কীভাবে মানুষ বই পড়া শুরু করলো!

প্রকাশিত: ১০:৫৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৫, ২০২৫

কীভাবে মানুষ বই পড়া শুরু করলো!

Manual2 Ad Code

লেখা সংগ্রাহক | ঢাকা, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ : কীভাবে মানুষ বই পড়া শুরু করল?

Manual1 Ad Code

পড়ার ইতিহাস এমন চমৎকার, লিখতে লিখতে আমিই হতবাক। দেখা যাক, আমরা পড়ার এবং পাঠকের বিবর্তনের মৌলিক ইতিহাসের দিকে তাকালে কী আবিষ্কার করতে পারি।

পড়ার শুরুর গল্প

খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দে, মেসোপটেমিয়ার শহরগুলো কৃষি সমৃদ্ধি এবং জটিল সামাজিক কাঠামো নিয়ে গড়ে উঠতে শুরু করে। তখন এক অজানা ব্যক্তি মাটির ট্যাবলেটে কিছু আঁকিবুকি করে ছাগল আর ষাঁড় চিত্রিত করেন। এই ছোট্ট ঘটনাই ইতিহাস বদলে দেয়। লেখার সাথে সাথেই এর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে জন্ম নেয় পড়ার শিল্প।

প্রথমদিকে লেখা ব্যবহার হতো লেনদেনের হিসাব রাখতে। খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০০ সালে কিউনিফর্ম লিপি উদ্ভাবনের মাধ্যমে লেখার ধরন আরও উন্নত হয়। এটি তখন আইন, রাজাদের বীরত্বগাথা এবং লেনদেনের তথ্য নথিভুক্ত করার কাজে ব্যবহৃত হতো।

মেসোপটেমিয়ায় একজন লেখক বা পাঠক হওয়া ছিল বিরাট সাফল্যের। যদি কোনো রাজা পড়তে জানতেন, তাহলে তিনি তা তার শিলালিপিতে গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করতেন।

Manual6 Ad Code

মেসোপটেমিয়ান সংস্কৃতিতে পাখিদের পবিত্র বলে মনে করা হতো, কারণ তারা ভেজা মাটিতে যে চিহ্ন রাখত, তা দেখতে কিউনিফর্ম লিপির মতো লাগত। এ ধরনের চিহ্নগুলো দেবতাদের বার্তা বলে মনে করা হতো।

প্রথম সাহিত্যিক এনহেদুয়ান্না

ইতিহাসে প্রথম নামযুক্ত লেখক ছিলেন আক্কাদীয় রাজকুমারী ও পুরোহিত এনহেদুয়ান্না। তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ২৩শ শতাব্দীতে মন্দিরের গীত রচনা করেন এবং নিজের নাম মাটির ট্যাবলেটে খোদাই করেন। এটি ছিল প্রথমবার, যখন লেখকদের পক্ষ থেকে ‘প্রিয় পাঠক’ বলে সম্বোধন করা হয়।

পাঠের অভিনয়

Manual5 Ad Code

প্রাচীন লেখাগুলো উচ্চস্বরে পড়ার জন্য তৈরি হতো। শব্দগুলো ধারাবাহিকভাবে লেখা থাকত, যা দক্ষ পাঠক উচ্চারণের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করতেন। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ সালের দিকে প্রথমবারের মতো বিরামচিহ্নের প্রচলন ঘটে, তবে এটি মধ্যযুগ পর্যন্ত বেশ এলোমেলো ছিল।

লিখিত তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাত জনসমক্ষে পাঠের মাধ্যমে। রাজকীয় দরবার ও মঠে জনসমক্ষে পাঠ করা হতো। ১১ ও ১২ শতকে গল্পকার এবং জাদুকরদের পরিবেশনা জনপ্রিয় ছিল। এমনকি সাধারণ ঘরেও রোমান যুগ থেকে ১৯ শতক পর্যন্ত ডিনার টেবিলে বই পড়ে শোনানো একটি সাধারণ বিনোদন ছিল।

খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতকে গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস অলিম্পিক গেমসে তার লেখা পড়তেন। রোমান সভ্যতায় লেখকদের লেখা জনসমক্ষে পাঠ করার রীতি গড়ে ওঠে। চার্লস ডিকেন্সের সুপরিকল্পিত পাঠ থেকে শুরু করে অনেক লেখকের গম্ভীর কণ্ঠে পাঠ, এই প্রথার ভিন্নতা ছিল। জাঁ জ্যাক রুশোর মতো যে-সকল লেখক ছিলেন নিষিদ্ধ তালিকায়, বন্ধুবান্ধবের ঘরে পাঠের আয়োজনই ছিল পাঠকের কাছে পৌঁছানোর একমাত্র উপায়।

নীরব পাঠ: এক নতুন অধ্যায়

নীরব পাঠ ছিল তখন এক অদ্ভুত অভ্যাস। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩০ সালে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট তার মায়ের একটি চিঠি নীরবে পড়েন, যা দেখে তার সৈন্যরা মুগ্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে সেন্ট অগাস্টিন তার Confessions-এ সেন্ট অ্যামব্রোসের নীরবে পাঠ করার দক্ষতায় বিস্ময় প্রকাশ করেন।

৯ম শতকে মঠের লাইব্রেরিগুলোতে নীরব কাজের নিয়ম চালু হয়। মানে তখনকার লাইব্রেরির পরিবেশ আধুনিক লাইব্রেরির মতো শান্ত ছিল না। কোলাহল ছিল নিয়মিত বিষয়।
নীরব পাঠের ফলে বই পাঠকের কাছে আরও ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে। ১৪ শতকে চসার বিছানায় বই পড়ার পরামর্শ দেন, ওমর খৈয়াম ও মেরি শেলি বাইরের প্রকৃতিতে পড়ার পক্ষে, আর হেনরি মিলার ও মার্সেল প্রুস্ত নির্জন বাথরুমে পড়া পছন্দ করতেন।

পড়া যখন প্রতিবাদ

লেখার শক্তি শুরু থেকেই শাসকদের কাছে বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হয়েছে। দাসপ্রথার শিকার মানুষদের পড়তে নিষেধ করা হয়েছিল। তবু তারা গোপনে নিজেরা পাঠ চালিয়ে যায় এবং পড়ার মধ্য দিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে থাকে। এই শিক্ষা তাদের নিজেদের স্বাধীনতার সংগ্রামে শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে ওঠে।

শুরুর দিকে নারীদেরও পড়তে বাধা দেওয়া হতো। তবে তারা নিজেদের গৃহস্থালির কাজের ফাঁকে লেখাপড়া শিখে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। রাশসুন্দরী দেবী, যিনি বাংলা ভাষার প্রথম আত্মজীবনী লিখেছিলেন, তার লেখাপড়ার গল্প এক অনুপ্রেরণার উদাহরণ।

Manual1 Ad Code

পড়ার শক্তি বনাম দমন নীতি

চীনের শি হুয়াং তি তার সময়ের আগে লেখা সব বই পুড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। রোমান ক্যাথলিক চার্চ ১৫৫৯ সালে নিষিদ্ধ বইয়ের একটি তালিকা প্রকাশ করে। নাজি জার্মানি বই পোড়ানোর মাধ্যমে নিজস্ব আদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। তবে আন্তর্জাতিক পাঠক সমাজ এই বাধা সত্ত্বেও টিকে আছে। ইতিহাস জুড়ে পাঠকরা তাদের পড়ার জগতকে আরও উন্নত করার দাবি তুলেছে এবং নিজেরাই সেই পরিবর্তন এনেছে।

আজ আপনি কী পড়ছেন? হয়তো সেটিই ভবিষ্যতের ইতিহাস হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ