বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস আজ

প্রকাশিত: ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ, মে ৩, ২০২৪

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস আজ

Manual3 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৩ মে ২০২৪ : বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস আজ। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় সাংবাদিকতা’। গতবছর (২০২৩) এর প্রতিপাদ্য ছিল ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সকল প্রকার মানবাধিকারের চালিকাশক্তি’।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হয়। বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে দেশের সাংবাদিকরা পেশাগত অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন।

১৯৯১ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম সাধারণ অধিবেশনের সুপারিশ মোতাবেক ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় (৩ মে) তারিখটিকে ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে’ অথবা বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ, বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মূল্যায়ন, স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ প্রতিহত করার শপথ গ্রহণ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ক্ষতিগ্রস্ত ও জীবনদানকারী সাংবাদিকদের স্মরণ ও তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয় এই দিবসটিতে।

গণমাধ্যম হিসেবে বিশ্বের সবচেয়ে পুরাতন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রবাহের মাধ্যম হচ্ছে সংবাদপত্র। পরবর্তীতে এর সঙ্গে রেডিও, টেলিভিশন জনপ্রিয় গণমাধ্যম হিসেবে যুক্ত হয়। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অনলাইন নিউজ পোর্টাল পাঠকদের মধ্যে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে।

Manual1 Ad Code

সাধারণত মুক্ত গণমাধ্যম বলতে বোঝায়, পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা কোনো প্রকার হয়রানি বা সহিংসতার শিকার হবে না। ভয়ভীতি ছাড়া তারা নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারবে। পাশাপাশি তাদের তথ্যে অবাধ প্রবেশাধিকার থাকবে।

১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ঘোষণাপত্রের ১৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘প্রত্যেকেরই মতামত পোষণ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে; কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়া অবাধে মতামত পোষণ করা এবং রাষ্ট্রীয় সীমানানির্বিশেষে যেকোনো মাধ্যমের মারফতে তথ্য ও ধারণাগুলো জানা বা অনুসন্ধান, গ্রহণ ও বিতরণ করা এই অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।’

বাংলাদেশের সংবিধানেও চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা ও বাক্-স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্-স্বাধীনতা’ শিরোনামে সংবিধানের ৩৯নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে (১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান করা হইল। (২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং (খ) সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হইল।

সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমকে একটা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাই একটি দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। এটি সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে।

রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যম যাতে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে সেজন্য সাংবাদিকরা যেন বিনা বাধায় এবং নিরাপদ পরিবেশে যথাযথভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারে তার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। আর সাংবাদিকদের প্রকৃত স্বাধীনতা ছাড়া মুক্ত গণমাধ্যম সুদূর পরাহত।

শুধুমাত্র পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সাংবাদিকরা কমবেশি ভয়ভীতির শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রভাবশালী মহলের চাপ, হামলা-মামলা, রাজনৈতিক হুমকির কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতাকে অনেক ক্ষেত্রেই বাধার সম্মুখীন হতে হয়। মাঠপর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তারাও এ ব্যাপারে কম যান না। সুযোগ পেলেই তারা সাংবাদিকদের নানাভাবে হয়রানি করে থাকেন এমনকি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অপব্যবহারও হয়ে থাকে। অথচ বর্তমান সরকার কর্তৃক ঘোষিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশকে স্মার্ট বাংলাদেশে উত্তরণের’ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে ভূমিকা পালনের কোনো বিকল্প নেই।

কেননা, গণমাধ্যম ব্যক্তির মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে। তথ্য প্রদানের মাধ্যমে জনমত গঠনেও গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পাশাপাশি গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারের ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে স্বচ্ছতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। এ ছাড়া মুক্ত গণমাধ্যম মানবাধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্যও অত্যাবশ্যক। তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সমাজের বিকাশ ও উন্নয়নের শক্তিশালী ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়।

সংবাদপত্রকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। সংবাদপত্র কেবলমাত্র সংবাদ পরিবেশন করে না। সমাজের সার্বিক বিকাশ সাধনেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে। সংবাদপত্র গণতন্ত্রের সদা জাগ্রত প্রহরী। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে, গণতন্ত্র ব্যাহত হলে, কোথাও দুর্নীতি হলে গণমাধ্যম সবার আগে সোচ্চার হয়ে ওঠে। অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের মতো নানা সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে চেতনার জাগরণ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সমাজকে ইতিবাচক উন্নতির পথে এগিয়ে নিতে সংবাদপত্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

তবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতারও একটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। স্বাধীনতার অর্থ এই নয়, যা ইচ্ছে তা করা বা লেখা। সাংবাদিকরা দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নন। দেশের প্রতি, সমাজের প্রতি, আইনের প্রতি, স্বীয় বিবেকের প্রতি, নীতি-নৈতিকতার প্রতি অবশ্যই তাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুসরণ করে বস্তুনিষ্ঠ লেখনী ও সঠিক এবং পরিপূর্ণ তথ্য পরিবেশনের মাধ্যমে তারা এই দায়বদ্ধতা মেনে চলবেন।

গণমাধ্যমের প্রধান সম্পদ হচ্ছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা, যা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। তবে নানা কারণে আমাদের দেশের গণমাধ্যম তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে বসেছে। সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদার প্রশ্নে এটি মোটেও সুখকর নয়। কাজেই হলুদ সাংবাদিকতা, অপসাংবাদিকতা কিংবা দায়িত্বহীন সাংবাদিকতা যেন কোনোভাবেই তাদের স্পর্শ না করে সে ব্যাপারে সাংবাদিকদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।

আবার এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই- অনেকেই নিজেদের স্বার্থে গণমাধ্যমকে অনৈতিকভাবে ব্যবহার করছেন এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এটাকে প্রোপাগান্ডা যন্ত্রে পরিণত করছেন। কিছু কিছু গণমাধ্যম একপেশে কিংবা পক্ষপাতমূলক সংবাদ পরিবেশন করে থাকে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সাংবাদিকদের একটি প্রতিবেদন তৈরি করার সময় সর্বদা মনে রাখতে হবে- ‘A half-truth is even more dangerous than a lie (অর্ধসত্য মিথ্যার চেয়েও ভয়ংকর)। সুতরাং ‘সত্য কথা লিখতে শিখো ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে নয়, আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে’- বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই অমর বাণী তাদের অন্তরে ধারণ করতে হবে।

Manual2 Ad Code

বর্তমান জমানায় নিয়ন্ত্রণহীন ফেসবুক, ইউটিউব ও এক্সসহ নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই গুজব বা ভুল তথ্য ছড়িয়ে সমাজে অস্থিরতা তৈরি কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সমাজ গঠনে ওই সব গুজব, মিথ্যা তথ্য ও অপপ্রচার রোধে মুক্ত গণমাধ্যম অত্যাবশ্যক।

Manual4 Ad Code

সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। এটি মেধা ও মননের পেশা, অধ্যয়ন ও অধ্যবসায়ের পেশা; কিন্তু এ পেশায় নিয়োজিত মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন, জীবনের নিরাপত্তা প্রদানের ক্ষেত্রে সব মহলেরই রয়েছে উদাসীনতা।

অন্যদিকে, পেশাগত দায়িত্ব পালন করার সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অসংখ্য সাংবাদিক হত্যার শিকার হচ্ছেন। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)-এর তথ্যমতে, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে কমপক্ষে ৯৯ জন সাংবাদিক মারা গেছেন। এর মধ্যে ৭৭ জনই গাজায় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধে জীবন হারান।

Manual3 Ad Code

এদিকে, শুক্রবার (৩ মে ২০২৪) বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, দেশে গণমাধ্যমের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও ভয়হীন স্বাধীন সাংবাদিকতা কমেছে।
তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব হলো- রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যম যাতে বিনা বাধায় তার ওপর অর্পিত ভূমিকা পালন করতে পারে, তার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ