এক বৃদ্ধার জীবনসংগ্রাম: আমাদের করণীয়

প্রকাশিত: ১২:৩২ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৭, ২০২৫

এক বৃদ্ধার জীবনসংগ্রাম: আমাদের করণীয়

Manual8 Ad Code

পারভেজ কৈরী |

সেদিন সিলেট থেকে ফিরছিলাম শ্রীমঙ্গলে। ট্রেনযাত্রার আগে ক্লান্ত শরীরে রেলস্টেশনের একটি বেঞ্চে বসে খানিক বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে, স্টেশনের চিরচেনা কোলাহলে ব্যস্ততা কিছুটা কমেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে, এক বৃদ্ধা এসে আমার সামনে দাঁড়ালেন—রুক্ষ, কঙ্কালসার দু’টি হাত বাড়িয়ে দিলেন ভিক্ষার জন্য।
আমি চমকে উঠলাম। তাঁর বয়স আশির কোঠায় হবে, চোখের তারায় কালো চশমার ফ্রেমে জ্বলজ্বল করছে ক্লান্তির ছাপ, কপাল এবং গালের চামড়া কুঁচকে গেছে, আর ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতের মাঝ দিয়ে ফুটে বেরোচ্ছে দারিদ্র্যের দীর্ঘশ্বাস। মুহূর্তেই মনে প্রশ্ন জাগল—এই বয়সে এসে ভিক্ষার হাত বাড়ানোর অপমান তাঁকে কতটা নিঃশেষ করেছে?

Manual5 Ad Code

আমি তাঁকে পাশে বসালাম। একটু পানি দিলাম, জানতে চাইলাম তাঁর গল্প। প্রথমে কিছুক্ষণ চুপ রইলেন, তারপর ভারী কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন—
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কিশোরগঞ্জের ভৈরব থেকে সিলেটে চলে আসেন। তখন তিনি তরুণী, শরীরে শক্তি ছিল, হাতে কাজ করার সামর্থ্য ছিল। সিলেটে এসে বাসা-বাড়িতে কাজ শুরু করলেন। দিন-রাত পরিশ্রম করে দুই ছেলে আর দুই মেয়েকে বড় করলেন, তাদের মানুষ করলেন। কিন্তু জীবন সবসময় প্রত্যাশার পথে হাঁটে না।
আজ, এই বয়সে এসে তাঁর ঠাঁই হয়েছে মেয়ের ঘরে, কিন্তু তা কি আসলেই আশ্রয়? সংসারের বোঝা হয়ে বেঁচে থাকা, পরনির্ভরশীলতার গ্লানি, অবহেলা আর অযত্নের দগদগে ক্ষত তাঁকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে প্রতিদিন। তাই সকালে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন ভিক্ষার উদ্দেশ্যে রেল স্টেশন এবং সিলেট বাস স্টেন্ড এলাকায়, সারাদিন ভিক্ষা করে যা পান, তা দিয়েই নিজের খাবারের ব্যবস্থা করেন। যেদিন একটু বেশি জোটে, সেদিন হয়তো ভালো কিছু কিনে খান। আর যেদিন না জোটে? সে কথা আর জিজ্ঞেস করলাম না।
আমার হাতে তখন সামান্য কিছু টাকা ছিল। তাঁকে দিলাম। কিন্তু তাঁর শুকনো, রুক্ষ হাতে টাকাগুলো তুলে দিয়ে মনে হলো, এ কি কোনো সমাধান? বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, উঁচু উঁচু ভবন, আধুনিক অবকাঠামো—সবই দৃশ্যমান। কিন্তু এই বৃদ্ধার ক্লান্ত দৃষ্টির সামনে তা যেন অর্থহীন।
একজন উন্নয়নকর্মী হিসেবে তখন আমার মনে হলো আমাদের সমাজে বৃদ্ধদের জন্য টেকসই ও সম্মানজনক জীবনযাপনের ব্যবস্থা করা একান্ত জরুরি। সরকার বয়স্ক ভাতা দিলেও তা কি তাঁদের জীবনের সব প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট?

Manual8 Ad Code

আমাদের দরকার আরও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ—

1. বৃদ্ধাশ্রম ও পুনর্বাসন কেন্দ্র: প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করা জরুরি, যেখানে অসহায় প্রবীণরা নিরাপদ আশ্রয় ও যত্ন পাবেন।

2. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শক্তিশালীকরণ: বৃদ্ধদের জন্য ভাতা বাড়ানো এবং তা নিশ্চিত করা যাতে দালালদের হাতে না পড়ে।

Manual3 Ad Code

3. পরিবারভিত্তিক প্রবীণ যত্ন কর্মসূচি: পরিবারে প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ববোধ বাড়াতে কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা কর্মসূচি চালানো।

Manual4 Ad Code

4. বৃদ্ধদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ: অনেক প্রবীণ এখনও কাজ করতে সক্ষম, তাঁদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা দরকার যাতে তাঁরা সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।

আমাদের সমাজ যদি একটু মানবিক হয়, যদি আমরা নিজেদের আশপাশের অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের পাশে দাঁড়াই, তাহলে হয়তো তাঁদের শেষ জীবনের যন্ত্রণা কিছুটা হলেও কমবে। আমাদের উচিত, প্রবীণদের দুঃখ-কষ্ট বোঝা, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো। না হলে, একদিন আমরাও হয়তো এমনই অনাদরে, অবহেলায়, অনিশ্চয়তায় পড়ে যাব…………………………
#
পারভেজ কৈরী
জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়নকর্মী

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ