সিলেট ৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৪, ২০২৩
পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের বর্ষগণনা রীতি আছে; প্রচলিত আছে অনেক সন বা অব্দ। পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিভিন্ন জনগোষ্ঠির মধ্যে জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনেই এই সময়-গণনার পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়। এইসব বর্ষগণনারীতির অনেকগুলো যেমন সৌর পদ্ধতির তেমনি আবার অনেক সন বা অব্দ আছে যেগুলো চন্দ্রের আবর্তন বা চান্দ্র পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রচলিত। এখনও সারা পৃথিবী জুড়ে অনেক বর্ষগণনারীতির প্রচলন আমরা দেখি এগুলোর মধ্যে খ্রিষ্টীয় সন বা খ্রিষ্টাব্দ সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত এবং জনপ্রিয়। আমাদের এই অঞ্চলে বা বাংলাদেশে একসময় শতাব্দের ব্যাপক প্রচলন ছিলো। এখনও পঞ্জিকায় আমরা শতাব্দের উল্লেখ পাই। একসময় হিজরী সনেরও ব্যাপক প্রচলন ছিলো আমাদের সমাজে। ‘হিজরী অব্দ’ চান্দ্র সন। ইসলাম ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি হিজরী সনের দিন তারিখ অনুযায়ীই নির্ধারিত ও প্রতিপালিত হয়। তেমনি এদেশে এখন সৌর পদ্ধতি অনুযায়ী গণনা করা সন ‘বঙ্গাব্দ’ ব্যাপকভাবে প্রচলিত হলেও সনাতন হিন্দু ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর যাবতীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি এখনও চান্দ্র মাস অনুযায়ীই পরিপালিত হয়। এই অঞ্চলে একসময় ‘চৈতন্যাব্দ’ ‘বুদ্ধাব্দ’ ইত্যাদি সনও প্রচলিত ছিলো। চান্দ্র বর্ষ অনুযায়ী হিসাব করা সনের ক্ষেত্রে সৌর সনের তুলনায় প্রায় এগারো দিন কম থাকে। সৌর ও চান্দ্র বর্ষের হিসেবে এই বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষে পরবর্তীতে চান্দ্র বর্ষের হিসাবে প্রায় প্রতি তিন বছর পর এক মাস যোগ করার প্রথা প্রচলিত হয়। এই মাসকে বলা হয় ‘মলমাস’।
মণিপুরীদের প্রাচীন ইতিহাস অনুযায়ী মণিপুরে সেই প্রাচীন কাল থেকে একটি বর্ষগণনার পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। ‘মলিয়াফম পালচা কুম’ বা সংক্ষেপে ‘মলিয়াকুম’ নামে পরিচিত এই বর্ষগণনারীতি অনুযায়ী এবছর (২০২৩ খ্রি.) বুধবার (২২ মার্চ) থেকে শুরু হচ্ছে মণিপুরী সন ‘মলিয়াকুম’-এর ৩৪২১তম বর্ষ। যে কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠীর মতো মণিপুরের প্রাচীন ইতিহাসও কিছুটা কুয়াশাচ্ছন্নতায় ঢাকা। একসময় মণিপুর উপত্যকায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেকগুলো গোত্ররাজত্ব ছিলো। মণিপুরীদের মধ্যে সাতটি য়েক বা শালাই আছে, যা সনাতন ধর্ম গ্রহণ পরবর্তী সময়ে হিন্দুদের গোত্রনামের সাথে সমন্বিত করা হয়। এই সাতটি য়েক বা শালাই হলো: নিংথৌজা, অঙোম, লুওয়াং, খুমন, মোইরাং, চেংলৈ ও খাবা-ঙানবা। খ্রিষ্টীয় ৩৩ অব্দে মণিপুরের রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন নিংথৌজা গোত্রের প্রধান পাখংবা। তারপর থেকে মণিপুরের একটি ধারাবাহিক ও গ্রহণযোগ্য তথ্যসমৃদ্ধ ইতিহাস আমরা পাই। পরবর্তীতে রাজার তত্ত্বাবধানে রাজকীয় পন্ডিতদের মাধ্যমে দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি লিপিবদ্ধ করার প্রথা প্রচলিত হয়। ‘চৈথারোল কুম্বাবা’ নামের এই রাজকীয় ঘটনাপঞ্জিই মণিপুরের পরবর্তী ইতিহাসের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। পাখংবার পরে মণিপুরে ঐ একই বংশের শাসনধারা অব্যাহত থাকে এবং ১৯৫৫ সালে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালুর পূর্ব পর্যন্ত মোট ৭৬ জন রাজা রাজত্ব করেছেন। তবে পাখংবার আগেও মণিপুরে অনেক রাজা রাজত্ব করেছেন। এ ব্যাপারে সঠিক তথ্যনির্ভর ইতিহাস জানা না গেলেও কমপক্ষে আটাশজন রাজার রাজত্ব করার কথা জানা যায়। এই তালিকায় আঠারো নম্বরে আছেন ‘মোরিয়া ফম্বালচা’ নামের একজন রাজা। কেউ কেউ তাকে ‘মলিয়া ফম্বালচা’ বা ‘মলিয়াফম পালচা’ নামেও উল্লেখ করেছেন। প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যমতে তিনি ছিলেন রাজা কাংবা-র জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং তাঁর নাম ছিলো ‘কোইকোই’। সিংহাসনে আরোহণের সময় তিনি ‘মোরিয়া ফম্বালচা’ নাম ধারণ করেন। তিনিই প্রথম মণিপুরীদের বর্ষগণনার পদ্ধতি চালু করেন। এই সন বা অব্দ তাঁরই নামানুসারে ‘মলিয়াফম পালচা কুম’ বা সংক্ষেপে ‘মলিয়াকুম’ নামে পরিচিত হয়। উল্লেখ্য, মণিপুরী ভাষায় ‘কুম’ অর্থ বর্ষ বা সন। তাঁর রাজত্বকাল ১৩৭৯ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দ বলে অনুমান করা হয়। কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন অনেক প্রাচীনকাল থেকেই মণিপুরের মোইরাং অঞ্চলের সাথে মৌর্য সভ্যতার একটি যোগসূত্র গড়ে উঠেছিলো। তারই ধারাবাহিকতায় রাজা কাংবা-র জ্যেষ্ঠ পুত্র কোইকোই যখন রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন তখন তিনি ‘মোরিয়া ফম্বালচা’ (হয়তোবা ‘মৌর্য’ শব্দের অপভ্রংশ হিসেবে) নাম ধারণ করেন। তবে এই অনুমিতির পেছনে তথ্যনির্ভর কোনো ঐতিহাসিক সূত্র পাওয়া যায় নি। তাছাড়া মৌর্য সভ্যতার সাথে যোগসূত্র খুঁজে বের করা বা বর্ষগণনারীতি চালু করার ক্ষেত্রে সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য লক্ষ করা যায়। সে যাই হোক সেই প্রাচীনকাল থেকেই মণিপুরে এই ‘মলিয়াফম পালচা কুম’ বা সংক্ষেপে ‘মলিয়াকুম’ প্রচলিত ছিলো। এই বর্ষগণনারীতি ছিলো চান্দ্র পদ্ধতির অনুসরণে। এই পদ্ধতিতে বর্ষগণননার কারণে নববর্ষ উদযাপনের তারিখটি প্রতি বছরই পরিবর্তিত হয়, কিছুদিন এগিয়ে আসে অথবা পিছিয়ে যায়। ২০১৫ খ্রি. মণিপুরী নববর্ষ উদযাপিত হয়েছিলো খ্রিষ্টীয় সনের হিসেবে ২১ মার্চ তারিখে। আর এবার (২০২৩ খ্রি.) এই উৎসব উদযাপিত হচ্ছে বুধবার (২২ মার্চ)। পরবর্তীতে ইতিহাসের এক পর্যায়ে অষ্টাদশ শতাব্দীতে মণিপুরীরা সাধারণভাবে সনাতন ধর্মের চৈতন্য প্রবর্তিত বৈষ্ণব ধারার অনুসারী হয়ে ওঠেন। তারই ধারাবাহিকতায় ধর্ম ও সংস্কৃতির নানা সূত্রে বাংলার সাথে এক নিকট-সম্পর্ক গড়ে ওঠার প্রেক্ষিতে মণিপুরী সমাজে বঙ্গাব্দের প্রচলন শুরু হয়। বঙ্গাব্দ যেহেতু সৌর সন, তাই এর বেশ কিছু সুবিধার কথা বিবেচনা করে এই সন ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং সেই অনুযায়ী মণিপুরী সমাজেও বাংলা পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন প্রচলিত হতে থাকে। এখনও মণিপুরী সমাজে ‘মলিয়াকুম’ এবং ‘বঙ্গাব্দ’ এই দুই সনের প্রথম দিনে নববর্ষ উদযাপনের প্রথা প্রচলিত আছে। মণিপুরী সন গণনার হিসেব অনুযায়ী বারোটি মাসের নাম হলো। শজিবু, কালেন, ইঙা, ইঙেন, থওয়ান, লাংবন, মেরা, হিয়াঙ্গৈ, পোইনু, ওয়াকচিং, ফাইরেন, লমতা। মণিপুরী ভাষায় নববর্ষকে বলা হয় ‘অনৌবা কুম’ তবে এই উৎসবকে বলা হয় ‘শজিবু চৈরাউবা’ বা শুধুই ‘চৈরাউবা’। ‘চৈরাউবা’ শব্দবন্ধটি দুটি পৃথক শব্দ ‘চৈ’ অর্থাৎ লাঠি বা দ- এবং ‘রাউবা’ বা ‘লাউবা’ অর্থাৎ চীৎকার বা উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা দেওয়া, এই দুইটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। সেই প্রাচীনকাল থেকেই রাজাদের আমলে একজন বিশেষ ব্যক্তিকে নির্বাচন করা হতো নতুন বছরের ভালোমন্দের দায়দায়িত্ব নেওয়ার জন্যে। নববর্ষের আগেরদিন তাঁকে নিয়োগ দেয়া হতো এবং তাঁর হাতে একটি বিশেষ কাষ্ঠদ- প্রদান করা হতো। তিনি ঐ কাষ্ঠদ- মাটিতে আঘাত করে ঐ দায়িত্ব গ্রহণের কথা ঘোষণা করতেন। এটিকে বলা হতো ‘চৈথাবা’; ‘চৈ’ মানে দ- আর ‘থাবা’ অর্থ মাটিতে স্থাপন বা আঘাত করা। ঐ ব্যক্তির পরিচিতি হতো ‘চৈথাবা’ নামে। নতুন বছরটি ঐ ব্যক্তির নামে প্রচলিত হতো। অর্থাৎ ঐ বছরের মধ্যে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সকল ঘটনা রাজকীয় ঘটনাপঞ্জি ‘চৈথারোল কুম্বাবা’ বা অন্য কোনো নথিপত্রাদিতে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে চৈথাবা ব্যক্তির নামোল্লেখ করে করা হতো। এই দায়িত্ব গ্রহণের জন্যে চৈথাবা ব্যক্তিকে রাজার তরফ থেকে মূল্যবান উপহার বা আর্থিক সুবিধাদি প্রদান করা হতো। নববর্ষের ভোরে চৈথাবা ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে ঘন্টা হাতে একটি কাষ্ঠদ-ের মাথায় পতাকা লাগিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে প্রজাসাধারণকে জানান দিয়ে নববর্ষের সূচনা হয়েছে বলে উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা দিতেন। এটিকে বলা হয় ‘চৈরাউবা’।
চৈরাউবা বা নববর্ষের দিনে নানা ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানাদির পাশাপাশি বিভিন্ন ক্রীড়ানুষ্ঠান বা আনন্দ উৎসবের আয়োজন করা হয়ে থাকে। মণিপুরী বিশ্বাস মতে, এই দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মণিপুরীদের অধিকাংশই যদিও এখন চৈতন্য প্রবর্তিত বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী, তবু প্রতিটি মণিপুরী গৃহেই গৃহদেবতা হিসেবে পূজিত হন মণিপুরীদের আদি ধর্মের প্রধান দেবতা সানামহী এবং গুরুত্বপূর্ণ দেবী লৈমরেন ও ইমোইনু। বিশ্বাস করা হয়ে থাকে যে, বছরের প্রথম দিনে সানামহী দেবতা প্রতিটি গৃহের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে তাঁর জন্য নির্ধারিত আসনে অপেক্ষা করেন শ্রদ্ধার্ঘ গ্রহণের জন্যে। মণিপুরী মিথ অনুযায়ী বছরের প্রথম মাসটি খুবই পবিত্র। এই মাসেই প্রথম পৃথিবীতে নয় ধরনের প্রাণের উদ্ভব ঘটে। এইগুলো হলো: মানব জাতি, পশু প্রাণী, মৎস্য, পোকামাকড়, মশা, বৃক্ষ, বাঁশ, ডাল জাতীয় উদ্ভিদ ও অন্যান্য গুল্ম। এইসব প্রাণ মাটি ফুঁড়ে ‘শজি’ অর্থাৎ হরিণের শিঙের মতো পৃথিবীতে উদ্ভুত হয় বলে এই মাসের নাম ‘শজিবু’। চৈরাউবার দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ঘরদোর বাসন-কোসন সব লেপে-মুছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়। মেয়েরা দেবতার সামনে অর্ঘ্য হিসেবে দেওয়ার জন্য ‘অথেলপোৎ’ সাজায়। এই অথেলপোৎ-এ চাল, কাঁচা সবজি, বিভিন্ন ফলমূল এবং ফুল থাকে। এগুলো সানামহী দেবতা এবং দেবী লৈমরেন ও ইমোইনুর সামনে রেখে পরিবারের সবাই মিলে প্রণাম করে। তারপর বিভিন্ন নিরামিষ তরকারি দিয়ে দুপুরের ভূরিভোজ রান্না করে গোল করে কাটা কলাপাতায় সুন্দর করে সাজিয়ে প্রথমে দেবতাকে ভোগ দেওয়া হয়, পরে ঘরের বাইরে রাস্তায় কিছু জায়গা পরিস্কার করে সেখানেও বনদেবতার উদ্দেশে ভোগ দেওয়া হয়। তারপর পরিবারের সবাই একসাথে বসে হাসি-আনন্দে দুপুরের আহার গ্রহণ করে। তার আগে এইসব তরকারির কিছু অংশ প্রতিবেশিদের মধ্যেও ভাগ করে দেওয়া হয়। বিকেলে সুন্দর কাপড়-চোপড় পড়ে পবিত্র পাহাড় ‘চৈরাউচীং’-এ আরোহণ করে এবং সেখানে অবস্থিত দেব-দেবীদের পূজো করে। চৈরাউবা বা নববর্ষ উদযাপনের কর্মসূচি আসলে শুরু হয় আরো কিছুদিন আগে থেকে। নববর্ষের আগে সুবিধাজনক যে কোনো রাতে ‘শারোয় ঙারোয় খাঙবা’ বা বনদেবতার পূজো করার প্রথা প্রচলিত আছে। এছাড়া চৈরাউবার আগের রাত না ঘুমিয়ে সারারাত জেগে যুবক-যুবতীরা কড়ি খেলে। মণিপুরী লোকবিশ্বাসে এই রাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ; এই রাতকে বলা হয় ভাগ্যরজনী। এই রাতেই দেবতারা মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে থাকেন। তাই সবাই মিলে খেলাধুলা করে হাসি-আনন্দে কাটিয়ে দেয় তারা যাতে পরবর্তী বৎসর কোনো ধরনের দুঃখ-কষ্ট ছাড়া হাসি-আনন্দে কেটে যায় তাদের জীবন। শুধু এই রাত নয়, চৈরাউবার পরের পাঁচদিনও মণিপুরীরা খুব কঠিন কোনো কাজে নিযুক্ত না হয়ে কড়ি খেলে হাসি-আনন্দেই কাটিয়ে দেয়। চৈরাউবা উৎসবের সাথে আরো একটি খেলার নামও যুক্ত আছে অবিচ্ছেদ্যভাবে। এই খেলা হলো ‘কাং খেলা’। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় ‘কাং খেলা’ সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিচে তুলে ধরা হলো।
মণিপুরীদের একটি ঐতিহ্যবাহী খেলার নাম ‘কাং খেলা’। ইতিহাসের সেই প্রাচীন কাল থেকেই মণিপুরী সমাজে কাং খেলার প্রচলন ছিল। প্রাপ্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায় দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মণিপুরে রাজত্বকারী রাজা লোইতোংবার শাসনামলে এই ‘কাং খেলা’র উদ্ভব। ১১১৭ খ্রিষ্টাব্দে নববর্ষের দিনে ভূরিভোজনের পর রাজা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে উঠে দেখেন শরীরটা তাঁর কেমন ম্যাজম্যাজ করছে। তাই তিনি শরীরের জড়তা কাটানোর জন্য যখন নিজ গৃহপ্রাঙ্গণে একাকী হাঁটছিলেন, তখন তিনি দেখেন সেখানে দু’টি ‘কাংখিল’ পড়ে আছে। ‘কাংখিল’ হলো এক ধরনের গাছের বীজ, প্রায় দেড় ইঞ্চি ব্যাসের এবং অর্ধ ইঞ্চি পুরো অনেকটা গোলাকার এই বীজ লাল রঙের শক্ত ও মসৃণ খোসা দ্বারা আবৃত। তিনি অনেকটা মনের খেয়ালে একটি কাংখিল তুলে একটু জোরে গড়িয়ে দিলেন প্রাঙ্গণের অপর প্রান্তের দিকে। কাংখিলটি মসৃণ প্রাঙ্গণের উপর পিছলে গিয়ে অনেক দূর গিয়ে থামলো। অপর কাংখিলটিও তিনি একইভাবে গড়াতে গিয়ে দেখেন সেটি এবড়ো-থেবড়োভাবে গড়িয়ে কিছুদূর গিয়েই থেমে গেলো। রাজার পার্ষদ যিনি কাছেই দাঁড়িয়ে ব্যাপারটি লক্ষ করছিলেন তিনি রাজাকে অনুরোধ করলেন কাছের কাংখিলটিকে তুলে নিয়ে একটু জোরে গড়িয়ে দিয়ে দূরের কাংখিলটিকে আঘাত করতে। রাজা তাই করলেন। কিন্তু আঘাত করতে পারলেন না। তাঁর জিদ চেপে গেলো। তিনি আবার চেষ্টা করলেন, এভাবে বারবার এক কাংখিল ছুঁড়ে আরেক কাংখিলকে আঘাত করতে থাকলেন। কখনো লক্ষ্যভেদ হয়েছে, কখনোবা হয়নি। রাজা এতে বেশ মজা পেয়ে গেলেন। এই উঠা-বসা এবং ছোটাছুটিতে তাঁর অতিভোজন এবং ঘুমজনিত ক্লান্তি ও জড়তা কেটে গেলো। তিনি শারীরিকভাবে বেশ স্বস্তি অনুভব করলেন। পরে তিনি কিছু কিছু মৌখিক নিয়ম তৈরি করে পারিবারিক সদস্যদের সাথে বা নিকট পার্ষদদের নিয়ে এটিকে এক ধরনের খেলা হিসেবেই চালিয়ে যেতে লাগলেন। ‘কাংখিল’ বা সংক্ষেপে ‘কাং’ গড়িয়ে গড়িয়ে যাওয়া বা ‘থরো থরো ওনবা’ থেকে এই খেলা ‘কাং-থরো’ খেলা বলে পরিচিত হয়ে ওঠে।
/পরবর্তীতে নানা পর্যায় পেরিয়ে অনেক বিধি-বিধান আর নীতি-নিয়ম যুক্ত হয়ে কাং খেলা একটি আধুনিক ক্রীড়ার রূপ পরিগ্রহ করে। কাং খেলার প্রধান উপকরণ ‘কাং’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে হাতির দাঁত, কচ্ছপের বুকের খোল, মহিষের শিং দিয়ে তৈরি কাং। ১৮৫১ সালে মহারাজ চন্দ্রকীর্ত্তি সিংহ মণিপুরের রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তিনি কাং খেলার জন্য নির্দিষ্ট কোর্ট তৈরি করা, দল গঠন প্রক্রিয়া এবং খেলার নিয়মাবলী সুনির্দিষ্ট করে এই খেলাটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। কাং খেলা ছড়িয়ে পড়ে মণিপুরের সর্বত্র, এমনকি মণিপুরের বাইরে মণিপুরী অধ্যুষিত সকল অঞ্চলে। সময় পরিক্রমায় বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত কাং খেলার নিয়মাবলীতে বা কাং হিসেবে ব্যবহৃত ক্রীড়া-উপকরণের আকার বা প্রকৃতিতেও কিছু কিছু ভিন্নতা দেখা দেয়। ১৯৫২ সালে মণিপুরীদের ঐতিহ্যবাহী এই ক্রীড়া-পদ্ধতিতে অনেক পরিবর্তন এনে, সর্বজনগ্রাহ্য নীতিনিয়ম প্রণয়ন করে এবং ‘কাং’-এর সাইজ ও নির্মাণ-প্রক্রিয়া সুনির্দিষ্ট করে এই খেলাটিকে জাতীয় খেলার অংশ করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। এই লক্ষে বিভিন্ন সংগঠন গড়ে তোলা হয়, এমনকি এই খেলাটিকে পৃষ্ঠপোষণা ও সুনিয়ন্ত্রিত করার উদ্দেশে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে ‘কাং এসোসিয়েশন’ গড়ে তোলা হয়। মণিপুরের ভেতরে বিভিন্ন দল গঠন করে কাং প্রতিযোগিতা, টুর্ণামেন্ট ইত্যাদির নিয়মিত আয়োজনের পাশাপাশি মণিপুরের বাইরে মণিপুরী অধ্যুষিত ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের দল নিয়ে কাং টুর্ণামেন্টের আয়োজন করা হচ্ছে; এমনকি বাংলাদেশ দলের অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এই খেলা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, এমনকি অমণিপুরী খোলোয়াড়েরাও এই খেলা রপ্ত করে দল গঠনপূর্বক প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। ভারতের জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার অন্যতম বিষয় হিসেবে এই খেলাটিকে ক্রীড়াসূচিতে অন্তর্ভুক্তির দাবি দীর্ঘদিনের এবং আশা করা হচ্ছে খুব শীঘ্র তা বাস্তবায়িতও হবে। আগামীতে সাফ গেমসের ক্রীড়াসূচিতেও এই খেলাটিকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষে মণিপুর সরকার এখন থেকেই কাজ করে যাচ্ছে। কাং খেলার জন্য ‘কাং শঙ’ বা কোনো ম-পে আয়তাকার একটি ক্ষেত্র তৈরী করা হয়। এই ক্ষেত্র দৈর্ঘ্যে ৪৭ ফুট এবং প্রস্থে ২০ ফুট পরিমাপের থাকে। তবে, জুনিয়র গ্রুপ বা মহিলা খেলায়াড়দের জন্য এই কোর্টের মাপ থাকে দৈর্ঘ্যে ৩৮ ফুট ও প্রস্থে ১৮ ফুট। দুইটি দলের মধ্যে এই খেলা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি দলের খেলোয়াড় সংখ্যা ৭ জন। দুই দলেই অতিরিক্ত খেলোয়াড় নেওয়ার ব্যবস্থা থাকে এবং খেলা চলাকালীন সময়ে আম্পায়ারের সম্মতি নিয়ে খেলোয়াড় পরিবর্তনের বিধান প্রচলিত। খেলা পরিচালনা করেন আম্পায়ার; কখনো কখনো একাধিক আম্পায়ারও থাকেন। আর থাকেন দুই দলের খেলোয়াড়দের অর্জিত পয়েন্টের হিসাব রাখার জন্য ‘স্কোর বোর্ড’ ও ‘স্কোরার’। কাং খেলার জন্য প্রয়োজন হয় মূল উপকরণ হিসেবে ‘কাং’। প্রত্যেক খেলোয়াড়ের জন্য একটি করে কাং বরাদ্দ করা হয়। আগে একসময় কাং হাতির দাঁত, মহিষের শিং, কচ্ছপের বুকের খোল ইত্যাদি বিভিন্ন উপকরণে তৈরী হলেও এবং আকারও ভিন্ন ভিন্ন হওয়ার উদাহরণ দেখা গেলেও এখন কাং খেলা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার প্রেক্ষিতে খেলার উপকরণ বা নিয়মাবলী সবকিছু নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এগুলোর সামান্য ব্যত্যয়ও গ্রহণযোগ্য হয় না। এখন ‘কাং’ প্লাস্টিকের সাথে বিভিন্ন উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করা হয়। পুরোটাই মসৃণ হলেও নিচের দিকটা খুব মসৃণ থাকে। রঙ হালকা কালো। প্রায় ডিম্বাকৃতির কাং-এর আকার দৈর্ঘ্যে ১৪ সেন্টিমিটার ও প্রস্থে ৯ সেন্টিমিটার এবং প্রায় ১ সেন্টিমিটার পুরো থাকে। ‘কাং’ ছাড়াও কাং খেলায় প্রয়োজন হয় ‘কাংখিল’ বা লক্ষ্যবস্তু। কাংখিল সাধারণত প্লাস্টিকের তৈরি এবং দৈর্ঘ্যে প্রস্থে ও উচ্চতায় থাকে প্রায় দেড় সেন্টিমিটার। তাছাড়া কাংকে মসৃণ করার জন্যে মোম এবং এক টুকরো কাপড়ও ব্যবহৃত হয়, যেখানে মোম লাগিয়ে কাং ঘষে ঘষে এর তলভাগকে মসৃণ করা হয়। কাং যাতে মসৃণভাবে চলতে পারে সেজন্যে কাং খেলার কোর্টে ধানের তুষ ও চালের গুঁড়ো ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কাং খেলায় দু’টি অংশ থাকেÑ‘চেকফৈ’ ও ‘লমথা’। প্রথমে এক দলের খেলোয়াড় খেলা শুরু করে চেকফৈ মারার মধ্য দিয়ে। চেকফৈ মারতে হয় দাঁড়িয়ে। একজন খেলোয়াড় একবারই চেকফৈ মারতে পারেন। ঐ খেলোয়াড়ের ছুঁড়ে দেওয়া কাং যদি অপরদিকের নির্ধারিত কাংখিলকে আঘাত করতে পারে তাহলে তা হিসেবে রাখা হয়। দু’জন খেলোয়াড় যদি এভাবে কাংখিল ছুঁতে পারে তাহলে ঐ দলের লমথা মারার যোগ্যতা অর্জিত হয়। লমথা মারতে হয় বসে, আঙুলের শক্তিতে কাংকে অপরপ্রান্তে পৌঁছে দিয়ে। এই ক্ষেত্রেও একজন খেলোয়াড় একবারই লমথা মারতে পারেন। কোনো খেলোয়াড়ের লমথার কাং যদি অপরপ্রান্তের নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুকে যথানিয়মে আঘাত করতে পারে তাহলে একটি পয়েন্ট অর্জিত হয়। তখন আবার প্রথম থেকে এই পর্যায় শুরু হয়। এইভাবে চলতে থাকে যতক্ষণ ঐ দলটি পয়েন্ট অর্জন করতে পারে। পয়েন্ট অর্জনে ব্যর্থ হলে অর্থাৎ চেকফৈ বা লমথা ঠিকমত লক্ষ্যবস্তু আঘাতে ব্যর্থ হলে ঐ দলটির খেলা আপাতত সমাপ্ত হয়। অপরপক্ষ তখন একই নিয়মে খেলা শুরু করে এবং পয়েন্ট অর্জনের প্রচেষ্টা চালায়। এইভাবে খেলা এগিয়ে যেতে থাকে এবং নির্ধারিত সময় শেষে যে দলের পয়েন্ট বেশি থাকে তারাই জয়ী হয় খেলায়।
চৈরাউবা উৎসবের সময় লাইহারাউবাসহ বিভিন্ন লোকনৃত্যের পরিবেশনাও হয়ে থাকে। তবে ‘থাবল চোংবা’ বা ‘থাবল চোংবী’ নৃত্যের প্রচলন খুব বেশি। দোল পূর্ণিমার পর থেকেই থাবল চোংবী নৃত্যের পরিবেশনা শুরু হয়ে যায়। বিভিন্ন এলাকায় যুবক-যুবতীরা মিলে এই লোকনৃত্যের আয়োজন করে থাকে। জ্যোৎস্নালোকিত রাত্রে খোলামাঠে একদল যুবক-যুবতীর অংশগ্রহণে ঢোল বা ব্যান্ডের তালে তালে অনুষ্ঠিত এক ধরনের লোকনৃত্য হলো এই ‘থাবল চোংবী’। ‘থাবল’ শব্দের অর্থ জ্যোৎস্না আর ‘চোংবা’ বা ‘চোংবী’ অর্থ লাফ দেয়া বা নাচ। এই নৃত্যের সাথে জড়িয়ে আছে একটি মিথ। আসলে ভারতীয় ঐতিহ্য অনুসারে সাধারণভাবে যে কোনো নৃত্যেরই জন্ম হয় এক ধর্মীয় আবহ থেকে। পরে ক্রমশ ধর্ম গৌণ হয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। এভাবেই এসব নৃত্য প্রকৃত লোকনৃত্য হয়ে ওঠে। থাবলচোংবী এই নৃত্যটিও শুরু হয়েছিলো এক ধর্মীয় কাহিনীকে কেন্দ্র করে। কাহিনীটি এরকম মহান স্রষ্টা অতিয়া গুরু শিদাবা একদিন মনস্থির করলেন যে, তাঁর দুই পুত্রের মধ্যে যিনি যোগ্যতর তাঁকে তাঁর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনীত করবেন। তাই তিনি তাঁর দুই পুত্র সানামহী ও পাখংবাকে ডেকে বললেন, সমগ্র পৃথিবী সাতবার প্রদক্ষিণ করে যিনি আগে ফিরে আসতে পারবেন তিনিই হবেন তাঁর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। শক্তিমান এবং জ্যেষ্ঠ পুত্র সানামহী উৎফুল্লচিত্তে তক্ষুণি বেরিয়ে পড়লেন পৃথিবী প্রদক্ষিণে। কিন্তু অনুজ পাখংবা তাঁর নিজের শারীরিক অসমর্থতার কারণে এ-প্রতিযোগিতায় পরাজিত হবে নিশ্চিত জেনে পৃথিবী প্রদক্ষিণে না গিয়ে বিষণœ মনে বসে রইলেন ঘরের কোণে। কনিষ্ঠ পুত্রের এই বিষণ্নতা দেখে দুঃখিত মাতা লৈমরেন কারণ জিজ্ঞাসা করলে পাখংবা সমস্ত ঘটনা বিবৃত করলেন। তখন লৈমরেন দুঃখপরবশ হয়ে পাখংবাকে এই বলে পরামর্শ দিলেন যে, ‘তুমি তোমার পিতাকে সাতবার প্রদক্ষিণ করে প্রণাম করে বলো যে, পৃথিবীকে সাতবার প্রদক্ষিণ করা হয়েছে। কারণ, পিতা-ইতো এ-বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টিকর্তা। সুতরাং তাঁকে সাতবার প্রদক্ষিণ করা পৃথিবীকে সাতবার প্রদক্ষিণ করারই নামান্তর।’ মায়ের পরামর্শ অনুযায়ী পাখংবা তা’ই করলেন। গুরু শিদাবা অত্যন্ত প্রীত হয়ে পাখংবাকে এই প্রতিযোগিতায় জয়ী ঘোষণা করে সিংহাসনে বসিয়ে দিলেন। সানামহী যখন সত্যি সত্যি সাতবার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে এসে সিংহাসনে আসীন পিতাকে প্রণাম করতে উদ্যত হলেন, তখন তিনি স্তম্ভিত বিস্ময়ে লক্ষ্য করলেন তাঁর অনুজ পাখংবা বসে আছে সিংহাসনে। ক্ষুব্ধ সানামহী পাখংবাকে হত্যা করতে উদ্যত হলে পাখংবা প্রাণভয়ে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেয় অন্তঃপুরে। পাখংবার স্ত্রী ও অন্যান্য অন্তঃপুরবাসিনী নারীরা হাতে হাত ধরে পাখংবাকে মধ্যে রেখে বৃত্ত তৈরী করে সানামহীর ক্রোধাগ্নি থেকে তাঁকে রক্ষা করার প্রয়াস পায়। তারা তখন নৃত্যের তালে তালে গাইতে থাকেÑ
‘কে ক্রেক কে কে মো মো
য়াঙ্গোই শ্যাম্বা শ্যাও শ্যাও
তোকপগা কাম্বগা কৈ-গা য়েনগা
য়েনখোং ফত্তে চাশিল্লো
লাইগী য়েননি চাফদে।’
গানের ভাষায় সানামহী এবং পাখংবাকে বাঘ ও মোরগের প্রতীকে রূপায়িত করে বলা হচ্ছে মোরগের বাঁক অশুভ ইঙ্গিতবহ। সুতরাং তাকে খেয়ে ফেলা উচিত। কিন্তু এ-যে দেবতার মোরগ তাকে-তো খাওয়া যাবে না। অর্থাৎ ছোট ভাই হয়ে পাখংবা যে কাজ করেছে তা অন্যায়-অপরাধ। তাঁর শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু সেতো গুরু শিদাবার পুত্র তাকেতো হত্যা করা যাবে না। পরে গুরু শিদাবা সানামহীকে নিবৃত্ত করেন এবং তাঁকে এই বলে শান্ত করেন যে, পাখংবা মণিপুরের রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত হবেন সত্য, কিন্তু সানামহী হবেন সকল মণিপুরীদের রাজা এবং তাঁর অধিষ্ঠান হবে প্রতিটি মণিপুরী গৃহে। অবশেষে সানামহী শান্ত হয় এবং তদবধি প্রতিটি মণিপুরী গৃহেই গৃহদেবতা হিসেবে পূজিত হচ্ছেন সানামহী। এই ঘটনারই অনুকরণে অনুষ্ঠিত হতো ‘থাবল চোংবী’ নৃত্য এবং ‘কে ক্রেক কে কে মো মো’ এই গানের সাথে শুরু হতো থাবলচোংবী নৃত্যের পরিবেশনা। কিন্তু পরবর্তীতে এই ধর্মীয় আবহ থেকে বিযুক্ত হয়েছে থাবলচোংবী নৃত্য এবং এখন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই লোকনৃত্যে পরিবেশিত হয় বিভিন্ন ধরনের লোকসঙ্গীত। দোলপূর্ণিমার রাত্রি থেকে শুরু করে একমাস ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এ ধরনের নৃত্যানুষ্ঠান। এ নৃত্য সরল কিন্তু ব্যঞ্জনাময়। এ নৃত্যানুষ্ঠানে যুবক-যুবতীরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হাতে হাত ধরে রচনা করে এক বা একাধিক সারি। তারপর ঢোলের তালে তালে আর গানের সুরে সুরে আন্দোলিত হয় পা আর সঙ্গীর হাতে দৃঢ়বদ্ধ হাত। প্রথমে শুরু হয় খুব মৃদুলয়ে। কিন্তু ক্রমশ দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে থাকে তাল ও লয়। তারই পাশাপাশি গায়কের কণ্ঠের গ্রামও পাল্লা দিয়ে চড়তে থাকে। নৃত্যের তালে তালে এ মানব-শৃঙ্খল কখনো রচনা করে বৃত্ত বা অর্ধবৃত্ত; আবার কখনো এঁকেবেঁকে চলতে থাকে সর্পিল গতিতে। নৃত্যের এ-পর্যায়কে বলা হয়ে থাকে ‘লাইরেন মাথেক’ বা ড্রাগনের বাঁক। এ অংশটুকু খুব জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়ে থাকে। মণিপুরী লোকবিশ্বাসে নানা বিষয়ে ড্রাগনের উপস্থিতি, শক্তি বা ক্ষমতা নিয়ে অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে। ‘লাইরেন মাথেক’ চলাকালে নৃত্যে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের দৃঢ়বদ্ধ হাতের শৃঙ্খল ছিন্ন হওয়া অমার্জনীয় অপরাধ বলে বিবেচনা করা হয়। থাবলচোংবী নৃত্যে এখন শুধু ঢোলের ব্যবহার প্রায় উঠেই গেছেÑতার স্থান দখল করেছে আধুনিক ব্যা-পার্টি।
যে কোনো সমাজেই নববর্ষ উৎসবের সাথে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় নানা আচার-অনুষ্ঠান। কিন্তু ধর্মীয় আবহের বাইরে এসে একসময় এই উৎসব ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সেই জাতি বা জনগোষ্ঠির সকল মানুষের সার্বজনীন উৎসবের রূপ পরিগ্রহ করে। ‘মলিয়াকুম’ অনুযায়ী মণিপুরী নববর্ষ উদযাপন একসময় সকল মণিপুরী জনগোষ্ঠীর সার্বজনীন উৎসব ছিল। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে মণিপুরীরা চৈতন্য প্রবর্তিত বৈষ্ণব ধর্মের সামগ্রিক প্রভাববলয়ে আসার পর বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতির সাথে এক গভীর বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে। সেই সূত্র ধরে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ মণিপুরীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং মণিপুরী সমাজেও বাংলা সনের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপন প্রচলিত হয়। ‘মলিয়াকুম’ বা মণিপুরী সন, চান্দ্র সন হওয়ার কারণেও, ক্রমশ তার কার্যকারিতা হারায়। তারপরও অনেকেই মলিয়াকুমের প্রথম দিনেই নববর্ষ উদযাপন করে। এখনও মণিপুরী সমাজে বাংলা সন এবং মণিপুরী সন এই উভয় সনেরই প্রথম দিনে নববর্ষ উদযাপনের প্রথা প্রচলিত আছে। গৃহাভ্যন্তরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে, মণিপুরী সন বা বাংলা সন, যে কোনো সনেরই প্রথম দিনে নববর্ষ উদযাপিত হলেও বাইরের সার্বজনীন উৎসব হিসেবে উদযাপনের ক্ষেত্রে অবশ্যই মণিপুরী সনের প্রথম দিনে মণিপুরী নববর্ষ উদযাপনের আয়োজন জাতীয়ভাবে সকল মণিপুরী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। আগামীতে এই বিষয়টি সকলের বোধের আকাশকে স্পর্শ করবে এবং সকলের প্রাণপূর্ণ অংশগ্রহণে মণিপুরী সনের প্রথম দিনে মণিপুরী নববর্ষ উৎসব উদযাপন জাতীয় উৎসবের রূপ পরিগ্রহ করবে।
#
এ কে শেরাম
০৪ এপ্রিল ২০২৩

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি