সফল মা হিসেবে সেরা জয়িতা পুরস্কার পেলেন চা শ্রমিক কমলি রবি দাশ

প্রকাশিত: ৫:৩৭ অপরাহ্ণ, মার্চ ৮, ২০২৪

সফল মা হিসেবে সেরা জয়িতা পুরস্কার পেলেন চা শ্রমিক কমলি রবি দাশ

Manual5 Ad Code

বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৮ মার্চ ২০২৪ : প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জকে অতিক্রম করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনের স্বীকৃতিস্বরুপ জাতীয় পর্যায়ে সেরা পাঁচজন জয়িতাকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এবার সেই জাতীয় পর্যায়ে ‘সফল মা’ ক্যাটাগরিতে সেরা জয়িতা পুরস্কার পেয়েছেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কানিহাটি চা বাগানের শ্রমিক মা কমলি রবি দাশ।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে শুক্রবার (৮ মার্চ ২০২৪) ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘আলোচনা সভা ও জয়িতার পুরস্কার প্রদান’ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে এক লাখ টাকার চেক, ক্রেস্ট, উত্তরীয় ও সনদ গ্রহণ করেন চা-শ্রমিক মা কমলি রবিদাস।

এর আগে তিনি উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সম্মাননা পেয়েছেন। এবার জাতীয় জাতীয় পর্যায়ে সেরা জয়িতার পুরস্কার পেলেন।

পুরস্কার গ্রহণ করে ভীষণ আনন্দিত কমলি রবি দাশ বলেন, জীবনে অনেক কষ্ট করেছি। আমার খুব আনন্দ লাগছে। এবার সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করায় এখন আমার কষ্ট দুর হয়েছে।

Manual6 Ad Code

এদিকে সংগ্রামী মায়ের উদ্যমী ছেলে সন্তোষ রবিদাস বলেন, মায়ের এমন অর্জনে আমি ভীষন আনন্দিত। মা সারাজীবন কষ্ট করেছেন। এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে পুরস্কৃত করলেন। আমার জন্য এর চেয়ে খুশির খবর আর কী হতে পারে?

কমলগঞ্জ উপজেলার ৪নং শমশেরনগর ইউনিয়নের কানিহাটি চা-বাগানের এক শ্রমিক পরিবারে জন্ম সন্তোষ রবিদাসের। জন্মের পরপরই বাবাকে হারিয়েছিলেন। তার মা কমলি রবি দাশ তখন মজুরি পেতেন দৈনিক ১৮ টাকা। চরম অভাবের মধ্যে খুব কষ্ট করে লেখাপড়া করেছেন সন্তোষ। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ছেলের ভর্তির টাকা, ইউনিফর্ম আর বই-খাতা কিনে দিয়েছিলেন মা। ঋণের কিস্তি শোধের জন্য চা-বাগানের কাজ ছাড়াও অনেক দূরে গিয়ে বালু শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। অভাবের সংসারে নিজে খেয়ে না খেয়ে ছেলেকে খাইয়েছেন। এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে পড়ার সুযোগ পান সন্তোষ রবিদাস।

মা-ছেলের এই সংগ্রামের কাহিনী নিয়ে ২০২২ সালে ‘মায়ের নামটা কেটে দিল’ এমন শিরোনামে একটি ঘটনার বিস্তারিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ফেসবুক আইডিতে লিখেন তিনি। সেই সূত্র ধরে অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠান সন্তোষ রবিদাসকে চাকরির প্রস্তাব দিয়েছিল।

২০১৪ সালের ডিসেম্বর। মায়ের হাতে টাকা নেই। তখন এইচএসসির রেজিস্ট্রেশন চলছিল। মা ৫০ টাকার একটা নোট দিয়ে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলেছিলেন, ‘কেউ ধার দেয়নি রে বাপ!’ কলেজের এক শিক্ষকের কাছ থেকে ধার নিয়ে সেবার রেজিস্ট্রেশন ফি দিয়েছিলাম। এইচএসসির পর ভর্তি পরীক্ষার কোচিং। মা তখন আবার লোন নিলেন গ্রামীণ ব্যাংক থেকে। লোনের কিস্তির জন্য এই সময় মা বাড়ি থেকে অনেক দূরে গিয়ে বালু শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। বিনিময়ে পেতেন ৩০০ টাকা। আমি জানতাম ঘরে চাল নেই। শুধু আলু খেয়েই অনেক বেলা কাটিয়েছেন মা।

Manual5 Ad Code

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলাম। মা তখন কী যে খুশি হয়েছিলেন! কিন্তু ভর্তির সময় যত ঘনিয়ে আসছিল, মায়ের মুখটা তত মলিন দেখাচ্ছিল। কারণ চা-বাগানে কাজ করে যা পান তা দিয়ে তো সংসারই চলে না। ভর্তির টাকা দেবেন কোথা থেকে? পরে এলাকার লোকজন চাঁদা তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে সহায়তা করল। বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশনি করেই চলতাম। হলের ক্যান্টিনে ২০ টাকার সবজি-ভাত খেয়েই দিন পার করেছি। অনেক দিন সকালে টাকার অভাবে নাস্তাও করতে পারিনি। দুর্গাপূজায় কখনো একটা নতুন জামা কিনতে পারিনি। লিখেছেন রবিদাস।

রবিদাসের সেই দুর্দিন ফুরিয়েছে। তিনি বলেন, আজকের এই পর্যায়ে আসার মূল কৃতিত্বের দাবিদার আমার মা। এ ছাড়া আরো আছেন আমার শিক্ষক, সহপাঠী, ভাইবোন ও শুভকাংখীরা।

Manual3 Ad Code

চা শ্রমিক অন্য মায়েরা কেমন আছেন? জানতে চাইলে সন্তোষ রবিদাস বলেন, এখন চা শ্রমিকদের জীবনমান আগের মতোই বিরাজমান। জন্ম থেকেই আমরা পিছিয়ে পড়া সংগ্রামী জাতি। আমাদের আন্দোলনের ফলে যে মজুরি বেড়েছে তা আজকের নিত্যপণ্যের বাজারে গেলে হতাশার। কারণ ১৭০ টাকা মজুরি দিয়ে একটা সংসার চলে না। চা শ্রমিকদের সন্তানদের সঠিক শিক্ষাদান, প্রযুক্তিগত শিক্ষাপ্রদান, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ও পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্যে প্রয়োজন উপবৃত্তি। আশাকরি আমাদের এসব সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দেশের বিভিন্ন দাতা সংস্থা এগিয়ে আসবে।

Manual6 Ad Code

মায়ের সেই অপেক্ষার শেষ হয়েছে। সন্তোষ রবিদাস এখন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সিলেট লালদীঘির পাড় শাখায় রিলেশনশিপ অফিসার হিসেবে কর্মরত। এবার কিন্তু মায়ের নামটা কাটা পড়েনি। মা চা-শ্রমিক কমলি রবিদাস ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২৪’ দিবসে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে ‘শ্রেষ্ঠ জয়িতা’ সম্মাননা গ্রহণ করেছেন।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার জয়নাল আবেদীন বলেন, কানিহাটি চা বাগানের কমলি রবি দাশ একজন সংগ্রামী নারী। তার এই পুরস্কারে উপজেলাবাসী গর্ববোধ করছে।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ পাঁচ জয়িতাকে সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের হাতে এ সম্মাননা তুলে দেন। সম্মাননা পেয়েছেন ময়মনসিংহের আনার কলি, রাজশাহীর কল্যাণী মিনজি, মৌলভীবাজারের কমলি রবি দাশ, বরগুনার জাহানারা বেগম ও খুলনার পাখি দত্ত হিজড়া।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ