সিলেট ৯ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:৫৭ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০২৫
যে ইতিহাস শুধু পুরুষের বীরত্বগাথায় পূর্ণ, সেখানে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার একটি অনমনীয় প্রতিবাদের নাম। উপনিবেশিক শাসনের গায়ে কাঁটা হয়ে বিঁধেছিলেন তিনি, অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অমানবিকতা ও ঔপনিবেশিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে। আজ যখন নারী নির্যাতন, রাজনৈতিক নির্লিপ্ততা এবং শিক্ষা থেকে দূরে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা সমাজে প্রতিনিয়ত চোখে পড়ে, তখন প্রীতিলতা যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক, আরও বেশি জাগ্রত।
জন্ম ও শৈশব: শিক্ষা যার প্রথম লড়াই
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়ার ধলঘাট গ্রামে জন্ম নেন প্রীতিলতা। পিতা জগবন্ধু ও মাতা প্রতিভাদেবীর সংসারে মেয়ের শিক্ষাকে দেওয়া হয়েছিল সর্বোচ্চ গুরুত্ব। স্থানীয় বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ভর্তি হন চট্টগ্রামের ড. খাস্তগীর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে। ১৯২৮ সালে এখান থেকেই মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।
এরপর ভর্তি হন ঢাকার ইডেন কলেজে, সেখানে ১৯২৯ সালে ইন্টারমিডিয়েটে পুরো বোর্ডে প্রথম হয়ে নারীদের মধ্যে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যান কলকাতার বেথুন কলেজে, দর্শন বিষয়ে অনার্স করেন। তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল শুধু পরীক্ষায় সাফল্যের গল্প নয়—তা ছিল আত্মপ্রশ্ন, জাতীয় চিন্তা ও নারীর ভূমিকা নিয়ে গভীর অনুধ্যানের এক প্রস্তুতিপর্ব।
শিক্ষকতা ও সাংগঠনিক ভূমিকা: পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে
বেথুন কলেজ থেকে ফিরে প্রীতিলতা যোগ দেন চট্টগ্রামের অপর্ণাচরণ বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে। শিক্ষিকার ভূমিকায় তিনি শুধু পাঠদান নয়, জাতীয়তাবাদ, যুক্তিবাদ ও আত্মবিশ্বাস ছাত্রীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া ছিল তাঁর নীরব কিন্তু দৃঢ় কর্মসূচি।
বিপ্লবী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া: এক ইতিহাসের সংঘাত
স্কুলে পড়াকালীন তাঁর যোগাযোগ ঘটে যুগান্তর দলের নেতাদের সঙ্গে, পরে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে গঠিত চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহী গোষ্ঠীতে যোগ দেন। এখানেই শুরু হয় তাঁর গোপন বিপ্লবী জীবন।
১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে, যেখানে সাইনবোর্ডে লেখা ছিল “Dogs and Indians not allowed”, সেখানে হামলার নেতৃত্ব দেন প্রীতিলতা। বিদ্রূপ করেই বলা যেতে পারে—তিনি সেই রাতে ‘ইন্ডিয়ান’ হয়েই প্রবেশ করেন সেই ‘ক্লাবে’। এই অভিযান ছিল উপনিবেশিক অবমাননার বিরুদ্ধে নারী নেতৃত্বে পরিচালিত এক বিরল সশস্ত্র প্রতিরোধ।
হামলার পর আহত প্রীতিলতা সায়ানাইড খেয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁর মৃত্যু হয় ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২, মাত্র ২১ বছর বয়সে। কিন্তু এই আত্মত্যাগ গোটা বাংলাকে — এবং বহু নারীকে — নতুনভাবে ভাবতে শেখায়: নারীও বিপ্লব করতে জানে, অস্ত্র ধরতেও পারে।
আজকের বাংলাদেশে প্রীতিলতা: সাহসের পাঠ
একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে, যখন নারীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ, হত্যার মতো অপরাধ নিয়মিত ঘটে, তখন প্রীতিলতা আমাদের মনে করিয়ে দেন — নারী কেবল সহ্য করে না, নারী রুখে দাঁড়ায়। তাঁর জীবন আজকের প্রজন্মকে শেখায় — শিক্ষা, আত্মসম্মান এবং সংগ্রামের সমন্বয়েই জন্ম নেয় নেতৃত্ব।
বর্তমানের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং শিক্ষাগত পটভূমিতে প্রীতিলতা এক দিকনির্দেশক আলো। তিনি ছিলেন প্রথম নারী শহিদ, কিন্তু তাঁর পরিচয় সেখানেই থেমে নেই—তিনি তখন নারী হয়ে ওঠেন এক বিপ্লবের পূর্ণাঙ্গ নাম।
উপসংহার: ইতিহাস নয়, প্রেরণা
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার কেবল অতীতের চরিত্র নন। তিনি আমাদের জন্য এক জীবন্ত চেতনা, এক সাহসী অনুপ্রেরণা। তাঁর নাম উচ্চারণ মানেই প্রশ্ন — আমি কী করছি সমাজের জন্য? নারীর জন্য? সত্যের জন্য?
যদি আজকের সমাজে কোন শিক্ষার্থী, কোন শিক্ষিকা, কোন তরুণী তাঁর জীবনের অংশবিশেষ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একটুখানি ন্যায়ের জন্য কথা বলে, তাহলে বুঝতে হবে — প্রীতিলতা এখনও বেঁচে আছেন।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি