যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তি কার্যকর হলে বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতি হবে ১,৩২৭ কোটি: সিপিডি

প্রকাশিত: ৬:১০ অপরাহ্ণ, মার্চ ১০, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তি কার্যকর হলে বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতি হবে ১,৩২৭ কোটি: সিপিডি

Manual3 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা‎, ১০ মার্চ ২০২৬ : বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে করা বাণিজ্যচুক্তি কার্যকর হলে বছরে সরকারের প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। একই সঙ্গে চুক্তির কারণে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতাভুক্ত অন্যান্য দেশকেও একই ধরনের সুবিধা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে, যা ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

আজ মঙ্গলবার (১০ মার্চ ২০২৬) রাজধানীর ধানমন্ডিতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির কার্যালয়ে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সুপারিশসমূহ’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ শীর্ষক একটি বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। এ ছাড়া আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০ ধরনের পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার কথা রয়েছে।

ড. ফাহমিদা বলেন, এসব পণ্য থেকে সরকারের বছরে প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক রাজস্ব আসে। চুক্তি কার্যকর হলে সরকার এই রাজস্ব আয় হারাতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়া ডব্লিউটিও নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এর ফলে ডব্লিউটিওর আওতাভুক্ত অন্যান্য সদস্য দেশকেও একই সুবিধা দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য কেনার শর্ত থাকায় সরকারের ব্যয়ও বাড়তে পারে। এ কারণে চুক্তিটির রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের ওপর প্রভাব সরকারকে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা দরকার।

এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ওই চুক্তির বিষয়বস্তু উন্মুক্ত করা প্রয়োজন, কারণ, এতে বেশ কিছু আর্থিক ঝুঁকির বিষয় রয়েছে।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের বড় অংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বেসরকারি খাতকে যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে উৎসাহিত করতে হয়, তাহলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতে পারে। না হলে তারা কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই পণ্য আমদানি করবে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। এ ছাড়া তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, কোথা থেকে পণ্য কেনা যাবে বা যাবে না—এ ধরনের বিষয়ও এতে জড়িত, যা দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও প্রভাব ফেলতে পারে।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার পর এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ চাইলে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে।

মিডিয়া ব্রিফিংয়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন ড. ফাহমিদা খাতুন।

Manual1 Ad Code

তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্য সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ হারে রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা বাস্তবে সম্ভব নয়।

Manual2 Ad Code

তিনি জানান, বর্তমানে রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক খাতের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। বিপরীতে ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ফলে আর্থিক খাতে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও কমে যাচ্ছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে, কারণ, বাংলাদেশের জ্বালানির বড় অংশ ওই অঞ্চল থেকে আমদানি করা হয়।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ২০ দশমিক ৩ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আর চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে, বিপরীতে জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।

রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতির আশঙ্কা

সিপিডির বিশ্লেষণে বলা হয়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। অথচ পুরো অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়নে ধীরগতি

Manual3 Ad Code

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ধীরগতি দেখা গেছে। সিপিডির তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০ দশমিক ৩ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে, খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করা হয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কর কমানোর সুপারিশ

Manual1 Ad Code

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর কমানোর সুপারিশ করেছে সিপিডি। সৌর প্যানেল, বায়ু টারবাইন ও ব্যাটারি স্টোরেজের মতো পণ্যের ওপর বিদ্যমান শুল্ক এবং কর কমালে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়বে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

এ কারণে এসব পণ্যের ওপর কাস্টমস ডিউটি সর্বোচ্চ ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

তামাকজাত পণ্যে কর বাড়ানোর প্রস্তাব

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে সিপিডি। প্রস্তাব অনুযায়ী সিগারেট, বিড়ি, জর্দা ও গুলের ওপর স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ এবং ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া জর্দা ও গুলের ওপর প্রতি গ্রামে ৬ টাকা নির্দিষ্ট আবগারি শুল্ক আরোপেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষায় জোর

প্রতিবেদনে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সার সরবরাহ নিশ্চিত করা ও খাল পুনঃখননের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ