শিক্ষাবিদ অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর ১০৩তম জন্মবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১:৪৩ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৯, ২০২৬

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর ১০৩তম জন্মবার্ষিকী আজ

Manual2 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : প্রগতিশীল চিন্তার আলোকবর্তিকা, নাগরিক আন্দোলনের পুরোধা নেতৃত্ব, বরেণ্য শিক্ষাবিদ, লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর ১০৩তম জন্মবার্ষিকী আজ।

১৯২৩ সালের এই দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আজীবন অবিচল থাকা এই মনীষীর জন্মদিনে দেশজুড়ে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল সংগঠন।

অধ্যাপক কবীর চৌধুরী ছিলেন একাধারে একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষক, প্রজ্ঞাবান চিন্তক এবং আপসহীন সাংস্কৃতিক সংগ্রামী। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রগতিশীল আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক ও অনস্বীকার্য। বিশেষ করে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নৈতিক কণ্ঠে পরিণত করে।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার এবং জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে প্রায় ৩৪ বছর আগে যে অভূতপূর্ব নাগরিক আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী ছিলেন সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় দুই দশক তিনি এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।

১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে যে ঐতিহাসিক গণআদালত অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে অধ্যাপক কবীর চৌধুরী ছিলেন অন্যতম বিচারক। ওই গণআদালত বাংলাদেশের ইতিহাসে ন্যায়বিচার ও গণপ্রতিরোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

অধ্যাপক কবীর চৌধুরী আমৃত্যু একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ কেন্দ্রসহ বহু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতির দায়িত্বে থেকে তিনি মুক্তচিন্তা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

Manual3 Ad Code

শিক্ষাক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল বহুমাত্রিক। তিনি ছিলেন ছাত্রদের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম—যিনি শিক্ষাকে কেবল পুঁথিগত বিদ্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে মানবিকতা, যুক্তিবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। একজন লেখক ও প্রাবন্ধিক হিসেবেও তিনি সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির নানা বিষয়ে গভীর বিশ্লেষণধর্মী লেখা উপহার দিয়েছেন।

আজ তাঁর ১০৩তম জন্মবার্ষিকীতে বিভিন্ন সংগঠন আলোচনা সভা, স্মরণসভা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, বহুমাত্রিক লেখক, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেছেন, “অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর জীবন ও আদর্শ আজকের প্রজন্মের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন অবস্থান নতুন প্রজন্মকে প্রগতিশীল ও মুক্তচিন্তায় উদ্বুদ্ধ করবে।”

প্রগতিশীল বাংলাদেশের নির্মাণে অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর অবদান ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে—এই বিশ্বাসই আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে সকল শ্রদ্ধার মূল সুর।

Manual1 Ad Code

বরেণ্য শিক্ষাবিদ, লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা —

কবীর চৌধুরী : প্রগতির দীপ্ত স্তম্ভ

— সৈয়দ আমিরুজ্জামান

আজো ফেব্রুয়ারির আলো নামে ইতিহাসের বুকে,
এক শত তিনটি প্রদীপ জ্বলে তোমার স্মৃতির সুখে।
নির্ভীক কণ্ঠ, প্রজ্ঞার দীপ, অটল মানবতা,
কবীর চৌধুরী—নামটি মানেই প্রতিবাদের কথা।

উনিশশো তেইশের সেই ভোরে জন্ম নিলে ধরণীতে,
বাঙালির ভাগ্য লিখবে তুমি কলম আর চেতনায়।
শিক্ষা শুধু পুঁথির নয়—শিখিয়েছ মানবিকতা,
মনের ভিতর জ্বালিয়েছো মুক্তির দীপ্ত বাতি তা।

শ্রেণিকক্ষে যেমন তুমি জাগালে প্রশ্নের আগুন,
রাস্তায় নেমে তেমনি তুমি ভাঙলে ভয়ের প্রাচীর।
জ্ঞান আর জীবন মিলিয়েছো একই স্রোতের ঢেউয়ে,
নির্লোভ সাহসে দাঁড়িয়েছো সময়ের মুখোমুখি হয়ে।

Manual6 Ad Code

একাত্তরের রক্তঝরা সেই কালরাত্রির পরে,
যখন ঘাতকেরা চায় ইতিহাস চাপা দিতে ঘোরে—
তখন তুমি একা নও, জনতার কণ্ঠে কণ্ঠ মিশাও,
ন্যায় আর সত্যের পথে দৃঢ় পদচারণা চালাও।

শহীদ জননী জাহানারা, চোখে অগ্নি দীপন,
তাঁর ডাকে তুমি ছিলে প্রথম সারির সৈনিক জন।
চৌত্রিশ বছর আগের সেই নাগরিক জাগরণ,
তোমার কণ্ঠে পেয়েছিল দৃপ্ত সাহসী উচ্চারণ।

“বিচার চাই”—এই শব্দদুটি শুধু স্লোগান নয়,
এ ছিল জাতির আত্মা ফিরে পাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়।
ঘাতক দালাল নির্মূলের সেই দীর্ঘ সংগ্রামে,
তুমি ছিলে পথপ্রদর্শক অটল সত্যের নামে।

সোহরাওয়ার্দীর সবুজ বুকে গণআদালতের দিন,
ইতিহাস থমকে শুনেছিল ন্যায়বিচারের ঋণ।
গোলাম আযমের বিচারের সেই প্রতীকী আসনে,
তোমার উপস্থিতি মানে বিবেকের উচ্চ ঘোষণা।

বিচারকের কাঠগড়ায় নয়, দাঁড়িয়েছিল চেতনা,
শত শহীদের রক্ত তখন পেয়েছিল ভাষা।
আইনের বাইরেও আছে ন্যায়—শিখিয়েছো জাতিকে,
মরাল শক্তির জয় যে বড় রাষ্ট্রীয় ভীতিকে।

বিশ বছর ধরে নেতৃত্ব দিলে অবিরাম লড়াই,
ক্লান্তি নয়, বয়স নয়—তোমার কাছে তুচ্ছ তাই।
যতদিন শ্বাস ছিল বুকে, কলম ছিল হাতে,
ততদিনই যুদ্ধ চলেছে অন্ধকারের সাথে।

Manual1 Ad Code

মৌলবাদের বিষবৃক্ষ যখন ছড়ায় শেকড়,
তুমি ছিলে যুক্তির ধারালো, আলোকিত এক তরবারি।
সাম্প্রদায়িকতার দেয়াল ভাঙতে দক্ষিণ এশিয়ায়,
তোমার কণ্ঠে এক হয়েছিল প্রগতির মহাসমাবেশ।

সংস্কৃতি, স্মৃতি, সংগ্রাম—তিনটি শব্দ এক সুতোয়,
তোমার জীবনে মিলেছে তা অবিচ্ছিন্ন স্রোতোধারায়।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রাখতে যে কেন্দ্র গড়ে উঠল,
তার নেপথ্যে ছিল তোমার চিন্তার দীপ্ত মূল।

সভাপতির আসন নয়, ছিল দায়িত্বের ভার,
তোমার পদচারণায় ভারী হয়েছে ইতিহাসের পাল্লা।
কথায় নয়, কর্মে তুমি শিখিয়েছো প্রজন্মকে,
কীভাবে মাথা উঁচু রেখে বাঁচতে হয় স্বাধীনকে।

আজ তুমি নেই—এই কথাটি মিথ্যে মনে হয়,
কারণ তোমার আদর্শ আজো প্রতিটি কণ্ঠে রয়।
যে তরুণ প্রশ্ন তোলে, যে লেখে প্রতিবাদ,
সে-ই বহন করে চলে তোমার চিন্তার উত্তরাধিকার।

এক শত তিনটি জন্মদিন মানে শুধু সংখ্যা নয়,
এ এক শত তিনটি শপথ—ন্যায়ের, সত্যের, জয়।
কবীর চৌধুরী, তুমি আজো আমাদের ভেতর,
আলোকিত এক নক্ষত্র, অমলিন, অক্ষয়, নিরন্তর।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ