নারীনেত্রী ও শহীদজায়া বেগম মুশতারী শফীর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ২০, ২০২৫

নারীনেত্রী ও শহীদজায়া বেগম মুশতারী শফীর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Manual6 Ad Code

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিবেদক | ঢাকা, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ : একাত্তরের রণাঙ্গনে বিশেষ অবদান রাখা নারীনেত্রী, মুক্তিযুদ্ধের শব্দসৈনিক ও শহীদজায়া বেগম মুশতারী শফীর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। মহান মুক্তিযুদ্ধ, নারী অধিকার আন্দোলন ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের সংগ্রামে আজীবন সক্রিয় এই মহীয়সী নারীর স্মরণে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে।

বেগম মুশতারী শফী ২০২১ সালের ২০ ডিসেম্বর বিকেলে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। তিনি সাত ছেলে-মেয়ের জননী। একাত্তরে তার স্বামী বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ শফীকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাসা থেকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।

জন্ম ও পারিবারিক জীবন

বেগম মুশতারী শফীর জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৫ জানুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। তার পৈতৃক বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। শিক্ষিত, প্রগতিশীল ও মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী পরিবারে বেড়ে ওঠা মুশতারী শফী ছোটবেলা থেকেই সামাজিক সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল তার স্বামী ডা. মোহাম্মদ শফী এবং ছোট ভাই এহসানুল হক আনসারীকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হত্যা করে। এই নির্মম ঘটনার পরও তিনি ভেঙে না পড়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিজয়ের দিন পর্যন্ত তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শব্দসৈনিক হিসেবে কাজ করেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

নারী অধিকার ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন

Manual5 Ad Code

নারী অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বেগম মুশতারী শফীর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। ১৯৬৩ সালে চট্টগ্রাম থেকে তিনি ‘বান্ধবী’ নামে একটি মাসিক সাময়িকী প্রকাশ করেন, যা ছিল বাংলাদেশের নারীদের জন্য দ্বিতীয় সাময়িকী। এই প্রকাশনার মাধ্যমে তিনি নারীর অধিকার, সমাজে নারীর অবস্থান এবং প্রগতিশীল চিন্তার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

একাত্তর পরবর্তী ভূমিকা

Manual4 Ad Code

মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অন্যতম সংগঠক হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংরক্ষণ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রসৈনিক।

সাহিত্যকর্ম

Manual2 Ad Code

বেগম মুশতারী শফী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের নারী’, ‘চিঠি’, ‘জাহানারা ইমামকে’ এবং ‘স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন’। তার লেখনীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, নারী অংশগ্রহণ এবং ব্যক্তিগত বেদনা ও সংগ্রামের চিত্র সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

Manual1 Ad Code

রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি

মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৬ সালে তাকে বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ প্রদান করা হয়। এছাড়া ২০২০ সালে নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে তিনি দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননার অন্যতম ‘বেগম রোকেয়া পদক’ লাভ করেন।

বিভিন্ন সংগঠনের শ্রদ্ধা

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদুল হাসান মানিক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নূর আহমদ বকুল এক বিবৃতিতে বেগম মুশতারী শফীর চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান পৃথক বিবৃতিতে তাকে চেতনার বাতিঘর ও সমাজ প্রগতির সংগ্রামের সাহসী যোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেন।

সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ এক বিবৃতিতে বলেন, বেগম মুশতারী শফী আজীবন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন।

এছাড়া ঐক্য ন্যাপ এক বিবৃতিতে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক, যুদ্ধাপরাধী বিচার আন্দোলনের অগ্রসৈনিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা সংগঠক হিসেবে তাকে স্মরণ করে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

উত্তরাধিকার

বেগম মুশতারী শফী কেবল একজন শহীদজায়া নন; তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস, নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতীক। তার জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন শ্রদ্ধানিবেদনকারীরা।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ