গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা: রোড সেফটি ফাউন্ডেশন

প্রকাশিত: ৪:৩০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০২৩

গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা: রোড সেফটি ফাউন্ডেশন

Manual2 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাকা, ২১ অক্টোবর ২০২৩ : রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলেছে, ক্ষমতাসীন দলের একটা অংশ সড়ক পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি করছে। এই সুবিধাবাদী গোষ্ঠীই পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় প্রধান বাধা। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনটির ভাষ্য, দেশে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি এখনো বিভিন্ন কমিটি গঠন ও সুপারিশমালা তৈরির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। বর্তমানে সড়ক পরিস্থিতিতে বোঝা যায়, দেশে সড়ক নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

আজ শনিবার (২১ অক্টোবর ২০২৩) সকাল ১০টায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের কার্যালয়ে আয়োজিত ‘দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা ও সড়ক নিরাপত্তা পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বক্তারা।

Manual8 Ad Code

এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’ এবং ‘রোড সেফটি ওয়াচ ডটকম’। ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা চরমভাবে বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কোনো উদ্যোগই ঠিকমতো আলোর মুখ দেখছে না। প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক কোনো উদ্যোগই যথেষ্ট মাত্রায় বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে জনগণ যেমন সচেতন হচ্ছে না, তেমনি সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না।

সড়ক পরিবহন খাতে সুবিধাবাদী গোষ্ঠী রয়েছে উল্লেখ করে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, এই গোষ্ঠীই সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় প্রধান বাধা। তারা নানা অজুহাতে সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন করতে দিচ্ছে না। এই সুবিধাবাদী গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে সড়ক পরিবহন খাতে অব্যবস্থাপনা টিকিয়ে রাখে। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন সেই দলের লোকজন সড়ক পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চাঁদাবাজি করে।

Manual1 Ad Code

পর্যাপ্ত সমীক্ষা হয়নি :
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে রাজধানীর গণপরিবহন ৫৩ শতাংশ যাত্রী বহন করে আর ব্যক্তিগত গাড়ি ১১ শতাংশ যাত্রী বহন করে। অথচ সড়কে ৭০ শতাংশের বেশি জায়গা দখল করে চলে ব্যক্তিগত গাড়ি ও রিকশা। যানজটের কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে মোটরসাইকেল ব্যবহার করছে। রাজধানীতে এখন ১৩ লাখের বেশি মোটরসাইকেল চলে। রিকশার হিসাব কেউ জানে না।
রাজধানীর যানজট কমাতে প্রকল্প নেওয়ার আগে পর্যাপ্ত সমীক্ষা করা হয়নি বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়। বলা হয় রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণে অনেকগুলো ফ্লাইওভার, ওভারপাস, ইউলুপ, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এরপরও রাজধানীর যানজট কমছে না, বরং বাড়ছে। রাজধানীতে যে পরিমাণে মানুষের চাপ বাড়ছে, তাতে মেট্রোরেল ও সাবওয়ে রাজধানীর যানজট খুব বেশি কমাতে পারবে না। রাজধানীতে ৪ হাজার আধুনিক নতুন বাস নামানোর পরামর্শ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের। সংগঠনটি বলছে, এতে ব্যয় হবে মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা।

সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না :
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ২৫ হাজার ৯২৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৯ হাজার ১ জন। আহত হয়েছেন ৪২ হাজার ৩৮৮ জন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান ৯ হাজার ৩০৯ জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে পথচারী ছিলেন ৭ হাজার ৬৬৫ আর শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ হাজার ৮৯৬।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দেশে বড় দুর্ঘটনা ঘটলে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, কিন্তু সেই তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না। সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য কমিটি করা হয়, সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু যথারীতি এসবেরও কোনো বাস্তবায়ন হয় না। সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি কমিটি গঠন ও সুপারিশমালা তৈরির মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

‘অনেকেই সহযোগিতা পাবেন না’ :
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের ৭৯ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে। এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর ফলে দেশে আর্থসামাজিক-সংকট তৈরি হচ্ছে। দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অধিকাংশই দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির। দুর্ঘটনায় আহত সদস্যের চিকিৎসা করতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সর্বস্বান্ত হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া শুরু হয়েছে। তবে তহবিল-সংকটের কারণে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সহযোগিতা পাবেন না। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের পক্ষে এই ফান্ড থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়া সময়সাপেক্ষ ও দুরূহ। আবেদন করা, পুলিশি তদন্ত ও প্রতিবেদন জমা হওয়া, যাচাই-বাছাই ইত্যাদি করতে অনেক সময় কেটে যাবে।

Manual2 Ad Code

সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য ‘ইন্ডিপেনডেন্ট ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। তারা বলছে, এই ফান্ডে প্রতিবছর সর্বোচ্চ ৩ হাজার কোটি টাকা হলেই দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সম্ভব। ইন্ডিপেনডেন্ট ফান্ড গঠিত হলে সড়ক দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আহত রোগীদের উপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন :
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সংবাদ সম্মেলনে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বাড়ানো, চালকদের বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, বিআরটিএর (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ) সক্ষমতা বাড়ানো, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন বন্ধ, সব মহাসড়কে রোড ডিভাইডার (সড়ক বিভাজক) নির্মাণ, গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ, রেল ও নৌপথ সংস্কার করে সড়কের ওপর চাপ কমানো, টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও সড়ক পরিবহন আইনের বাধাহীন বাস্তবায়ন অন্যতম।

Manual5 Ad Code

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এই খাতে চলমান দুনীতি, চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। এ জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ক্ষমতাসীন দলের শ্রমিক সংগঠন ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা পরিবহন খাতে যুক্ত হন। পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো চাঁদাবাজি ছাড়া কী করে? সড়কের বিশৃঙ্খলা বিষয়টির রাজনৈতিক সমাধান লাগবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান সৈয়দ জাহাঙ্গীর, অধ্যাপক হাসিনা বেগম, আব্দুল্লাহ মো. ফেরদৌস খান, রাশেদ খান, রোড সেফটি ওয়াচ ডটকমের সম্পাদক হারুন অর-রশীদ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মো. জিল্লুর রহমান, বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক মো. তৌফিকুজ্জামান ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রেজিন্ট ডিজিটালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুর রহিম।

প্রতিবেদকের প্রতিক্রিয়া ও সুপারিশ :

এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, ‘৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, সাপ্তাহিক নতুন কথা’র বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, রোড সেফটি ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত ‘দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা ও সড়ক নিরাপত্তা পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সড়কে নিরাপত্তাহীনতা ও সীমাহীন অব্যবস্থার চিত্রই প্রকাশ পেয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গাড়ি চালনার প্রাথমিক শিক্ষা কোর্স (ব্যবহারিক সহ) চালু করাসহ দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি করা, চালকের বেতন ও কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করা, বিআরটিএ’র সক্ষমতা বৃদ্ধি করা,পরিবহনের মালিক-শ্রমিক, যাত্রী ও পথচারীদের প্রতি ট্রাফিক আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল বন্ধ করে এগুলোর জন্য আলাদা পার্শ্ব রাস্তা (সার্ভিস রোড) তৈরি করা, সকল সড়ক-মহাসড়কে রোড ডিভাইডার নির্মাণ করা, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার করা, গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, রেল ও নৌ-পথ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে সড়ক পথের উপর চাপ কমানো, গণপরিবহন উন্নত, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করে মোটরসাইকেল ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা, সড়ক, নৌ ও রেলপথে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করাসহ
সড়ক পরিবহন আইন ও বিধিমালা যথাযথ বাস্তবায়নে নতুন নতুন কৌশল ও ডিজিটালাইজড উদ্ভাবনকে কাজে লাগাতে হবে। সর্বোপরি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও ডিজিটাইজড করতে হবে। এ বিষয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে প্রায় দুই বছর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উন্নয়ন প্রজেক্ট পাঠানো হয়েছে, তা বাস্তবায়ন জরুরি।
যাত্রী ও পথচারীদের ব্যক্তি নিরাপত্তা ও বিধি-বিধান প্রতিপালনে সচেতন হতে হবে। নাগরিকদের মধ্যে আইন ও শৃঙ্খলা মানার সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে হবে। সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা, শ্রমিক নেতা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের যথাযথ আইন প্রয়োগে সহায়তা প্রদান করতে হবে।
প্রশাসন, পুলিশ, বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন, সড়ক ও জনপথ, মালিক, চালক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব। সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জাতীয়ভাবে সেল তৈরি করে এবং প্রতি বিভাগ ও জেলায় একইভাবে সেল গঠন করে নিয়মিত মনিটরিং ও পরামর্শ প্রদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং এ সেলকে সর্বদাই সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এভাবেই সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করা সম্ভব।”

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ