শুভ জন্মদিন সাংবাদিকতায় আমার দীক্ষাগুরু-শিক্ষাগুরু আবেদ ভাই (শ্রদ্ধাস্পদ আবেদ খান)

প্রকাশিত: ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৬, ২০২৪

শুভ জন্মদিন সাংবাদিকতায় আমার দীক্ষাগুরু-শিক্ষাগুরু আবেদ ভাই (শ্রদ্ধাস্পদ আবেদ খান)

Manual5 Ad Code

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু |

প্রথমেই শ্রদ্ধা-কৃতজ্ঞতার অঞ্জলি নিবেদন করি সব্যসাচী সাংবাদিক আবেদ ভাইকে (আবেদ খান), যিনি সাংবাদিকতায় আমার শিক্ষাগুরু-দীক্ষাগুরু। আমার ২৯ বছরের এ পথচলায় যদি সামান্যতম কিছুও অর্জন থাকে তবে তা আবেদ ভাইয়ের অকৃত্রিম দান। এ উচ্চারণ আমি বরাবরই করেছি, করছি এবং করবও। আবেদ ভাই বহুবার আমাকে বলেছেন, ‘তোর এ আনুগত্য-কৃতজ্ঞতার মাশুল কিন্তু দিতে হবে।’ (আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে আমি যখন একা একা থেকেছি বা থাকি তখন তিনি আমাকে ‘তুই’ সম্বোধন করেন)। হ্যাঁ, এজন্য আমাকে বিরূপ মূল্যও কম দিতে হয়নি, যা আবেদ ভাইও জানেন। তাতে আমার কোনো আক্ষেপ নেই বরং তৃপ্তি আছে এজন্য, অকৃতজ্ঞতার ব্যাধি-আক্রান্ত হইনি।
আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ পরিচয় কাকতালীয়ভাবে ১৯৯৫ সালের ১৫ অক্টোবর অপরাহ্ণে রাজধানীর বেইলি রোডে তৎকালীন ইমপ্রেস টেলিফিল্ম অফিসে। তিনি আমাকে বানিয়াচংয়ের পৈতৃক ব্যবসা থেকে কোনো এক ঘটনার প্রেক্ষাপটে প্রায় ১২ দিন অনুসন্ধান করে ঢাকায় ডেকে এনেছিলেন। এ উপাখ্যানের প্রেক্ষাপট অনেক বিস্তৃত। যেদিন তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা সেও এক উপাখ্যান।

৫ মিনিটেরও কম সময়ের আলাপে আবেদ ভাইয়ের নির্ধারিত সিদ্ধান্ত মেনে আমাকে সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ৬২ শব্দের একটি চিঠি তখন হাতে দিয়ে বললেন, ‘জাকারিয়ার (তৎকালীন প্রচারবহুল দেশের প্রথম রঙিন পত্রিকা ‘বাংলাবাজার পত্রিকা’র প্রকাশক ও সম্পাদক মোহাম্মদ জাকারিয়া খান) কাছে চলে যাও।’ জাকারিয়া খানের কাছে আবেদ ভাইয়ের চিঠিটি পৌঁছামাত্র কমান্ডার সোপের তেজগাঁওয়ের অফিসের তৃতীয় তলায় তলব। আমি কোনো দিন সেই মুহূর্তের স্মৃতি বিস্মৃত হব না। আবেদ খানের প্রতি জাকারিয়া সাহেবের অভূতপূর্ব সম্মান-মর্যাদাদান আমাকে আরও একবার বুঝিয়ে দিল মানুষ কত বড় হতে পারে! জাকারিয়া সাহেব বাংলাবাজার পত্রিকার মানবসম্পদ বিভাগের প্রধানকে ডেকে এনে বললেন, ‘ওর সিভি তৈরি করে সাব-এডিটর হিসেবে নিয়োগপত্র নিয়ে এসো, আমি সাইন করলে আজই ওকে জয়েন করাবে।’ তাই হলো এবং খ্যাতিমান কবি আমার প্রাতঃস্মরণীদের অন্যতমজন নির্মলেন্দু গ‍ুণদার (গ‍ুণদার কবিতার ভক্ত ও মনে মনে তিনি আমার প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে উঠলেও সেদিনই তাঁর সঙ্গেও আমার প্রথম প্রত্যক্ষ পরিচয়) অধীনে কাজ শুরুর নির্দেশ জারি হলো। মনে পড়ছে দেবদুলাল মুন্নার কথা, যে তখন গ‍ুণদার সহকারী ছিল। মুন্নার সঙ্গে সম্পর্কটা শেষ পর্যন্ত মামু-ভাগনে পর্যায়ে গড়াল। ওর সহযোগিতাও আজ পুনর্বার কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি।

Manual7 Ad Code

একটানা সাত বছর ওই পত্রিকায় আমার কর্মজীবন আমাকে নিয়ে যায় নতুন দিগন্তে। পত্রিকাটির প্রকাশক-সম্পাদক জাকারিয়া ভাই ও তাঁর বোন বেবি আপার পরিবারের সদস্য হয়ে গেলাম তাদের অপার উদারতায়। সাত বছর পর আবেদ ভাই ‘ভোরের কাগজ’-এর সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে জাকারিয়া ভাইয়ের কাছ থেকে আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে এলেন। তারপর আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে একটানা ১৪ বছর যুগান্তর, সমকাল, কালের কণ্ঠে। এ দীর্ঘ সময়ে আবেদ ভাইযের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিন্ন হয়েছে তিনবার, আবার তিনিই ডেকে নিয়েছেন। তাঁকে ডাকি ভাই কিন্তু সম্পর্কটা পিতা-পুত্রের মতো আর এজন্য মান-অভিমানের খতিয়ানও রচিত হয়েছে সেই নিরিখেই। এর মধ্যে আছে আরও কত কত খতিয়ান। থাক, এগুলো আমার নিজস্ব সম্পদ হয়েই থাক। আবেদ ভাই, আপনার ৬২ শব্দের যে চিঠিটি আমার জীবনে নতুন সড়ক তৈরি করে দিয়েছিল সেই চিঠিটির ভাঁজে ভাঁজে ফাটল ধরেছে, কিছুটা ছিঁড়েছেও; তবু প্যান্টের ব্যাক পকেটে মানিব্যাগেই আছে। আমৃত্যু তা বহন করব পরম যত্নে।

Manual8 Ad Code

গত রাতে অনুজ সহকর্মী হাবিব রহমানকে আবেদ ভাইয়ের জন্মদিনের একটা কার্ড বানাতে বললাম তাঁর এবং আমার ছবি দিয়ে। হাবিব একটু দ্বিমত প্রকাশ করে বলল, ‘জন্মদিনের কার্ড তো শুধু তাঁকে নিয়েই হওয়া উচিত যার জন্মদিন।’ কোনো উত্তর দিইনি হাবিবের মন্তব্যের। মনে মনে উচ্চারণ করলাম, ‘হাবিব , জীবনের সব সমীকরণ ব্যাকরণের সূত্রে হয় না।’ আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ব্যাকরণের নয়, আত্মিক। আমি জীবনে তাঁর কাছে কিছু চাইনি, কারণ তিনি ক্রমাগত এত দিয়েছেন যার ভার বইবার সাধ্যি আমার নেই। বহুবার আবেদ ভাইকে তা বলেছিও। উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘যেটুকু থাকে থাকুক, যা উপচে পড়ে যাওয়ার তা পড়ে যাক।’ শুধু বিস্ময়ে অপলক তাকিয়ে থেকে মনে মনে উচ্চারণ করেছি, ‘গুরুর দান জীবনে নদীর জলের মতো প্রবাহিত হোক।’ তাঁকে নিয়ে আজ খুব সংক্ষিপ্ত পরিসরে লিখেছি ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’-এ। একজন মানুষ সর্বজনের কাছে গ্রহণীয় কিংবা ভালোবাসার ধন হতে পারে না। একজন মানুষ থাকতে পারে না সমালোচনার বাইরেও। দোষত্রুটির ঊর্ধ্বে কেউই নন। আবেদ ভাইও হয়তো তাই। কিন্তু আমার কাছে তিনি আমার ত্রাণকর্তা, পথের সন্ধানদাতা। বড় মানুষ। অনেক বড় মানুষ।
মানুষ কত বড়? ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’-এ আপ্তবাক্যটি আমাদের সমাজে বহুলপ্রচলিত। আপাতদৃষ্টে কথাটি উচ্চমার্গীয় ও মানবতাবাদী মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আবার দ্বিমতও আছে। কেউ কেউ মনে করেন, তলিয়ে দেখলে স্পষ্টতই অনুধাবন করা যায়, এখানে আসলে মানুষের জয়গান গাওয়া হয়নি, বরং মানুষকে ছোট করা হয়েছে। কারণ, প্রকৃতপক্ষে মানুষ তার স্বপ্নের চেয়ে অনেক বেশি বড়। এই যে বলা হলো, প্রকৃতপক্ষে মানুষ তার স্বপ্নের চেয়ে অনেক বেশি বড়; এ কথাটি আমার মনে খুব ধরেছে। তাই তো সবকিছুর শেষ আছে, কিন্তু মনে করি, মানুষের অধিকারের শেষ নেই। ওই যে কবি বলেছেন, ‘আঁধার ভেঙ্গে সূর্য হাসে বিশ্বভুবন আলোয় ভাসে/পাক-পাখালি ধরলো গান নদীর বুকে ওই কলতান —।’

রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করি। তিনি বলেছেন, ‘আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও।/আপনাকে এই লুকিয়ে-রাখা ধুলার ঢাকা ধুইয়ে দাও/যে জন আমার মাঝে জড়িয়ে আছে ঘুমের জালে/আজ এই সকালে ধীরে ধীরে তার কপালে/এই অরুণ আলোর সোনার-কাঠি ছুঁইয়ে দাও।/বিশ্বহৃদয়-হতে-ধাওয়া আলোয়-পাগল প্রভাত হাওয়া,/সেই হাওয়াতে হৃদয় আমার নুইয়ে দাও/আজ নিখিলের আনন্দধারায় ধুইয়ে দাও,/মনের কোণের সব দীনতা মলিনতা ধুইয়ে দাও।/আমার পরান-বীণায় ঘুমিয়ে আছে অমৃতগান/তার নাইকো বাণী, নাইকো ছন্দ, নাইকো তান।/তারে আনন্দের এই জাগরণী ছুঁই’য়ে দাও।/বিশ্বহৃদয়-হতে-ধাওয়া প্রাণে-পাগল গানের হাওয়া,/সেই হাওয়াতে হৃদয় আমার নুইয়ে দাও।’

আবেদ ভাই প্রণতি, বারবার প্রণতি। আপনি ভালো থাকুন। আপনার জন্য শুভকামনা এবং আবারও কৃতজ্ঞতা। লেখার ছিল আরও কত কিছু, আরও আরও। থাক তা আপাতত অনুচ্চারিতই থাক। শেষ করি রজনীকান্ত সেনকে দিয়ে। ওই যে তিনি বলেছেন, ‘আমি অকৃতি অধম ব’লেও তো কিছু/কম করে মোরে দাওনি;/যা দিয়েছ, তারি অযোগ্য ভাবিয়া/কেড়েও তা কিছু নাওনি/তব আশীষ কুসুম ধরি নাই শিরে,/পায়ে দলে গেছি, চাহি নাই ফিরে;/তবু দয়া করে কেবলি দিয়েছ,/প্রতিদান কিছু চাওনি/আমি ছুটিয়া বেড়াই, জানিনা কি আশে,/সুধা পান করে মরি গো পিয়াসে;/তবু যাহা চাই সকলি পেয়েছি;/তুমি তো কিছুই পাওনি/আমায় রাখিতে চাও গো, বাঁধনে আঁটিয়া,/শতবার যাই বাঁধন কাটিয়া।/ভাবি ছেড়ে গেছ, ফিরে চেয়ে দেখি,/এক পা-ও ছেড়ে যাওনি।’

আমার মতো অধমের কাছে তা আরও বেশি নিখাদ সত্য। আবেদ ভাই, আপনি আমার কাছে উদার আকাশ, প্রেরণার উৎস।
#

Manual7 Ad Code

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক

Manual6 Ad Code