যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসেন, তারা যেন শ্রমিক অধিকার ভুলে না যান

প্রকাশিত: ২:২৮ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৭, ২০২৬

যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসেন, তারা যেন শ্রমিক অধিকার ভুলে না যান

Manual8 Ad Code
জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬ সামনে রেখে শ্রমিক ইশতেহার উত্থাপন

বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ : জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬ সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে শ্রমিক অধিকার অন্তর্ভুক্তি এবং জাতীয় পর্যায়ে শ্রম ইস্যুতে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘শ্রমিক অধিকার জাতীয় এডভোকেসি এলায়েন্স’-এর উদ্যোগে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে উত্থাপিত ১৫ দফা সম্বলিত ‘শ্রমিক ইশতেহার’ আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়।

সম্মেলনে শ্রমিক ইশতেহারের বিষয়বস্তু তুলে ধরেন এলায়েন্স এর সদস্য সচিব ও বিলস নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ।

বক্তব্য রাখেন এলায়েন্স এর আহ্বায়ক ও বিলস মহাসচিব নজরুল ইসলাম খান এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাতীয় শ্রমিক জোট সভাপতি মেসবাহউদ্দীন আহমেদ।

Manual4 Ad Code

সংবাদ সম্মেলনে ১৫ দফা সুপারিশ শ্রমিক ইশতেহারে প্রস্তাব করা হয়, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল —

১। শ্রম আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনের মাধ্যমে সকল শ্রমিকের আইনি স্বীকৃতি, নিবন্ধন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
২। শ্রমজীবী মানুষের শোভন ও মর্যাদাপূর্ণ কাজের অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করা।
৩। সকল শ্রমিকের জন্য মর্যাদাকর ও জীবনবিকাশের উপযোগী ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা।
৪। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বৃদ্ধি করা এবং সকল দুর্ঘটনার বিচার ও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা।
৫। শ্রমজীবী মানুষের জন্য রেশন, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবাসহ সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
৬। সকল শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষের সংগঠন করা ও দরকষাকষি অধিকার নিশ্চিত করা।
৭। শিল্পসম্পর্ক চর্চা ও উন্নয়ন, নীতি প্রণয়নে শ্রমিকের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব এবং সামাজিক সংলাপ চর্চাকে উৎসাহিত করা।
৮। অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে এবং ন্যায্য প্রাপ্তি নিশ্চিতে শ্রমিকের অভিযোগ জানাতে প্রশাসনিক ও বিচারিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৯। কর্মক্ষেত্রে সম-অধিকার নিশ্চিত করা এবং হয়রানি, সহিংসতা ও বৈষম্য দূর করা।সকল নারী শ্রমিকের মাতৃত্বকালীন ছুটি সবেতনে ৬ মাসে উন্নীত করা:
১০। শিশু-কিশোর শ্রম বন্ধে সরকার কর্তৃক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
১১। শ্রম সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
১২। জলবায়ু ও প্রযুক্তি পরিবর্তন, অটোমেশন ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে ন্যায্য রূপান্তর এবং সামাজিক, পরিবেশগত ও মানবাধিকার বিষয়ক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক দায়বদ্ধতার আলোকে পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
১৩। অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
১৪। ইপিজেড শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার এবং সকল বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শ্রমিকের অধিকার ও দক্ষতা উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
১৫। জাতীয় পর্যায়ে শ্রমক্ষেত্রে সংকট মোকাবেলা এবং জবাবদিহিমূলক শ্রম প্রশাসন ব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে জাতীয় স্থায়ী শ্রম কমিশন গঠন করা।

Manual3 Ad Code

নজরুল ইসলাম খান তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, এলায়েন্স এই ইশতেহার একদিকে যেমন মাঠ পর্যায়ে শ্রমিকদের কাছে নিয়ে যাবে, অপরদিকে জাতীয় পর্যায়ে নীতি নির্ধারকদের সাথে যোগাযোগ, লবি ও এডভোকেসি অব্যাহত রাখবে। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে কেবল ইশতেহার হস্তান্তরের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সমস্ত জাতির কাছে উত্থাপন করা হবে, যাতে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও কল্যাণ ইস্যুতে জাতীয় বোঝাপড়া ও উপলব্ধি গড়ে উঠে।

Manual4 Ad Code

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ তার বক্তব্যে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি, সকল ক্ষেত্রে মজুরি বৈষম্য বিলোপ এবং সকল শ্রমিকের জন্য সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে জোর দিয়ে বলেন, সকল আন্দোলনে শ্রমিক তার রক্ত দেন এবং তাদের অবদান সবচেয়ে বেশী থাকে, অথচ পরিবর্তনের হাত ধরে যারা ক্ষমতায় আসেন তারা শ্রমিকদের কথা মাথায় রাখেন না। তিনি রাজনৈতিক দলগুলো এবং বিভিন্ন প্রার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান শ্রমিকদের অবদানের কথা ভুলে না গিয়ে তারা যেন শ্রমিক অধিকারের বিষয়টি অগ্রাধিকার তালিকায় রাখেন।

Manual5 Ad Code

সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়কারী আব্দুল কাদের হাওলাদার, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, জাতীয় শ্রমিক জোট বাংলাদেশ এর সভাপতি সাইফুজ্জামান বাদশা, বাংলাদেশ ফ্রি ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস এর সভাপতি এ আর চৌধুরী রিপন, সম্মিলিত গার্মেন্স শ্রমিক ফেডারেশন এর সভাপতি নাজমা আক্তার, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফন্টের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব বুলবুল, শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরাম এর ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব সেকেন্দার আলী মিনা, নারীপক্ষ এর সদস্য রওশন আরা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। এতে বাংলাদেশের জাতীয় শ্রমিক জোটের সাধারণ সম্পাদক বাদল খান, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন, বিলসের নির্বাহী পরিষদ সম্পাদক সাকিল আখতার চৌধুরী, বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শামীম আরা, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের অর্থ সম্পাদক কাজী রুহুল আমিন, বাংলাদেশ লেবার ফেডারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দা আজিজুন নাহার, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এ. এস এম জাকারিয়া, ব্লাস্ট এর পরিচালক এডভোকেট বরকত আলী সহ এলায়েন্স এর ট্রেড ইউনিয়ন ও নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে প্রত্যাশা করা হয়, সুপারিশগুলো শুধু শ্রমিকদের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করবে, যেখানে শান্তিপূর্ণ শিল্পসম্পর্কের ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন ব্যবস্থা, সবার অংশগ্রহণের সুযোগ এবং তার ফল পাওয়ার অধিকার থাকবে। যদি নীতিগতভাবে এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়, তাহলে আগামীর বাংলাদেশ একটি বৈষম্যহীন, মর্যাদাকর, টেকসই ও সুষম উন্নয়নের বাংলাদেশ হবে যা বিশ্বের বুকে ‘প্রতিযোগী বাংলাদেশ’ হিসেবে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারবে বলে আশা করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়, আগামীদিনের বাংলাদেশ গড়তে বিগত দিনের জন-আকাঙ্ক্ষা যদি পূরণ করতে হয়, তাহলে শ্রমিকদের ইস্যুকে একটি প্রধান নীতি নির্ধারণী ইস্যু হিসেবে বিবেচনায় আনতে হবে- যার প্রধান লক্ষ্য হবে শ্রমক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা, যার যার ন্যায্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা, জাতীয়ভাবে কিছু ন্যূনতম মানদণ্ড তৈরি করা। বাংলাদেশে শ্রমজীবী মানুষের ভোটের যে সংখ্যা, তাদেরকে উপেক্ষা করে জাতীয় পর্যায়ে কোনও পরিকল্পনা বা কোনও এজেন্ডা যেন বাস্তবায়ন করা না হয় সে বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে সর্বজনীন রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রত্যাশা করা হয়।

উল্লেখ্য, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬-এ শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও প্রত্যাশাকে রাজনৈতিক দলসমুহের কাছে সুপারিশ আকারে তুলে ধরতে জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনসমুহ, শ্রমিক অধিকার সংগঠনসমূহ ও তাদের বিভিন্ন জোট, শ্রমিক অধিকার ও কল্যাণ ইস্যুতে কর্মরত বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে একটি যৌথ প্লাটফরম হিসেবে শ্রমিক অধিকার জাতীয় এডভোকেসি এলায়েন্স গঠন করা হয়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ