আত্মপ্রকাশের পর থেকেই দল গোছাতে মাঠে সক্রিয় এনসিপি’র ৫ নেতা

প্রকাশিত: ৩:১১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২২, ২০২৫

আত্মপ্রকাশের পর থেকেই দল গোছাতে মাঠে সক্রিয় এনসিপি’র ৫ নেতা

Manual7 Ad Code

সৈয়দ আরমান জামী, বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাকা, ২২ এপ্রিল ২০২৫ : নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আত্মপ্রকাশের পর থেকেই সিলেট অঞ্চলে কারা নেতৃত্ব দেবেন—গ্রাম-শহর, হাটে-ঘাটে চায়ের আড্ডায় এমন সরব আলোচনা প্রতিনিয়তই হচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই কৌতূহলের যেন শেষ নেই।

Manual7 Ad Code

জানা গেছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে থেকে সিলেট অঞ্চলের সাংগঠনিক দায়িত্ব পেয়েছেন সিলেটের পাঁচ নেতা। এরা হচ্ছেন, এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহবায়ক এহতেশাম হক, অর্পিতা শ্যামা দেব, অনিক রায়, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব প্রীতম দাশ ও কেন্দ্রীয় সদস্য ব্যারিস্টার নুরুল হুদা জুনেদ।

সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, দল গোছানোর দায়িত্ব পেয়েই পাঁচজনের মাধ্যমে মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও সিলেটে প্রথম কর্মসূচি ইফতার মাহফিল করা হয়েছে। এ কর্মসূচিকে মাঠে নামার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে সংগঠনটি। দায়িত্বপ্রাপ্ত পাঁচজন নিজেদের নেতা হিসেবে প্রচার না করে জুলাই—আগস্ট অভ্যুত্থানের সংগঠক হিসেবে পরিচিত হচ্ছেন। নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির প্রতি কৌতূহলী দৃষ্টি রয়েছে অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও রাজনীতি সচেতন মানুষজনের। ঈদের পরেই রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার বিষয়টি জানান দিয়ে সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্তরা সামনে এসেছেন।

Manual4 Ad Code

এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহবায়ক এহতেশাম হকের বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ছিলেন একটানা ২২ বছর। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে লন্ডন মেট্রোপোলিটন ইউনিভার্সিটিতে পড়েছেন। ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স করেছেন ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টমিনস্টার। আইন ও সামাজিক নেতৃত্ব বিষয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লেস্নামা করেছেন সোয়াস ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন থেকে। ইংল্যান্ড লেবার পার্টি থেকে টাওয়ার হামলেটসের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। নির্বাচিত লেবার গ্রুপের মিডিয়া ও কমিউনিকেশন অফিসার হিসেবে কর্মরত থাকাকালে জুলাই—অভ্যুত্থানের সহযাত্রী হন।

কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহবায়ক পদে থাকা অনিক রায়ের বাড়ি সুনামগঞ্জের শাল্লায়। পড়াশোনা করেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স), বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা অনিক জুলাই—আগস্ট অভ্যুত্থানে ছাত্র—জনতার আন্দোলনে রাজধানীতে আন্দোলন সংগ্রামে কেন্দ্রস্থলে ছিলেন। বিগত সরকার আমলে ৭টি মামলা রয়েছে। দুইবার কারাগারে গেছেন। জুলাই—অভ্যুত্থান চলাকালে ১০ বারের অধিক সময় হামলার শিকার হয়েছেন তিনি।

কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহবায়ক অর্পিতা শ্যামা দেবের বাড়ি সিলেট শহরে। ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নের সময় যখন ঢাকার রাস্তায় শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল, অর্পিতা সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এরপর ডাকসু নির্বাচনে কবি সুফিয়া কামাল হলের পাঠকক্ষ সম্পাদক পদে অংশ নেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন। আন্দোলনের পাশাপাশি অর্পিতা স্বেচ্ছায় রক্তদান সংগঠন ‘বাঁধন’—এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

Manual1 Ad Code

কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব প্রীতম দাশের বাড়ি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বাসদ, বাম গণতান্ত্রিক জোট, ১১ দল, তেল গ্যাস বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, হাওর রক্ষা আন্দোলন, লাউয়াছড়া বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা আন্দোলন, আদিবাসীদের ভূমি রক্ষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সিলেট অঞ্চলে বিভিন্ন কারণে বন্ধ চা বাগান চালুর দাবিতেও আন্দোলন করেছেন। ২০২২ সালে চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে সংহতি জানাতে গিয়ে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। পরবর্তীতে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মামলায় ১৩১ দিন কারাভোগ করেন। কারামুক্ত হয়ে ২০২৩ সালে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের জাতীয় নির্বাহী কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সময় গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে সরকার পতনের যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত হন।

কেন্দ্রীয় সদস্য ব্যারিস্টার নুরুল হুদা জুনেদ সিলেটের মোগলাবাজারের সন্তান। ২০১৮ সালে রাতের ভোটের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি তৎকালীন শাসক দলের হামলা ও মামলার মুখে পড়েন। এ অবস্থায় যুক্তরাজ্যে পাড়ি দিয়ে ব্যারিস্টার ডিগ্রি লাভ করেন। বার এট দ্য অনারেবল সোস্যাইটি অব লিংকন্স ইন ইউকেতে কিছুদিন আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস করেছেন। ডেনিং চেম্বার নামে নিজস্ব মালিকানাধীন চেম্বার পরিচালনা করেছেন। জুলাই—আগস্ট অভ্যুত্থানে লন্ডনে থেকে সহায়তা করেছেন। যুক্তরাজ্য থাকাকালে তার বাবা মোগলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ‘হাজি রেহান উদ্দিন ফাউন্ডেশন’ নামে চ্যারিটেবল সংগঠন করে সমাজসেবায় সক্রিয় ছিলেন।

মাঠে কী করবেন? এমন প্রশ্নে এহতেশাম হক বলেন, মাঠে থাকা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চেয়ে নিজেদের ব্যতিক্রমী প্রমাণ করাই হবে প্রথম কৌশল। সিলেট অঞ্চলে বিগত দিনে যে সকল মেগাপ্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে, সুষম উন্নয়ন ব্যহত হয়েছে, সেই সব দিক সামনে রেখে রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রণয়ন করা হবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ফোর ও সিক্সলেন, রেলপথে বিড়ম্বনা, সিলেট—ছাতক রেলপথ চালু এবং স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশার বিষয়ে অবহিত হব। সিলেট বিভাগের প্রতিটি জেলায় মতবিনিময় করে এসব জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যা চিহ্নিত করা হবে।

এনসিপির প্রাথমিক তৎপরতা থেকে সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টিও আলোচিত হচ্ছে। সিলেটে এহতেশাম হক, ব্যরিস্টার নুরুল হুদা জুনেদ, সুনামগঞ্জে অনিক রায় ও মৌলভীবাজারে প্রীতম দাশের নাম শোনা যাচ্ছে। এরমধ্যে সিলেট—৩ (দক্ষিণ সুরমা—ফেঞ্চুগঞ্জ—বালাগঞ্জ) আসনে প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালিয়েছেন এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ব্যারিস্টার নুরুল হুদা জুনেদ। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। এ অবস্থায় জনগনের সঙ্গে সম্পর্ক আমাদের পারিবারিকভাবে। নতুন দল নিয়ে যেহেতু তৎপর হয়েছি, তাই মানুষের কৌতূহল রয়েছে। এ অবস্থায় প্রচার বলতে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় চলছে। ভোটের মাঠে দল যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেটা মেনেই রাজনীতি করব।’

Manual7 Ad Code

দল গোছানোর মধ্যে ভোটে লড়ার প্রস্তুতির বিষয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্দেশনা কী? জানতে চাইলে এহতেশাম বলেন, ‘দল গোছানোর সঙ্গে ভোটের রাজনীতিতেও সক্রিয় থাকবে এনসিপি। তবে এ নিয়ে চূড়ান্তভাবে কিছু বলতে গেলে কেন্দ্রীয় নির্দেশনার অপেক্ষা করব। আমার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য জুলাই—আগস্ট অভ্যুত্থান হয়েছে। ভোটের জন্য নয়। এ জন্য মৌলিক পরিবর্তনের সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে। সাধারণ মানুষও এ পরিবর্তন চায়। এই পরিবর্তন সাধনের পর নির্বাচন হলে জনআকাঙ্খার বাস্তবায়ন সহজ হবে।’

এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায় বললেন, রাজনৈতিক দল নিয়ে কেবলই মাঠে নেমেছি আমরা। আমার নির্বাচনী এলাকা দিরাই—শাল্লায় ইফতার মাহ্ফিল করে দলের বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। দুই উপজেলায় দলের কমিটি করার কাজ চলছে। গ্রামে ইউনিয়নে উপজেলায় যারা ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই—সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে সামাজিক নানা কাজে শরিক থাকার চেষ্টা করছি। এখন চেষ্টা থাকবে কাজ আরও গতিশীল করতে।