জেল হত্যা দিবস কাল

প্রকাশিত: ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২, ২০২৫

জেল হত্যা দিবস কাল

Manual5 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০২ নভেম্বর ২০২৫ : আগামীকাল ৩ নভেম্বর—বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায় জেল হত্যা দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ চার সহযোগী—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইচএম কামারুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাত্র তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে সংঘটিত হয় এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ওই দিন কারাগারের নিরাপদ প্রাচীরের ভেতরে রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বস্ত এই চার জাতীয় নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার ইতিহাসে এ দিনটি চিহ্নিত হয়ে আছে জাতির দ্বিতীয় কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে।

জাতি আগামীকাল গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের এই চার নেতাকে। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদা ও শোকাবহ পরিবেশে পালন করবে।

Manual3 Ad Code

আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে—সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ভবন ও কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, কালো পতাকা উত্তোলন ও কালো ব্যাজ ধারণ। সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন এবং সকাল ৯টায় বনানী কবরস্থানে চার জাতীয় নেতার সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, ফাতেহা পাঠ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। রাজশাহীতেও জাতীয় নেতা কামারুজ্জামানের কবরে একই কর্মসূচি পালিত হবে। সকাল ১১টায় ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

ষড়যন্ত্র ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড

Manual8 Ad Code

তৎকালীন স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ এবং বঙ্গবন্ধুর দুই খুনি কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান ও লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশীদ এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন। তাদের নির্দেশে রিসালদার মুসলেহ উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি ঘাতক দল গঠন করা হয়। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটার পরই এই পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়।

Manual3 Ad Code

খ্যাতনামা সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর “Bangladesh: A Legacy of Blood” গ্রন্থে লিখেছেন—বঙ্গবন্ধু হত্যার পরপরই জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা নেয়া হয়, যাতে যে কোনো পাল্টা অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটানো যায়।

Manual7 Ad Code

বিচার ও রায়

ঘটনার পরদিন উপ-কারা মহাপরিদর্শক কাজী আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ ২৩ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে (১৯৯৮ সালে) অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর বিচারিক আদালত তিন আসামি—রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী শাহ ও এলডি আবুল হাসেম মৃধাকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে।
২০১৫ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে, যেখানে আদালত উল্লেখ করে যে “জেল হত্যাকাণ্ড ছিল একটি প্রমাণিত রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র।”

অপূর্ণ কমিশনের ইতিহাস

১৯৮০ সালে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার আবেদনে স্যার থমাস উইলিয়ামস কিউসি এমপি’র নেতৃত্বে লন্ডনে একটি তদন্ত কমিশন গঠিত হয়। তবে তৎকালীন সরকারপ্রধান প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে কমিশনকে সহায়তা না করায় তা কার্যকর হয়নি। এ বিষয়ে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় অধ্যাপক আবু সাইয়িদের “বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: ফ্যাক্টস অ্যান্ড ডকুমেন্টস” গ্রন্থে।

জাতির শ্রদ্ধা

স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্র নির্মাণে এই চার নেতার অবদান অবিস্মরণীয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে, তাজউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, এবং কামারুজ্জামান ও মনসুর আলী মুক্তিযুদ্ধের কৌশল ও প্রশাসনিক পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তাদের রক্তে রঞ্জিত ৩ নভেম্বর বাঙালি জাতির ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় থাকবে বিশ্বাসঘাতকতা, ষড়যন্ত্র ও দেশপ্রেমের এক নির্মম প্রতীক হিসেবে।

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ