সিলেট ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৮:৫৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২২, ২০২২
‘বর্তমান উন্নয়নমুখী যাত্রায় ডিজিটালাইজড, গ্লোবালাইজড ও ইন্ডিভিজুয়ালাইজড সামাজিক মনস্তত্ত্ব বস্তুত দৃশ্যমানতা না থাকলে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না।
মানুষ প্রতিবেশের বাস্তুসংস্থানে যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন, প্রকৃতির রূঢ়তার সামনে নির্বিকার হয়ে যাওয়া ব্যতীত আর কিছুই করার থাকে না। মহামারী আর দুর্যোগের ইতিহাস তারই সাক্ষী হয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়। পরিবেশ আর প্রতিবেশের সঙ্গে সংবেদনশীল নিবিড়তা বজায় রেখে প্রাণ-প্রকৃতিবান্ধব পরিবেশ বিনির্মাণ বর্তমান আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় বড় একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে সামনে আসে বারবার। ‘আধুনিক মানুষ’ অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে প্রকৃতির স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত করে, যান্ত্রিকতার প্রবল স্রোতে দুর্বারগতিতে নিজেদের সভ্যতা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষের চারপাশে প্রাণ-প্রকৃতি, প্রতিবেশ, পরিবেশ প্রতিনিয়ত নানা হুমকির মুখে পড়লেও, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ আলাপ যথাযোগ্য গুরুত্ব পায় না অবাধ যান্ত্রিকতানির্ভর আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয়। এমনকি পরিবেশ-প্রতিবেশে নেতিবাচক পরিবর্তনে মানুষও নিজের অস্তিত্ব সংকটে পড়তে যাচ্ছে, এমন মানবিক সংকটেও বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামোর ক্ষমতাধর অংশীদাররা সুচারুভাবে পাশ কাটিয়ে যায়। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় উন্নয়নের যে বয়ান তারা এর বাইরে যাওয়ার কথা চিন্তা করতে পারে না।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশ, প্রতিবেশ আর জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহল প্রতিনিয়ত আশঙ্কাব্যঞ্জক গবেষণা প্রকাশ করছে, আর এ বিষয়ে বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের করণীয় সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করে নানা স্তরে সম্মেলন, আলোচনা হচ্ছে তবে আশানুরূপ অগ্রগতি ও কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। ধনী বিশ্ব নিজেদের কার্বন নিঃসরণ কমানোবিষয়ক চুক্তিতে টালবাহানা করে যাচ্ছে কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোকে তাদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ায় অনিহা পোষণ করে।
এমন পরিস্থিতিতে এ ধরিত্রীর অস্তিত্ব রক্ষার মতো বিষয়ে ক্ষমতাশীল বিশ্বের এ ধরনের আচরণ খুবই হতাশাব্যঞ্জক ও অসংবেদনশীল। সাম্প্রতিক সময়ে কোপ২৭ সম্মেলন কতটা সফলতা পেয়েছে তা এরই মধ্যে অনেকভাবেই আলোচনায় এসেছে, মোটামুটি এটা পরিষ্কার হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা সুসংহত হতে পারেনি। স্থানিক জ্ঞানের ওপর গুরুত্বারোপের মতো নানা আশাপ্রদ এজেন্ডা নিয়ে বরাবরের মতো এবারও মিসরে বসেছিল কোপ২৭, তৃতীয় বিশ্বের বাসিন্দা হিসেবে আবারো আশায় বুক বেঁধে সেদিকে তাকিয়ে থাকাই সার! যদিও ক্ষমতাধরদের রাশিয়া-ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধাবস্থা নিয়ে বেশি আগ্রহ তবুও শান্তিবাদী মানুষরা আশাবাদী হয় শান্ত এক পৃথিবীর আশায়।
এখন প্রশ্ন হলো, এ জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বৈশ্বিক করণীয় সম্পর্কে বিনা দ্বিধায় সবাই একমত হতে পারে না কেন? এখানে স্থানিকতা আর বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির মাঝে একটা ফাঁরাক আছে। আর এ ফাঁরাকটা আবিষ্কৃত হয় মূলত যখন বৈশ্বিক জলবায়ুবিষয়ক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে স্থানিকতার পরিপ্রেক্ষিতে করণীয় ও কর্মপদ্ধতি নির্ধারিত হয়। এখানে বৈজ্ঞানিক ও স্থানিক জ্ঞানের যে (দ্বান্দ্বিক) সহাবস্থান জরুরি, তা সমন্বয়ে এক ধরণের বৈপরিত্বের সম্মুখীন হতে হয়। ফলে এ দুটি বিষয়ের মাঝে দূরত্ব ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এখানে একটা বিষয় অত্যন্ত জরুরি, বিজ্ঞানভিত্তিক বৈশ্বিক জ্ঞানকাণ্ডীয় দৃষ্টিভঙ্গি মোটা দাগে প্রাত্যহিক জীবনের স্থানিক অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান তথা অনুধাবনকে ‘ভিত্তিহীন’ বা ‘অবৈজ্ঞানিক’ হিসেবে বিবেচনা করে। আর স্থানিক জ্ঞানকে মোটা দাগে ‘অবৈজ্ঞানিক’ হিসেবে পরিগণ্য করার প্রবণতা এ দূরত্ব আরো সুদূরপরাহত করে তোলে।
বিশেষ করে স্থানিক জ্ঞান যখন কেবলই প্রান্তিকীকরণ করার প্রবণতা বৈশ্বিক বাজারভিত্তিক প্রায়োগিক জ্ঞান পরিমণ্ডলে। অন্যদিকে স্থানিক জ্ঞানগুলোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে কিনা তাও বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখার সাধ্য থাকে না স্থানিক জ্ঞানের প্রান্তিকতার প্রেক্ষিত থেকে।
এ বিষয়ে ভূরি ভূরি উদাহরণ হয়তো উপস্থাপন করা যেতে পারে, তবে খুব সংক্ষেপে যদি বলি প্রত্যন্ত কোনো গ্রামের আদিবাসী একজন মানুষ তার চিরায়ত সাংস্কৃতিক জ্ঞানের ভিত্তিতে চারপাশের কোনো গুল্মলতার ব্যবহারের মধ্য দিয়ে যদি কোনো রোগের উপসম পায় আর তাতে কী ধরনের উপাদানের রযেছে যার কারণে এ উপসম হলো, তা যদি ‘বৈজ্ঞানিক’ মহলের কাছে অজানা হয় তাহলে কি ওই ব্যক্তির আরোগ্য ধর্তব্য না?
এ বিষয়ে অনেক আলোচনা হতে পারে, অনেক যুক্তিতর্ক, তথ্য-উপাত্য উপস্থাপিত হতে পারে বিজ্ঞানের নিরিখে, যা কিনা স্থানিক চিরায়ত জ্ঞানকে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে দাঁড় করিয়ে প্রান্তিক করে ফেলতে যথেষ্ট। আর এ যুক্তি-তর্ক-তথ্য-উপাত্যের দৌড়ে স্থানিক জ্ঞান রবাবরই পিছিয়ে পড়ে এবং পড়ছে, কেননা স্থানিক জ্ঞানকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা না করা পশ্চিমা ঔপনিবেশিক জ্ঞান কাঠামোর এক পুরনো সীমাবদ্ধতা। যদিওবা বর্তমান সময়ে প্রান্তিক প্রকারান্তরে দক্ষিণী জ্ঞানের অনেক কিছুই পশ্চিমা করপোরেট কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের গ্রাহক সংহারের লক্ষ্যে ব্যবহার করছে। সে আলোচনার দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। মূল কথা ‘বৈজ্ঞানিক’ তথা পজিটিভিস্ট দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে সমাজে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা অনুধাবন বা বিশ্লেষণই যে শেষ কথা না, তা ভাবার প্রণোদনা দেয়।
আর বৈজ্ঞানিক হয়ে উঠবার প্রয়োজনীয়তাই বা সর্বসময়ে কতটুকু? একজন ‘আধুনিক বৈজ্ঞানিক’ সময়ের মানুষ হিসেবে এ প্রশ্নের উত্তরে আমাদের সহজাত মূল্যায়ন হলো, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ব্যতীত জলবায়ু পরিবর্তনের মতো একটা বৈশ্বিক সমস্যাকে মোকাবেলা সম্ভব না। অত্যন্ত যৌক্তিক এ মূল্যায়নের কোনো বিকল্প বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় চিন্তাও করা যায় না। পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পেছনে যে কারণগুলোকে চিহ্নিত করেছেন তার সবই মানব সৃষ্ট কারণ।
বিশেষ করে বর্তমান বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় হলো শক্তি। এ শক্তি বা পাওয়ার ব্যতীত বর্তমান বিশ্বকে একদণ্ডও চিন্তা করা যায় না। পক্ষান্তরে আজ পর্যন্ত এ বিজ্ঞানভিত্তিক যান্ত্রিক সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি হলো জীবাশ্ম জ্বালানি। এ যান্ত্রিক সভ্যতা সচল থাকার প্রতি পরতে পরতে কার্বনসহ নানা ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণ হয় যা প্রকারান্তরে এ ধরিত্রীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে কাজ করে। বিশেষজ্ঞরা নানা বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রতিনিয়ত সতর্কবাণী শোনাচ্ছেন যে এ ধরিত্রীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছাচ্ছে যার বৈরি প্রভাব এরই মধ্যে এ ধরিত্রীর অধিবাসীরা টের পাওয়া শুরু করেছে। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা বৈঠক হয়, করণীয় নির্ধারিত হয় কিন্তু দিন শেষে তার কোনোটিরই সফল প্রয়োগ বিশ্বের মানুষ দেখতে পায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের পোশাকি আলোচনাগুলোয় বৈশ্বিক রাজনীতির যে রূপ সাধারণ চোখে প্রত্যক্ষ করা যায় তাতে খুব সহজেই আন্দাজ করা যায় এ সভ্যতা কতটা অসংবেদনশীল!
সংবেদনশীলতা একটি মনস্তাত্ত্বিক বা অনুভূতিপ্রসূত ব্যাপার, পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির যুক্তিতে এ ধরণের অনুভূতির কোনো মূল্য নির্ধারণ করা যায় না কিংবা এগুলোর বস্তুগত কোনো রূপও প্রকৃত অর্থে দেখা যায় না। আর তাই এগুলোকে আমলে নেয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক তৎপরতাও দেখা যায় না। ফলে আমরা যে বিষয়গুলো প্রতিনিয়ত লক্ষ্য করি তা হলো অসংবেদনশীল আচরণ।
নৃবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমার কাছে অনুধাবিত হয়, ‘বর্তমান উন্নয়নমুখী যাত্রায় ডিজিটালাইজড, গ্লোবালাইজড ও ইন্ডিভিজুয়ালাইজড সামাজিক মনস্তত্ত্ব বস্তুগত দৃশ্যমানতা না থাকলে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। মোদ্দাকথা, বস্তুগত লাভ ছাড়া সব বিষয়ই গৌন হয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতার প্রবাহে সংবেদনশীলতাও ভেসে যায় উন্নয়নের জোয়ারে। যার ফলে আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত আমাদের দ্বারাই যাওয়া ছোট, বড়, মাঝারি নানা কিছিমের অসংবেদনশীল এত কাণ্ড! অসংবেদনশীল সামাজিক তথা ব্যক্তিক আচরণ।
এ সংবেদনশীলতা শব্দটা থেকে চিন্তার সূত্রপাতে যে বিষয়টি মাথায় আসে তা হলো, বর্তমান নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যারা আর্থসামজিক উন্নয়নের ছক কাটছে, তারা আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব দান করছেন। এখানে সীমাবদ্ধতা হলো মানুষের প্রতিদিনে জীবনাচরণ বা জীবনকে ঘিরে যে রিচ্যুয়াল, আর এর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা যে আধ্যাত্মিকতা, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, মূল্যবোধ এগুলোকে উন্নয়ন পাঠের অনুষঙ্গ হিসেবে ধর্তব্য ভাবতে না পারা।
নগরায়ণভিত্তিক উন্নয়নের কেন্দ্রে অবস্থান করছে শিল্পভিত্তিক এক ধরনের উন্নয়নের বয়ান। আর এ শিল্পায়নে যন্ত্রের ব্যবহার যতটা দ্রুততার সঙ্গে বস্তুগত উপযোগিতা দেখাতে পারে, এ শিল্পায়নের অসংবেদশীল প্রভাবে চারপাশের পরিবেশ, প্রতিবেশের ক্ষতিগুলো অতটা দ্রুততার সঙ্গে ঠাহর করা যায় না। ফলে শিল্পায়নভিত্তিক একটা উন্নয়ন আমাদের মতো উন্নয়নশীল বা অনুন্নত রাষ্ট্রীয় সমাজের আরাধ্য হয়ে ওঠে। আর উন্নয়নের ডামাডোলে পরিবেশ, প্রতিবেশের প্রতি থোরাইকেয়ার একটা মনোভাব পরিলক্ষিত হয়। একদম স্থানিকতার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান বাজারভিত্তিক উন্নয়ন কত দিক থেকে পরিবেশ ও প্রতিবেশবান্ধব নয়, তার হিসাব করে শেষ করা যাবে না। সে স্থানিকতার প্রেক্ষিত থেকে উন্নয়নের অসংবেদনশীল প্রতিঘাতগুলো আলোচনার আগে বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে আমরা যা দেখি তা একটু স্মরণ করা জরুরি।
বৈশ্বিক পরিসরে আলোচনার কেন্দ্রে থাকে কার্বন নিঃসরণ রোধ বা কমিয়ে নিয়ে আসা। আর এ কার্বন নিঃসরণে ক্ষতিগ্রস্ত, অধিক ক্ষতিগ্রস্ত তৃতীয় বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপখাওয়ানোর জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করে যাওয়া। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বাজারভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থা পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর যে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে সেগুলোকে কমিয়ে নিয়ে আসার জন্য স্থানিক পর্যায়ে যথপোযুক্ত করণীয় নির্ধারণে মনোযোগ প্রদান জরুরি। এখানে উন্নয়ন অনুধাবনে সংবেদনশীলতাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখা জরুরি। সংবেদনশীলতার আধ্যাত্মিকতা তথা দর্শনের দিকে মনোযোগী হওয়া বর্তমান উন্নয়ন পাঠকদের কর্তব্য।
সংবেদনশীলতা অনুধাবনের সহজতর স্বরূপ বর্ণনা করলে আমার স্বল্প অভিজ্ঞতায় যা দাঁড়ায় তা হলো, চারপাশের সব জীব-জড়ের অস্তিত্বের মাঝে নিজেকে তাদেরই একটা অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। মনুষ্য জীব হয়ে জ্ঞানের আর ক্ষমতার জোরে প্রাণ-প্রকৃতির ওপর প্রভুত্ব কায়েম করা কিংবা অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করার প্রবণতাকে লাগাম পরানো। প্রকৃতির যত ক্ষুদ্র অনুষঙ্গই হোক না কেন তার বেঘাত না ঘটিয়ে, প্রকৃতির মাঝে নিজের অস্তিত্বের আলাদা উপস্থিতিহেতু অন্যদের বিরক্তি উদ্রেগকারী অনুনাদ সৃষ্টি না করে, সবার সঙ্গে তথা সব প্রাণিকুলের সঙ্গে যথাসম্ভব সহাবস্থানের যে মানসিকতা, অনুধাবন ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাত্রা তাকে সংবেদনশীলতা বলে অনুধাবিত হয়। এক্ষেত্রে একটা উদাহরণ প্রায়ই আলোচনায় টানি, সংবেদনশীলতা বুঝতে আমি মামুলি একটা উদাহরণাশ্রয়ী যেমন—দুজন মানুষের ঘাসের ওপর বসার ইচ্ছা করল। একজন সবুজ মসৃণ ঘাস দেখে স্বস্তি নিয়ে বসে পড়ল, আর অন্যজন বসার আগে নিচু হয়ে ঘাসের ডগায় হাতে বিলি কেটে দেখে নিল যে ঘাসের গোড়ায় বা ঘাসের নিচে পিঁপড়ার সারি আছে কিনা কিংবা অন্য কোনো কীটপতঙ্গ রয়েছে কিনা তা দেখে ধীরে-সুস্থে আসন নিল। এ দুজন মানুষের ঘাসের ওপর বসা ক্রিয়াটুকুর নিবিড় বিশ্লেষণে গেলে দেখা যায়, দুজনের মনস্তাত্ত্বিক স্তর এক না, দুজন সমান মাত্রায় প্রকৃতি ও প্রাণের প্রতি সমহারে সংবেদনশীল নন। এ সংবেদনশীলতা ব্যক্তি ভেদে আলাদা আলাদা হয়, পরিস্থিতি ভেদে আলাদা হতে পারে। এ আলাদা হওয়ার পেছনে নানা সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষিত কাজ করে। প্রকারান্তরে সমাজে মানুষের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া এখানে একটা বড় নিয়ামক। মানুষ তার প্রাত্যহিক জীবনযাপনে যে অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, দুর্দশা, প্রয়োজনীয়তা প্রভৃতির ভেতর দিয়ে যায় তার একটা প্রভাব থাকে মানুষের আচরণে। এ বিষয়ে মনোযোগ দিয়ে আগামী প্রজন্মের পথকে বিনির্মাণ করাই বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপট।
তানভীর শাতিল: উন্নয়ন গবেষক, বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি