সিলেট ২৭শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৩:০০ অপরাহ্ণ, মার্চ ৭, ২০২৪
বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাকা, ০৭ মার্চ ২০২৪ : ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বিধিমালা ও (নির্বাচন আচরণ) খসড়া সংশোধন বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সাথে মতবিনিময়ের জন্য বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন এমপি’র নেতৃত্বে তিন সদস্যের এক প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনসহ নির্বাচন কমিশনারদের সাথে সাক্ষাত করেন।
সাক্ষাতকালে এক লিখিত বক্তব্যে ওয়ার্কার্স পার্টির তরফ থেকে বলা হয়, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে এক লক্ষ টাকা ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৭৫ হাজার টাকা জামানত নির্ধারণ করায় কেবল বিত্তবানরাই উক্ত নির্বাচন করতে পারবে, অন্য কেউ নয়।
ওয়ার্কার্স পার্টির বক্তব্যে বলা হয় যেখানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামানত ২০ হাজার টাকা সেখানে উপজেলা পরিষদে জামানতের অংকের পরিমাণ কেবল অযৌক্তিক নয়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এর মধ্য দিয়ে উপজেলা পরিষদের মত স্থানীয় সরকার নির্বাচন সাধারণ প্রার্থী ও জনগণের নাগালের বাইরে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
ওয়ার্কার্স পার্টির বক্তব্যে উপজেলা পরিষদের খসড়া সংশোধনী প্রস্তাব করে উপজেলা পরিষদ বিধিমালা ২০১৩ ও (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা ২০১৬ বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়।
ওয়ার্কার্স পার্টির প্রস্তাবে কালো—সাদা পোস্টারের পরিবর্তে রঙিন পোস্টারের বিধানও বাতিল করার কথা বলা হয়। অনলাইনে মনোনয়ন প্রদানসহ নির্বাচনে টাকার খরচ নিয়ন্ত্রণ করা, নির্বাচনে সকলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, নির্বাচনে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, নির্বাচনকে সন্ত্রাস, পেশী শক্তির প্রভাব ও দুবৃর্ত্তমুক্ত মুক্ত করা, ভোটার তালিকা থেকে যুদ্ধাপরাধী, যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত সংগঠনের সদস্য, জঙ্গী তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, রোহিঙ্গাদের বাদ দেয়ারও সুপারিশ করা হয়।
নির্বাচন কমিশনের সাথে আলোচনা বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কালো টাকা, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ, নির্বাচনী আইন প্রয়োগে অপ্রতুলতা, ভোটারদের অনাগ্রহের বিষয়সমূহ উঠে আসে।
নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে বলা হয়, এই সব সংস্কার করতে ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হবে। এই প্রসঙ্গে ওয়ার্কার্স পার্টি সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের পূর্বতন দাবী পুনর্ব্যক্ত করেন।
আলোচনায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল, নির্বাচন কমিশনারগণ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আহসান হাবিবুর খান (অবঃ), মো. আলমগীর রহমান, মো. আনিছুর রহমান ও নির্বাচন কমিশনের সচিব মো. জাহাংগীর আলম উপস্থিত ছিলেন।
ওয়ার্কার্স পার্টির পক্ষ থেকে সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন এমপি, সাধারণ সম্পাদক কমরেড ফজলে হোসেন বাদশা, পলিটব্যুরোর সদস্য মুস্তফা লুৎফুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।
এই সাথে নির্বাচন কমিশনের কাছে ওয়ার্কার্স পার্টির পূর্ণাাঙ্গ বক্তব্য নিম্নে দেওয়া হলো।
গত ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ইং তারিখে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশের প্রেক্ষিতে জানতে পারি যে, ২০ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার ২০২৪ ইং তারিখে আপনার নির্বাচন কমিশনের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত মতে উপজেলা পরিষদ বিধিমালা—২০১৩ ও (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা—২০১৬ সংশোধন করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যা এখন ভেটিং এর জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা। এতদবিষয়ে আমাদের দল গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখে আপনার বরাবরে একটি লিখিত বক্তব্য দিয়েছিল।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি মনে করে নির্বাচন কমিশন কতৃর্ক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে ১ লক্ষ টাকা ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৭৫ হাজার টাকা জামানত নির্ধারণের কারণে কেবলমাত্র বিত্তবানরাই নির্বাচন করতে পারবে, অন্য কেউ নয়। যেখানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামানত ২০ হাজার টাকা, সেখানে উপজেলা নির্বাচনে উল্লেখিত জামানতের অংক কেবল অযৌক্তিকই নয়, উদ্দেশ্য প্রণোদিত।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি মনে করে, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই নির্বাচনে সাধারণভাবে জনগণ উৎসুক থাকে এবং তাদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করে। সেখানে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সাধারণ প্রার্থী ও জনগণের নাগালের বাইরে ঠেলে দেয়া হলো।
কেবল বিধিমালা সংশোধন নয়, রঙিন পোস্টার অনুমোদনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনে ব্যয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করেছেন যা বিত্তশালী প্রার্থীদের সংখ্যা বাড়াবে, সাধারণ মানুষকে নির্বাচনে অনুৎসাহিত করবে।
নির্বাচন কমিশন কতৃর্ক ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বিষয় যে সংশোধন প্রস্তাব করেছেন। তার প্রেক্ষিতে আমাদের দলের পক্ষ থেকে কিছু সুনির্দিষ্ট মতামত তুলে ধরছি।
১। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের সংশোধিত বিধিমালা খসড়া প্রত্যাহার করে পূর্বের উপজেলা পরিষদ বিধিমালা—২০১৩ ও (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা—২০১৬ বহাল রাখার অনুরোধ জানাচ্ছি।
২। জামানতের অর্থ
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন পত্রের সহিত প্রার্থীর জামানতের অর্থ চেয়ারম্যান পদে এক লক্ষ ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৭৫ হাজার পরিবর্তে ১০ হাজার ও ৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করছি।
৩। অনলাইনের মনোনয়ন জমা দান
বিদ্যমান পদ্ধতিতে মনোনয়ন জমাদানের ব্যবস্থাসহ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও অনলাইনে মনোনয়ন পত্র জমাদানের ব্যবস্থা করা।
৪। নির্বাচনে টাকার খরচ নিয়ন্ত্রণ করা
ওয়ার্কার্স পার্টি প্রতিটি নির্বাচন কমিশনকেই নির্বাচনে টাকার খেলা নিয়ন্ত্রণের দাবী জানিয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছিল। নির্বাচন কমিশন পক্ষান্তরে নির্বাচনী ব্যয়সীমা বাড়িয়ে চলেছে এবং নির্বাচনী খরচ নিয়ন্ত্রণে আগে ও পরে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করে না।
ক) ওয়ার্কার্স পার্টি মনে করে নির্বাচনী ব্যয়সীমা যুক্তিসঙ্গতভাবে কমিয়ে আনতে পোস্টার, লিফলেট, ডিজিটাল প্রচার, রেডিও—টেলিভিশনে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রনের জন্য এ ব্যাপারে আরপিও ও নির্বাচনী আচরণবিধিতে সুস্পষ্ট বিধান রাখতে হবে। এর প্রতিটি বিষয় পর্যাবেক্ষণ ও নির্বাচন কমিশানকে রিপোর্ট প্রকাশের জন্য কর্মকর্তা নির্দিষ্ট করে তাদের দায়িত্ব দিতে হবে। এবং নির্বাচন চলাকালীন সময়েই তাদের পর্য্যবেক্ষণ ও রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রার্থী বা তার প্রধান এজেন্টকে শুনানী করে নির্বাচন বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
খ) প্রার্থী বা তার হয়ে যে কেউই খরচ করুক না কেন সেটা প্রার্থীর ব্যয় হিসাবে গণ্য হবে এবং তা কোনক্রমে নির্বাচনী ব্যয় সীমা অতিক্রম করবেনা।
গ) প্রতি নির্বাচনী এলাকায় একজন নির্ধারিত কর্মকর্তা প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় মর্নিটর করবেন ও নির্বাচন কমিশনকে নিয়মিত রিপোর্ট প্রদান করবেন। এই রিপোর্টের সাথে প্রার্থীর দেয়া নির্বাচনী ব্যয়ের বিবরণী মিলিয়ে দেখা হবে।
৫। নির্বাচনে সকলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা
ক) পোষ্টার, লিফলেট, বৈদ্যুতিক, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ব্যবহার, মাইক, নির্বাচন ব্যানার, ফেস্টুন, দেয়াল লিখন, গেইট নির্মাণ ইত্যাদি বিষয়ে যে সব নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা আছে তা ব্যতিক্রমহীনভাবে পালন করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন কর্মকর্তা এই বিষয়ে নিশ্চিত করবেন। এবং এ ক্ষেত্রে কোন আইন ও বিধি ভাঙ্গা হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করবেন।
খ) রঙিন পোস্টারের নতুন অনুমোদন বাতিল করতে হবে।
গ) নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচন কমিশন কতৃর্ক প্রচলিত আইন অনুযায়ী নির্বাচনী অফিস ব্যতিরেকে কোন নির্বাচনী ক্লাব, ক্যাম্প নির্বাচনী প্রচার কেন্দ্র হিসেবে কোন কাঠামো তৈরি করা যাবে না।
এসব প্রতিটি বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং লংঘনকারীদের প্রার্থীতা বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৬। ভোটার তালিকা:
ক) বাংলাদেশ কোলাবরেটার্স (স্পেশাল ট্রাইবুন্যাল) এ্যাক্ট ১৯৭৩ অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত কেউ ভোটার হতে পারবেনা, হয়ে থাকলে তাদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। এছাড়া যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত সংগঠনের সদস্য, ব্যক্তি, জঙ্গী তৎপরতায় যুক্ত ব্যক্তি ও মায়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তভুর্ক্ত করা হলে তা বাদ দিতে হবে। রোহিঙ্গাদের এনআইডি প্রদান ও ভোটার তালিকা অন্তর্ভূক্ত করার সাথে জড়িত কর্মকর্তা, কর্মচারী, সুপারিশকারী জনপ্রতিনিধিদের আইনের আত্ততায় এনে বিচারের সম্মূখীন করতে হবে।
৭। নির্বাচনে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার ব্যবহার
ক) নির্বাচনে ধর্মের সর্বপ্রকার ব্যবহার, সাম্প্রদায়িক প্রচার—প্রচারণা ও ভোট চাওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে নিষিদ্ধ করতে হবে।
খ) ধর্মীয় উপসনালয়, মন্দির, মসজিদ, গীর্জা, মঠ, ওয়াজ ধর্মসভায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কোন প্রকার নির্বাচনী প্রচার, করা যাবে না। পোষ্টার, হ্যান্ডবিল বিলি নিষিদ্ধ করতে হবে।
৮। নির্বাচনকে সন্ত্রাস পেশী শক্তির প্রভাব ও দুবৃর্ত্তমুক্ত করতে-
(ক) উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সকল প্রকার বল প্রয়োগ, অস্ত্র বহণ ও প্রদর্শন পরিপূর্ণ নিষিদ্ধ করা এবং বল প্রয়োগের ঘটনার কঠোর শাস্তিবিধান করতে হবে।
(খ) ফৌজদারী দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত ব্যক্তিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেয়া যাবে না। একটি স্বাধীন কার্যকর নির্বাচন কমিশন এবং সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা প্রদানে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি সব সময়ে সচেষ্ট থাকবে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি