সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে কমরেড আবুল বাশারের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে: মানিক

প্রকাশিত: ১১:০০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৭, ২০২৬

সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে কমরেড আবুল বাশারের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে: মানিক

Manual4 Ad Code
  • “কমরেড আবুল বাশার ছিলেন শ্রমিক ঐক্য ও সমাজ পরিবর্তনের অগ্রণী যোদ্ধা”— ওয়ার্কার্স পার্টির আলোচনা সভায় বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৭ নভেম্বর ২০২৬ : বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক বলেছেন, “বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে কমরেড আবুল বাশার ছিলেন এক অনন্য সংগ্রামী নেতা। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, শ্রমিকদের ঐক্য সুসংহত করা এবং সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শ্রমিক আন্দোলনের বিভাজন দূর করে দলমত নির্বিশেষে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তিনি আজীবন আপসহীন ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম বর্তমান শ্রমিক আন্দোলনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা।”

শনিবার (৭ নভেম্বর ২০২৬) কিংবদন্তিতুল্য শ্রমিক নেতা, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাবেক সভাপতি ও জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কমরেড আবুল বাশারের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

Manual7 Ad Code

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির উদ্যোগে ‘কমরেড আবুল বাশার: জীবনাদর্শ ও বর্তমান শ্রমিক আন্দোলন’ শীর্ষক এ আলোচনা সভা রাজধানীর ৩১/এফ, তোপখানা রোডে শহীদ রাসেল আহমেদ খান স্মৃতি ভবনে অনুষ্ঠিত হয়।

Manual5 Ad Code

এতে প্রধান আলোচক ছিলেন পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য ও শ্রমিকনেতা কমরেড কামরূল আহসান। তিনি বলেন, কমরেড আবুল বাশার শুধু একজন শ্রমিকনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের এক সাহসী ও আপসহীন সংগঠক। তাঁর নেতৃত্বে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের মধ্যে ঐক্য ও অধিকার আদায়ের চেতনা জোরদার হয়েছিল। তাঁর সংগ্রামী জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান শ্রমিক আন্দোলনকে আরও ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করতে হবে।

পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য কমরেড মোস্তফা আলমগীর রতন সভা সঞ্চালনা করেন। তিনি বলেন, ১৯৩৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার (বর্তমান লক্ষ্মীপুর) রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ কেরুয়া গ্রামে এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কমরেড আবুল বাশার। পঞ্চাশের দশকে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে ইস্পাহানী জুট মিলসে কারিগরি বিভাগের শ্রমিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। কর্মজীবনের শুরু থেকেই শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। অল্প সময়ের মধ্যেই শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছান। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের পাটকল, বস্ত্রকল, বন্দরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের কাছে আস্থাভাজন নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

Manual7 Ad Code

এতে পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা ও বিভিন্ন গণসংগঠনের নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য কমরেড আবুল হোসাইন, কমরেড জাকির হোসেন রাজু, কমরেড এ্যাড. জোবাইদা পারভিন, কমরেড সাব্বাহ আলী খান কলিন্স, কমরেড হিমাংশু সাহা, কমরেড কিশোর রায়, কমরেড সাদাকাত হোসেন খান বাবুল, করেড এটিএম নাসির মিঞা, কমরেড শাহানা ফেরদৌসী লাকী, কেন্দ্রীয় সদস্য ও বাংলাদেশ যুবমৈত্রীর সভাপতি কমরেড তৌহিদুর রহমান, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি ইয়াতুন নেসা রুমা প্রমুখ।

বক্তারা বলেন, ষাটের দশকে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত ৫৬ দিনের লাগাতার ধর্মঘট দেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের দাবি আদায়ে মালিকপক্ষ ও প্রশাসনকে কার্যকর আলোচনায় আসতে বাধ্য করা হয়। এ সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তিনি জাতীয় পর্যায়ের শ্রমিকনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

বক্তারা আরও বলেন, শ্রমিক আন্দোলনে ঐক্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করে তিনি বরাবরই বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ১৯৮৪ সালে দলমত নির্বিশেষে শ্রমিক-কর্মচারীদের ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে গঠন করেন ‘শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ’। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের শ্রমিকদের সংগঠিত করতে ১৯৮৬ সালে গঠন করেন ‘পাট-সুতা-বস্ত্রকল শ্রমিক-কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদ’। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন আন্দোলন শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

Manual5 Ad Code

নেতৃবৃন্দ বলেন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও কমরেড আবুল বাশার সক্রিয় ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষকে সংগঠিত করে স্বাধীনতার সংগ্রামে সম্পৃক্ত করেন। স্বাধীনতার পর অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি ‘মজদুর পার্টি’ গঠন করেন এবং দলটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, ১৯৮৫ সালে মজদুর পার্টি ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ঐক্যবদ্ধ হলে তিনি ঐক্যবদ্ধ দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে দলের পলিটব্যুরোর সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শ্রমিক আন্দোলন ও প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি।

বক্তারা বলেন, কমরেড আবুল বাশারের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল শ্রমিকদের শ্রেণিগত ঐক্য। তিনি মনে করতেন, শ্রমিকদের অধিকার ও স্বার্থ দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে। এ কারণে শ্রমিক আন্দোলনে সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দিতেন। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের নির্দেশিত শিল্পবিরোধী নীতি, বি-শিল্পায়ন ও বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধেও তিনি সোচ্চার ছিলেন। শ্রমিকের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি দেশের শিল্প ও উৎপাদনব্যবস্থা সুরক্ষার প্রশ্নেও তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ়।

বক্তারা আরও বলেন, নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা দমন-পীড়ন, কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হলেও আদর্শ ও সংগ্রামের পথ থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও শ্রমিক আন্দোলনের মূল শিক্ষা ছিল—শ্রমিকদের ঐক্যই অধিকার ও মুক্তি অর্জনের প্রধান শক্তি।

নেতারা বলেন, ২০১০ সালের ৭ নভেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই বর্ষীয়ান শ্রমিকনেতা। তাঁর মৃত্যুর ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়।

আলোচনা সভায় বক্তারা কমরেড আবুল বাশারের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণ করতে হবে। বর্তমান সময়ে শ্রমিকদের ওপর শোষণ-বঞ্চনা, শিল্পসংকট ও অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে তাঁর দেখানো ঐক্যের পথ অনুসরণ জরুরি।

বক্তারা শেষে স্লোগানে স্লোগানে স্মরণ করেন এই কিংবদন্তি শ্রমিকনেতাকে—‘কমরেড আবুল বাশার, লাল সালাম’।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ