একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি জাহানারা আরজু আর নেই

প্রকাশিত: ৮:২৭ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৩, ২০২৬

একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি জাহানারা আরজু আর নেই

Manual3 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৩ মার্চ ২০২৬ : একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি, সাহিত্য সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জাহানারা আরজু (৯৪) ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

সোমবার (২ মার্চ ২০২৬) দুপুর দেড়টার দিকে গুলশানের নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি দীর্ঘদিন বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত ছিলেন।

১৯৩২ সালের ১৭ নভেম্বর মানিকগঞ্জের জাবরা গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

তার বাবা আফিল উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী ও মা খোদেজা খাতুন। স্বামী বিচারপতি নুরুল ইসলাম ছিলেন সাবেক উপরাষ্ট্রপতি।

জাহানারা আরজু একজন প্রথিতযশা কবি। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মহিলা সাপ্তাহিক ‘সুলতানা’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদক।

Manual6 Ad Code

বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকসহ ২৬টি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাশ করেন।

জাহানারা আরজুর প্রথম কবিতা ১৯৪৫ সালে অবিভক্ত বাংলায় ‘আজাদ’ পত্রিকার মুকুলের মাহফিলে প্রকাশিত হয়। প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি মাটি, মানুষ, সমাজ ও পৃথিবীর নানা বিষয়কে তুলে ধরেছেন তার সাহিত্যকর্মে।

তার রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- নীলস্বপ্ন, রৌদ্র ঝরা গান, সবুজ সবুজ অবুঝ মন, আমার শব্দে আজন্ম আমি, ক্রন্দসী আত্মজা, বাদল মেঘে মাদল বাজে প্রভৃতি।

অতি অল্প বয়সেই তার সাহিত্যচর্চার সূচনা—অষ্টম শ্রেণিতে থাকতেই তিনি হাতে লেখা পত্রিকা ‘অঞ্জলি মোর গুঞ্জরণী’ প্রকাশ করেন। আশ্চর্যজনকভাবে এর আশীর্বচন লেখেন অবিভক্ত বাংলার কিংবদন্তি দুই ব্যক্তিত্ব—শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক ও মহাকবি কায়কোবাদ।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মহিলা সাপ্তাহিক ‘সুলতানা’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৯৪৯ সাল থেকে কবি সুফিয়া কামাল ও জাহানারা আরজু যৌথভাবে এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন—যা নারী জাগরণ ও সাহিত্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

Manual4 Ad Code

পরবর্তী সময়ে তিনি রাইটার্স গিল্ডের পত্রিকা ‘পরিক্রম’-এ (১৯৬৫) যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। পাশাপাশি ছিলেন টিবি অ্যাসোসিয়েশনের পাক্ষিক ‘হেলথ বুলেটিন’-এর প্রধান সম্পাদক এবং ‘সেতুবন্ধন’ সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদনাতেও যুক্ত ছিলেন।

জাহানারা আরজুর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সালে ‘আজাদ’ পত্রিকার মুকুলের মাহফিলে। এরপর নিয়মিত তার লেখা স্থান পেতে থাকে সওগাত, মোহাম্মদী, বেগম, মিল্লাত, ইত্তেহাদসহ বিভিন্ন পত্রিকায়।

তার কবিতার মূল সুর—প্রেম, প্রকৃতি, মানুষ, সমাজ। সহজ-সরল ভাষা, আন্তরিকতা ও আবেগমাখা বর্ণনায় তিনি প্রকৃতি ও মানুষের হৃদয়ের কথা তুলে ধরেছেন তার সৃষ্টিকর্মে।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ
নীলস্বপ্ন (১৯৬২), রৌদ্র ঝরা গান (১৯৬৪), সবুজ সবুজ অবুঝ মন, আমার শব্দে আজন্ম আমি, ক্রন্দসী আত্মজা, বাদল মেঘে মাদল বাজে, শোণিতাক্ত আখর (একুশে ফেব্রুয়ারি বিষয়ক স্বনির্বাচিত কবিতা, ১৯৭১)

পুরস্কার ও সম্মাননা
বাংলা সাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি ১৯৮৭ সালে একুশে পদকসহ মোট ২৬টি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
জাহানারা আরজুর স্বামী ছিলেন দেশের সাবেক উপরাষ্ট্রপতি ও বিচারপতি এ কে এম নুরুল ইসলাম।

তাদের চার সন্তান
বড় ছেলে মো. আশফাকুল ইসলাম, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি, ছোট ছেলে প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাহিনুল ইসলাম, বড় মেয়ে অধ্যাপিকা মেরিনা জামান, ছোট মেয়ে প্রয়াত লুবনা জাহান নাতি-নাতনি, পুতি-পুতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, অনুরাগী এবং শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গিয়েছেন।

Manual2 Ad Code

কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানের শোক

প্রথিতযশা কবি, সাহিত্য সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জাহানারা আরজু’র মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, জাহানারা আরজুর মৃত্যুতে দেশ একজন নিবেদিতপ্রাণ সাহিত্যসাধককে হারাল। তার সাহিত্যকর্ম আগামী প্রজন্মকে মানবিক ও নান্দনিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করবে। তিনি মরহুমার রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

এক নীলস্বপ্নের বিদায়
—সৈয়দ আমিরুজ্জামান

আজ নিভে গেল এক দীপশিখা গুলশানের নীরব ঘরে,
দুপুরবেলার স্তব্ধ আলো থমকে রইল শোকের ভরে।
শব্দহারা হলো বাতাস, জানালাতে স্তব্ধ দিন,
বাংলা ভাষার বর্ণমালায় ঝরল অশ্রু রঙিন ঋণ।

ইন্নালিল্লাহ উচ্চারিত হয় আকাশ জুড়ে ধ্বনি,
মাটি নিল আপন কোলেতে কবির শেষ জীবনী।
একুশে-পদক বুকে ধরা সেই অমলিন মুখ,
চিরনিদ্রায় শুয়ে আজও ছড়ায় আলোর সুখ।

নব্বই পেরোনো দীর্ঘ জীবন সাধনায় দীপ্তিমান,
প্রেমে, প্রকৃতিতে, মানবগাঁথায় লিখেছেন অনুক্ষণ গান।
মাটি-মানুষ-সবুজ পৃথিবী তার কলমে পেল প্রাণ,
শব্দ হয়ে ফুটল হৃদয়, জেগে উঠল জ্ঞান।

মানিকগঞ্জের জাবরা গ্রামে শিশিরভেজা ভোর,
সেইখানে জন্ম নিল যে কাব্য-নক্ষত্র ঘোর।
সতেরোই নভেম্বরের আলো মেখে শিশুকাল,
বাংলা ভাষার আঁচলে বোনা স্বপ্নের প্রথম জাল।

অফিল উদ্দিনের কন্যা তিনি, খোদেজার আদরধন,
শৈশব থেকেই শব্দ বুনে গড়েছেন আপন গগন।
অষ্টম শ্রেণির কিশোরী হাতে লিখে পত্রিকা,
‘অঞ্জলি মোর গুঞ্জরণী’—সাহসী এক প্রতীকিকা।

শের-ই-বাংলা আশীর্বাদে, কায়কোবাদ স্বাক্ষরে,
জেগে উঠল কিশোরী কবি আলোকিত অক্ষরে।
তখন থেকেই পথচলা তার অগ্নিশিখার মতো,
ঝড়ের ভেতর দীপ জ্বেলে উচ্চারণে যত্নশত।

উনিশশো পঁয়তাল্লিশ সালে প্রথম কবিতার দান,
‘আজাদ’-এরই মুকুল-মহফিলে ছাপা হলো গান।
তারপর থেকে সওগাত, বেগম, মিল্লাত, ইত্তেহাদ—
প্রতিটি পত্রিকার পাতায় লিখেছেন অবিরাম স্বাদ।

ইডেন কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ,
জ্ঞান ও সাধনায় দীপ্ত হলো তার তারুণ্য-জাগরণ।
বাংলা ভাষার স্নাতকোত্তর মেধার দীপ্তি লয়ে,
কলম ধরলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় সত্যের পাশে রয়।

‘সুলতানা’র প্রথম সম্পাদক—নারীজাগরণের ডাক,
পূর্ব পাকিস্তানের আকাশে তুললেন আলোর ফাঁক।
সুফিয়া কামালের সঙ্গে হাতে হাত রেখে,
নারীর স্বপ্ন বুনলেন তাঁরা সাহসী শব্দ বেঁধে।

‘পরিক্রমা’র যুগ্ম সম্পাদনায় চিন্তার নব দিশা,
‘হেলথ বুলেটিন’-এ মানবসেবা, সুস্থতার ভাষা।
‘সেতুবন্ধন’-এর অক্ষর সাঁকো গড়লেন যতনে,
মানুষ থেকে মানুষে যাক হৃদয়েরই সেতু গড়ে।

‘নীলস্বপ্ন’ জাগে আজও বিষণ্ন বিকেলবেলা,
‘রৌদ্র ঝরা গান’ শোনায় রৌদ্রের মেলা।
‘সবুজ সবুজ অবুঝ মন’ ডাকে শিশিরঘ্রাণে,
‘আমার শব্দে আজন্ম আমি’—স্বকীয় উচ্চারণে।

Manual1 Ad Code

‘ক্রন্দসী আত্মজা’ কাঁদে মাতৃভূমির তরে,
‘বাদল মেঘে মাদল বাজে’ বৃষ্টি-ছন্দ ঘিরে।
‘শোণিতাক্ত আখর’ রক্তে লেখা একুশেরই শপথ,
ভাষার তরে জীবনদান—অমরতার রথ।

তার কবিতার মূল সুর প্রেম ও মানবতা,
সহজ ভাষায় গেঁথে যেত গভীর অনুভূতা।
অলংকারের ভারে নয়, আন্তরিকতায় ভরা,
পৃথিবীরই কথা বলতেন মমতারই ধরা।

বিচারপতি নুরুল ইসলামের সহধর্মিণী তিনি,
রাষ্ট্রের উচ্চ আসনে থেকেও ছিলেন নতশিরিণী।
চার সন্তানের স্নেহময়ী জননী, পরিবার-আলোকধারা,
গৃহের ভেতর যেমন মমতা, তেমনি বাইরে তারা।

আশফাকুল ন্যায়পথে, জাহিনুল প্রকৌশলে দীপ,
মেরিনা জ্ঞানের আলোয়, লুবনার স্মৃতি স্নিগ্ধ নীড়।
নাতি-নাতনি, পুতি-পুতনির চোখে অশ্রু ঝরে,
অসংখ্য গুণগ্রাহী কাঁদে প্রিয় কবির তরে।

আজ দেশ হারাল এক নিবেদিত সাহিত্যসাধক প্রাণ,
যার কলমে জেগে থাকত মানবতার গান।
একুশে পদক শুধু নয়—জনতার অর্ঘ্যখানি,
বাংলা ভাষার অন্তরে তিনি চির অম্লানিনী।

মৃত্যু কেবল দেহের ক্ষয়, শব্দের নয় অবসান,
তার কবিতা ভোরের শিশির, জাগ্রত প্রভাত-গান।
যতদিন বাংলার আকাশে জ্বলবে রৌদ্র-চাঁদ,
ততদিন জাহানারা আরজু থাকবেন অবিরাম সাধ।

শ্রদ্ধা তোমায়, কবি, প্রণাম নিঃশব্দ কণ্ঠে,
তোমার লেখা পথ দেখাবে আগামীর অরণ্যে।
তোমার স্বপ্ন নীল হয়ে ছড়িয়ে যাক ধরণী জুড়ে,
মানবতার বীজ বপন করুক নতুন প্রজন্মের তরে।

চিরবিদায় নয়—এ কেবল অন্য আলোর ডাকে যাত্রা,
বাংলা কাব্য-ভুবনে তুমি অনন্ত প্রভাতপাত্রা।
ঘুমাও এখন শান্ত ঘুমে, শব্দ-নক্ষত্র তুমি,
বাংলার হৃদয়পটে জ্বলবে অনাদি ভূমি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ