয়ি تکلیف (দায়িত্ব) ছিল না, তাঁর জন্য মাগফিরাত বা গুনাহ মাফের আবেদনের সুযোগ অবান্তর।
৩. ইহা (পুনরুজ্জীবিতকরণ)-এর বর্ণনা: বহু মুহাদ্দিস ও হাফেজে হাদিস (যেমন—ইমাম করতুবি, হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি ও ইমাম সুয়ূতি) উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহ তাআলা পরবর্তীতে অলৌকিকভাবে (মু’জিজা হিসেবে) নবীজি ﷺ-এর পিতা-মাতাকে জীবিত করেছিলেন এবং তাঁরা নবীজি ﷺ-এর ওপর ঈমান এনে পুনরায় ইন্তেকাল করেন। (এ সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো فضائل ও خصائص-এর অধ্যায়ে আলেমদের কাছে সুপরিচিত ও গৃহীত)।
৬. সুন্নী ঐতিহ্যে ওলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত অবস্থান
নবী ﷺ-এর পিতা-মাতার নাজাতের পক্ষে মতামতটি কোনো আধুনিক উদ্ভাবন বা আবেগী উক্তি নয়, বরং এটি যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকিহদের গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত:
ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতি (রহ.): তিনি এই বিষয়ে ৯টি স্বতন্ত্র প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। যার মধ্যে ‘মাসালিকুল হুনাফা ফি ওয়ালিদাই আল-মুস্তফা’ অন্যতম। তিনি কুরআন-হাদিসের ৯টি ভিন্ন ধারার দলিল দিয়ে নাজাত প্রমাণ করেছেন।
ইমাম ফখরুদ্দিন আর-রাজি (রহ.): তাফসিরে কাবীরে তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, নবীজি ﷺ-এর কোনো পূর্বপুরুষ মুশরিক ছিলেন না।
ইমাম ইবরাহিম আল-বাজুরি (রহ.): ‘শারহু জাওহারাতুত তাওহিদ’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন যে, সুন্নী আলেমদের রাজিক (অধিক গ্রহণযোগ্য) মত হলো নবীজি ﷺ-এর মাতা-পিতা নাজাতপ্রাপ্ত।
দারুল ইফতা আল-মিসরিয়্যাহ (মিসরের অফিসিয়াল ফতোয়া বোর্ড): সমসাময়িক গবেষণায় মিসরের দারুল ইফতা স্পষ্ট ফতোয়া দিয়েছে যে—নবীজি ﷺ-এর পিতা-মাতার প্রতি অশালীন মন্তব্য করা বা তাঁদের জাহান্নামি বলা সুসংহত ইসলামি আদর্শের পরিপন্থী এবং নবীজি ﷺ-কে কষ্ট দেওয়ার শামিল।
৭. নবী-পরিবারের আদব ও শরয়ি সতর্কতা
ইসলামে গায়েবের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ ছাড়া কাউকে জাহান্নামি ঘোষণা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكِ بِهِ عِلْمٌ
“যে বিষয়ে তোমার সুস্পষ্ট জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।”
— (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩৬)
যেখানে আম্বিয়ায়ে কেরামের স্বজনদের ব্যাপারে কুরআনে একাধিক ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে, সেখানে নেতিবাচক ব্যাখ্যা আঁকড়ে ধরে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মনকষ্টের কারণ হওয়া ইসলামি শিষ্টাচারের (আদব) খেলাফ। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ তাআলা রাসুল ﷺ-কে সন্তুষ্ট করার ওয়াদা করেছেন। যে পিতা-মাতার মাধ্যমে নবীজি পৃথিবীতে এসেছেন, তাঁদের অপমানিত করে রাসুল ﷺ-কে সন্তুষ্ট রাখা অসম্ভব।
উপসংহার
সার্বিক আলোচনার নির্যাস হলো—পবিত্র কুরআনের আয়াতে নবীদের বংশধারার মনোনয়ন (সূরা আলে ইমরান), সিজদাকারীদের মধ্য দিয়ে নূরের স্থানান্তর (সূরা আশ-শুআরা), ভাষাগত সূক্ষ্মতায় ‘আব’ ও ‘ওয়ালিদ’-এর পার্থক্য (সূরা আল-আনআম ও সূরা ইবরাহিম), এবং আহলুল ফাতরাহের ন্যায়বিচার নীতি (সূরা আল-ইসরা)—এসবই সম্মিলিতভাবে প্রমান করে যে নবীদের পিতা-মাতা অপবিত্রতা ও জাহান্নামের শাস্তি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসের অসম্পূর্ণ বা একপেশে অর্থ তুলে ধরে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকিহদের ইজতিহাদকে অস্বীকার করা গবেষণার সততা নয়। নবী-পরিবারের পবিত্রতা রক্ষা করা ঈমানি দায়িত্বের অংশ। অতএব, শক্ত দলিল ও জমহুর ওলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এটাই নির্দেশ করে—আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর পিতা-মাতা সহ সমস্ত নবীদের জন্মদাতা মা-বাবা পবিত্রতা ও পরকালীন নাজাতের সুউচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।
#
মুহাম্মদ আনিছুল ইসলাম আশরাফী
সম্পাদক
আমার সিলেট (amarsylhet24.com)
ও
সভাপতি
শ্রীমঙ্গল অনলাইন প্রেসক্লাব।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি