শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শ্রীমঙ্গলে গণশুনানি

প্রকাশিত: ৪:৩০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৭, ২০২৫

শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শ্রীমঙ্গলে গণশুনানি

Manual6 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ২৭ নভেম্বর ২০২৫ : মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং শিক্ষাসেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকদের অংশগ্রহণে এক গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

Manual4 Ad Code

বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর ২০২৫) সকালে পশ্চিম শ্রীমঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কর্তৃক পরিচালিত সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), শ্রীমঙ্গলের উদ্যোগে এ গণশুনানি আয়োজন করা হয়। এতে দুই প্রতিষ্ঠানের সেবা, অবকাঠামো, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, অভিযোগ-অভিযোগ নিষ্পত্তি ও ভবিষ্যৎ করণীয়সহ নানা বিষয়ে অভিভাবকরা সরাসরি মতামত প্রদান করেন। অনুষ্ঠানে প্রায় তিন শতাধিক অভিভাবক উপস্থিত ছিলেন।

সভাপতির বক্তব্য

গণশুনানির সভাপতিত্ব করেন সনাক শ্রীমঙ্গলের সভাপতি অ্যাডভোকেট আলাউদ্দিন আহমেদ। বক্তব্যে তিনি বলেন, “শিক্ষা হলো সামগ্রিক উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। কিন্তু স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সনাকের গণশুনানি সেই লক্ষ্যেই একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। অভিভাবকদের সরাসরি অংশগ্রহণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়তা করবে।”

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, “সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে আরও শক্তিশালী করতে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সাফল্য নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের অংশগ্রহণ অনিবার্য। আজকের গণশুনানিতে যে সমস্যাগুলো উঠে এসেছে, সেগুলো সমাধানে আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করব।”

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দিলীপ কুমার বর্ধন বলেন, “শ্রীমঙ্গলের শিক্ষার মান উন্নয়ন আমাদের সবার যৌথ দায়িত্ব। মাধ্যমিক স্তরে অনুপস্থিতি, অবকাঠামো সংকট, শিক্ষক সংকটসহ বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে—কিন্তু সমাধানের পথও তৈরি হচ্ছে। এই গণশুনানি প্রশাসন ও জনগণের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি করবে।”

Manual1 Ad Code

স্বাগত বক্তব্য

অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্য রাখেন সনাক শিক্ষা উপ-কমিটির আহ্বায়ক ও শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সদস্য সৈয়দ ছায়েদ আহমেদ। তিনি বলেন, “গণশুনানি হলো মানুষের কথা শোনার সবচেয়ে কার্যকর জায়গা। অভিভাবকদের উদ্বেগ ও প্রত্যাশাগুলো আমরা খুব গুরুত্ব দিয়ে শুনতে চাই, যাতে আগামীদিনের শিক্ষাব্যবস্থা আরও জনগণবান্ধব হয়।”

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও প্রতিনিধিদের বক্তব্য

মনাইউল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ইলাছ আহমেদ বলেন, “আমরা শিক্ষকরা সবসময় চেষ্টা করি শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে। তবে কিছু সমস্যা আমাদের হাতের বাইরে। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, মাঠ, ল্যাবরেটরি, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ—এসব ক্ষেত্রেও সহায়তা প্রয়োজন।”

পশ্চিম শ্রীমঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুবর্ণা চক্রবর্তী বলেন—
“শিশুদের উপস্থিতি বাড়ানো এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। অভিভাবকদের আরও সহযোগিতা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠানো ও অতিরিক্ত পাঠ্যচাপ না দেওয়ার বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।”

সনাকের সাবেক সভাপতিদের বক্তব্য

সনাকের সাবেক সভাপতি ও শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সিনিয়র সাংবাদিক সৈয়দ নেসার আহমদ বলেন, “শিক্ষা খাতের দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপচয় রোধে নাগরিক সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণশুনানির মতো আয়োজন দেশের শিক্ষা খাতে একটি নতুন সংস্কৃতি তৈরি করছে।”

সাবেক সভাপতি ও ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দ্বীপেন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য বলেন—
“শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, শিক্ষা খাতে টেকসই উন্নতির জন্য শিক্ষক-অভিভাবক-প্রশাসন সমন্বয় অপরিহার্য। গণশুনানি তার একটি বাস্তব উদাহরণ।”

অন্যান্য অতিথিদের বক্তব্য

সনাকের বর্তমান সহ-সভাপতি কাজী আসমা আক্তার বলেন, “স্বচ্ছতা শুধুমাত্র প্রশাসনের বিষয় নয়—এটি একটি সামষ্টিক দায়িত্ব। অভিভাবকরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে যত সচেতন হবেন, শিক্ষা ব্যবস্থা তত উন্নত হবে।”

সনাক সদস্য এস এ হামিদ বলেন, “শিক্ষার মানোন্নয়নে স্থানীয় নেতৃত্বকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। সনাক সেই নেতৃত্বের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে কাজ করতে চায়।”

স্থানীয় মুরব্বি কেরামত আলী বলেন, “আমাদের সময় স্কুল মানেই ছিল শৃঙ্খলা। এখন সেই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে শিক্ষক ও অভিভাবক—দু’পক্ষকেই ভূমিকা রাখতে হবে।”

ইউপি সদস্য মো. মহসিন মিয়া বলেন—
“গ্রামগঞ্জে এখনো অনেক শিশু নানা কারণে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে না। প্রতিনিধিত্বমূলক নেতৃত্ব হিসেবে আমরা এ বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করব।”

Manual2 Ad Code

অভিভাবকদের মতামত ও সুপারিশ

গণশুনানিতে অভিভাবকরা বিদ্যালয়ে শিক্ষকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান, অতিরিক্ত খরচ বন্ধ, অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা বাড়ানোসহ বেশ কিছু দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানের সার্বিক লক্ষ্য

গণশুনানির মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং অভিভাবকদের অংশীদারত্ব বাড়ানো—এটাই ছিল আয়োজকদের মূল উদ্দেশ্য। সনাক জানিয়েছে, উত্থাপিত সমস্যাগুলোর সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত ফলোআপ করা হবে।

 

Manual3 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ