সিলেট ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:৩১ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২০, ২০২৫
বিশেষ প্রতিনিধি | মৌলভীবাজার, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ : আজ ২০ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের ইতিহাসে এক গভীর শোকের দিন। মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর ঠিক এই দিনেই ১৯৭১ সালে এক মর্মান্তিক মাইন বিস্ফোরণে অর্ধশতাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। সেই হৃদয়বিদারক ঘটনার স্মরণে প্রতিবছর ২০ ডিসেম্বর দিনটিকে মৌলভীবাজারবাসী স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ দিবস হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করে আসছে।
আজ শনিবার (২০ ডিসেম্বর ২০২৫) সকালে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠসংলগ্ন শহীদ বেদীতে মৌলভীবাজার জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

২০ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার শহীদ দিবস উপলক্ষে শহীদ বেদীতে জেলা পুলিশের শ্রদ্ধা নিবেদন। (ছবি – পুলিশ সুপার অফিস থেকে সংগৃহীত।)
সকাল ৯টায় পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানান। পরে সমবেতভাবে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আবুল খায়ের, জেলা বিশেষ শাখার ডিআইও-১ আবুল কাসেম সরকার, মৌলভীবাজার সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. সাইফুল ইসলামসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সদস্যরা।
বিজয়ের পরও নেমে এসেছিল শোকের ছায়া
ইতিহাসের নির্মম এক অধ্যায় রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর। ৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার মুক্ত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর সারাদেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর যুদ্ধশেষে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধারা সমবেত হয়েছিলেন মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থাপিত মুক্তিযোদ্ধা হেডকোয়ার্টারে। যুদ্ধের ক্লান্তি কাটিয়ে ঘরে ফেরার প্রস্তুতি, বিজয়ের আনন্দ আর ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর ছিলেন তাঁরা।
কিন্তু দুপুরের সেই মুহূর্তে আচমকা ঘটে যায় ভয়াবহ মাইন বিস্ফোরণ। একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পুরো ভবন। ধুলা-ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে চারপাশ। মুহূর্তের মধ্যেই প্রাণ হারান অর্ধশতাধিক মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার আনন্দে মুখর শহর হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায় শোকে ও কান্নায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিস্ফোরণের পর আহত ও নিহতদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছিল পুরো এলাকা। কেউ সঙ্গীদের নাম ধরে ডাকছিলেন, কেউ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছিলেন। কিন্তু অনেকের ডাক আর কোনো উত্তর পায়নি।
শহীদদের স্মৃতিতে স্থায়ী স্মারক
ঘটনার পর নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের ছিন্নভিন্ন দেহ সংগ্রহ করে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে সমাহিত করা হয়। পরবর্তীতে সেখানে নির্মাণ করা হয় একটি স্মৃতিস্তম্ভ, যা আজও মৌলভীবাজারবাসীর কাছে ত্যাগ ও বেদনাবিধুর ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ইতিহাসে যাঁদের নাম পাওয়া গেছে—এই ঘটনায় ২৪ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তাঁরা হলেন: সুলেমান মিয়া, রহিম বক্স খোকা, ইয়ানূর আলী, আছকর আলী, জহির মিয়া, ইব্রাহিম আলী, আব্দুল আজিজ, প্রদীপ চন্দ্র দাস, শিশির রঞ্জন দেব, সত্যেন্দ্র দাস, অরুণ দত্ত, দিলীপ দেব, সনাতন সিংহ, নন্দলাল বাউরী, সমীর চন্দ্র সোম, কাজল পাল, হিমাংশু কর, জিতেশ চন্দ্র দেব, আব্দুল আলী, নূরুল ইসলাম, মোস্তফা কামাল, আশুতোষ দেব, তরণী দেব ও নরেশ চন্দ্র ধর। তবে স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, নিহতের সংখ্যা ছিল অর্ধশতাধিক, যাদের অনেকের নাম মুক্তিযুদ্ধের অস্থির সময়ের ভিড়ে হারিয়ে গেছে।
ত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে বার্তা
প্রতিবছর এই দিনে শহীদ পরিবার, মুক্তিযোদ্ধা, প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। তরুণ প্রজন্মের কাছে এই দিনটি মুক্তিযুদ্ধের এক কম আলোচিত কিন্তু গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগায়।
মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের সেই প্রান্তে দাঁড়ালে মনে হয়—স্বাধীনতা শুধু উৎসবের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অপূর্ণ স্বপ্ন, অশ্রু আর ত্যাগের ইতিহাস। ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও ২০ ডিসেম্বরের সেই বিস্ফোরণের স্মৃতি আজও মৌলভীবাজারবাসীর হৃদয়ে নাড়া দেয়।
এই দিনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং তাঁদের আদর্শ নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি