সিলেট ২৮শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১:১৯ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৮, ২০২৬
সাহিত্য বিষয়ক প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৮ এপ্রিল ২০২৬ : দেশের একজন প্রথাবিরোধী বহুমাত্রিক লেখক, ভাষাবিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবী, কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, সমালোচক, রাজনীতিক ভাষ্যকার, কিশোরসাহিত্যিক, গবেষক এবং অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদের ৭৯তম জন্মবার্ষিকী আজ।
তিনি ধর্ম, মৌলবাদ, প্রতিষ্ঠান ও সংস্কারবিরোধিতা, যৌনতা, নারীবাদ ও রাজনীতি বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের জন্য ১৯৮০-এর দশক থেকে পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ প্রথাগত ধ্যানধারা সচেতনভাবে পরিহার করতেন। তাঁর সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য পল্লীপ্রেম, নর-নারীর প্রেম, প্রগতিবাদিতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা, সামরিক শাসন ও একনায়কতন্ত্রের বিরোধিতা এবং নারীবাদের জন্য পরিচিত। তাঁর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত অভীষ্ট তাঁর সাহিত্যকে প্রভাবান্বিত করেছিল। কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে প্রগতিশীল মতামত প্রকাশ করেছিলেন ৷
অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদের ৭টি কাব্য, ১২টি উপন্যাস, ২২টি সমালোচনা গ্রন্থ, ৭টি ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ক, ৮টি কিশোরসাহিত্য ও অন্যান্য প্রবন্ধসংকলন মিলিয়ে ৬০টিরও অধিক গ্রন্থ তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যু পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয়। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর নারীবাদী গবেষণা-সংকলনমূলক গ্রন্থ ‘নারী’ প্রকাশের পর বিতর্কের সৃষ্টি করে এবং ১৯৯৫ থেকে ২০০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সাড়ে চার বছর ধরে বইটি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ছিল। এটি তাঁর বহুল আলোচিত গবেষণামূলক কাজ হিসাবেও স্বীকৃত ।
এছাড়াও তাঁর ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ উপন্যাসটি পাঠকমহলে বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল ৷ এই উপন্যাসটিতে মৌলবাদীদের সমালোচনা করার কারণে, ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে ফেব্রুয়ারি তিনি বইমেলার বাহিরে মৌলবাদীদের নৃশংস হামলার শিকার হন। পরবর্তীতে জার্মানিতে পিএইচডি করতে গেলে, ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের ১২ই আগস্ট জার্মানির মিউনিখ শহরের নিজ ঘর থেকে আকস্মিকভাবে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায় ৷
ড. হুমায়ুন আজাদ স্যার ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে এপ্রিল তাঁর মাতামহের বাড়ি, তৎকালীন বিক্রমপুরের কামারগাঁয় জন্মগ্রহণ করেন৷
আজ এই মনীষীর জন্মবার্ষিকীতে জানাই অন্তর্লীন শ্রদ্ধার্ঘ্য ও সশ্রদ্ধ সম্মান ৷
আজ ভোর হতে বাতাস বলে—জাগো, স্মরণের দিন,
আকাশজোড়া উচ্চারণে এক দীপ্ত নামের ঋণ।
বাংলা ভাষার বুকের ভিতর বজ্রের মতো ধ্বনি,
হুমায়ুন আজাদ আজও জাগে অমল প্রজ্ঞাবনী।
আঠাশে এপ্রিল এলো ফিরে, কালের কপাট খোলে,
মেঘের ভেতর রৌদ্র যেমন জ্বলে নীরব তলে।
বিক্রমপুরের মাটির ঘ্রাণে শিশিরভেজা ভোর,
কামারগাঁয়ের কাঁথা জুড়ে উঠেছিল যে ঘোর—
সে ঘোর ছিল জ্ঞানের নেশা, শব্দে আগুন ধরা,
একটি শিশু দেখেছিল যে আকাশ কত বড়া।
পল্লী পথের ধূলির সাথে নদীর কূলে কূলে,
ধানের শীষের দোলার ভেতর জীবন পড়া খুলে,
সেই শিশু একদিন হলো প্রশ্নবিদ্ধ শিখা,
ভীরু মুখের আঁধার ভেঙে দিল তর্কের দীক্ষা।
নদী তাকে শিখিয়েছিল—বাঁধ মানিলে মরণ,
আকাশ তাকে বলেছিল—স্বাধীনতার চরণ।
তিনি এলেন শ্রেণিকক্ষে অধ্যাপকের বেশে,
কিন্তু শুধু পাঠ্যবইয়ে থামেন নি অবশেষে।
ভাষার গঠন, ধ্বনির ভঙ্গি, বাক্যরীতির মান,
সেখানে যেমন ছিল তাঁর গবেষণার জ্ঞান,
তেমনি ছিল সমাজপাঠে কাঁটার মতো বাণী,
অন্যায়েরে দেখলে তিনি নীরব হতে জানি?
না, তিনি তো নীরব নন, নন কোনো অনুচর,
সত্য যেখানে বন্দী পড়ে, তিনি সেথা সোচ্চার।
প্রথা যদি হয় শিকল বাঁধা, ভাঙেন তারই কড়ি,
মিথ্যার গায়ে প্রশ্ন ছুড়ে জাগান ঘুমের ঘড়ি।
মৌলবাদের কালো চাদর টেনে দেন যে খসে,
ভয়কে বলেন—তুই সরে যা, মানুষ থাকুক বসে।
কত জনে তো লেখে শুধু প্রশংসারই গান,
তিনি লেখেন দগ্ধ সময়, বিদ্রোহী অবসান।
কলম ছিল তাঁর হাতে এক দীপ্ত শলাকা,
মনের ভিতর জমাট অন্ধ রাত করেছে ফাঁকা।
যেখানে ছিল কুসংস্কারের কুয়াশাভরা দেয়াল,
সেখানে তিনি এঁকেছেন সূর্যের রঙিন জাল।
নারীর চোখে যে দীর্ঘদিন জমেছিল অবমান,
অধিকারহীন শতকালের অবদমিত টান,
তিনি শুনলেন সে কান্নাধ্বনি, লিখলেন দৃপ্ত “নারী”,
সময়ের বুক কেঁপে উঠল, জেগে উঠল ভারী।
যারা চেয়েছিল চুপ করাতে চিন্তার স্বরগ্রাম,
তারা দেখল—বইয়ের পাতায় জ্বলে বিদ্রোহ নাম।
নিষিদ্ধ হলো গ্রন্থ, কিন্তু নিষিদ্ধ হয় কি বোধ?
লোহা দিয়ে আটকে রাখা যায় কি মনের রোধ?
শাসকেরা দেয় তালা যত, ততই খোলে দ্বার,
যতই বাঁধে, ততই নদী ছুটে যায় অপার।
তিনি জানতেন—সত্য যদি একবার পায় ডানা,
বন্দী ঘরে রাখবে কেমন পৃথিবীর কারাগানা!
উপন্যাসে তিনি দেখালেন সমাজেরই মুখ,
ভেতরকার সব ভণ্ডামিতে জাগল শঙ্কাসূচক দুখ।
“পাক সার জমিন…” নামে যে আগুনজ্বলা গ্রন্থ,
পাঠকজনে দেখল তাতে সময় কত ক্লান্ত।
মুখোশধারী ধর্মব্যবসা, রাজনীতির ফাঁদ,
তারই ভেতর কাঁপিয়ে দিলেন তীক্ষ্ণ ভাষার বাঁধ।
যারা অন্ধ, তারা আলোকে শত্রু জেনে রয়,
যারা শূন্য, তারাই বেশি চিৎকার তুলে কয়।
বইমেলারই পথের ধারে নেমে এল সে ক্ষণ,
অন্ধ ঘৃণার ধারাল হাতে রক্তাক্ত আয়োজন।
ফেব্রুয়ারির বাতাস কাঁদে, কাঁপে বাংলা মেলা,
কলমধারী মানুষটিকে ঘিরে ওঠে হেলা।
তবু তিনি হারেন নি তো, ক্ষতেও ছিলেন দৃঢ়,
রক্তমাখা ব্যান্ডেজে যেন দাঁড়িয়ে থাকে বৃক্ষ।
জানতেন তিনি—যে পথ সত্য, সে পথে আছে ক্ষত,
তবু সেই পথ ছেড়ে দিলে মিথ্যা হবে জগত।
আঘাত যদি আসে তবে আসুক খোলা বুকে,
মানুষ হোক মুক্তচিন্তার নির্ভীক আলোকমুখে।
তারপর এক দূর শহরে, মিউনিখেরই ঘরে,
নিভে গেলেন আকস্মিক এক নীরব গহ্বরে।
বারো আগস্ট, শোকের তারিখ, জমল কুয়াশা ঢের,
বাংলা ভাষার বুকের ভিতর উঠল নীরব ফের।
কিন্তু মানুষ মরে গেলেও শেষ হয় না মান,
যে চিন্তা দেয় আলো, তারে রাখে যুগের প্রাণ।
আজও যখন মঞ্চে উঠে কেউ বলে মিথ্যাবাদ,
আজও যখন ধর্মবেচা সাজে সোনার সাধ,
আজও যখন নারীর অধিকারে নামে কুৎসিত রোষ,
আজও যখন স্বাধীনমতে পড়ে অন্ধের কোপ,
তখন দেখি আপনারই তীক্ষ্ণ উচ্চারণ,
কলম হাতে দাঁড়িয়ে আছেন সময়েরই শরণ।
আপনি ছিলেন কবিও বটে—রক্তমেশা গান,
প্রেমের ভেতর পল্লীস্নিগ্ধ নীলিমারই টান।
নারী-পুরুষ সমমর্যাদা, মানবিক সম্পর্ক,
সেখানে ছিল হৃদয়জোড়া উজ্জ্বল এক দর্ক।
যে প্রেম শুধু শরীর নয়, যে প্রেম মুক্ত মন,
সে প্রেম নিয়ে লিখেছিলেন দীপ্ত অনুবর্তন।
আপনি ছিলেন ভাষাবিদও—ধ্বনির গভীর শাস্ত্র,
বর্ণের ভিতর খুঁজে পেতেন সভ্যতারই মাত্র।
বাংলা ভাষার ব্যাকরণে যুক্তির শস্যধান,
বাক্যের ভেতর ইতিহাসের স্পন্দিত সম্মান।
যে ভাষাতে মানুষ জাগে, কাঁদে, হাসে, লড়ে,
সে ভাষাটার শেকড় খুঁজে গেছেন ঘুরে ঘুরে।
শিক্ষার্থীরা আজও স্মরণ করে শ্রেণিকক্ষ,
যেখানে শুধু পাঠ নয়, জেগে উঠত লক্ষ।
প্রশ্ন করো, ভয়কে ভাঙো, যুক্তি দিয়ে চলো,
চিন্তা যদি বন্ধ করো, মানুষ হবে ছলো—
এ ছিল যেন আপনারই প্রতিদিনের ডাক,
মস্তিষ্ক খোলো, শৃঙ্খল ভাঙো, দূর করো সব ফাঁক।
দেশের মাটির দুঃসময়ে যারা থাকে চুপ,
তাদের ভিড়ে আপনি ছিলেন বজ্রকণ্ঠ রূপ।
সামরিকতার কালো ছায়া, একনায়কের শাসন,
আপনি তাতে দেখিয়েছেন প্রতিবাদের ভাষণ।
গণতন্ত্রের নামটি শুধু কাগজেতে নয় ভাই,
মানুষ যেন মাথা তুলে বাঁচতে পারে—তাই।
আপনারে তাই শুধু কবি বললে কমই হয়,
শুধু গদ্যকার বললে তাতে সত্য থাকে ক্ষয়।
আপনি ছিলেন চিন্তার খনি, সাহসেরই নাম,
বাংলা ভাষার বিপন্ন কালে দৃঢ়তম অবলম্বন।
যে সমাজে ভীরু লোকের সংখ্যা অগণন,
সেখানে আপনি একাই ছিলেন শত উচ্চারণ।
আজ জন্মদিনে ফুল দিলে তা কি যথেষ্ট হয়?
শুধু ছবি তে প্রদীপ জ্বেলে কি ঋণ শোধ হয়?
আপনাকে যদি সত্যি করি স্মরণেরই মান,
মুক্তচিন্তার পথে তবে রাখতে হবে প্রাণ।
বইয়ের প্রতি ভালোবাসা, তর্কে শুদ্ধ রীতি,
অন্যায়েরে না বলা—এই হোক শ্রদ্ধানীতি।
যুবক যারা আজকে শুধু পর্দার ভেতর বন্দী,
শব্দহীন এক স্ক্রলে যারা সময় করে সন্ধি,
তাদের বলি—পড়ো আজাদ, দেখো ভাষার দীপ,
দেখো কেমন কলম হলে কাঁপে শত প্রতীপ।
একটি বইও বদলাতে পারে মানুষেরই দিন,
একটি প্রশ্ন ভেঙে দিতে পারে লৌহ-চিন।
যে মা তার সন্তানকে আজ শেখায় কেবল ভয়,
তাকে বলি—শেখাও আগে সত্যের পথে জয়।
যে শিক্ষক শুধু নম্বর গোনে, মুখস্থ খোঁজে খাতা,
তাকে বলি—জাগাও আগে যুক্তির প্রথম ব্যাটা।
যে রাষ্ট্র চায় নত মাথা আর বশ্যতার ভিড়,
তাকে মনে করিয়ে দাও—মানুষ জন্মে ধীর।
হুমায়ুন আজাদ, আপনি আছেন ভাষার দীঘি জলে,
আছেন বইয়ের পাতার ভাঁজে, আলো-অন্ধকার তলে।
আছেন রাত্রির ছাত্রঘরে, আছেন বিতর্কসভায়,
আছেন নিষিদ্ধ স্বপ্ন হয়ে সাহসীদের দাবায়।
আছেন নারীর অধিকারী দৃপ্ত পদচারণ,
আছেন প্রতিটি প্রশ্নমুখর তরুণ উচ্চারণ।
আছেন গ্রামে ভাঙা স্কুলে বইয়ের ক্ষুধার কাছে,
আছেন নগর রুদ্ধ ঘরে যেথা চিন্তা কাঁদে নাচে।
আছেন কবির নিঃসঙ্গতায়, প্রেমিকেরই চিঠি,
আছেন ভাষার গবেষণায় নক্ষত্রময় গীতি।
আছেন যারা ভণ্ডামিরে চিনে ফেলে ক্ষণে,
আছেন তাদের প্রতিবাদী জাগরণী স্বরে।
আজ তাই শুধু স্মৃতির কাছে নত করি না শির,
আপনারই পথের ধুলো চাই প্রাণভরে ধীর।
সত্যের কাছে দায়বদ্ধতা, বুদ্ধির কাছে মান,
মানুষ হবার কঠিন শপথ—এই হোক অর্ঘ্যদান।
আঠাশে এপ্রিল প্রতি বছর আসুক এই বাণী—
কলম জাগে, মানুষ জাগে, জাগে প্রজ্ঞাপ্রাণী।
শ্রদ্ধা নিন, প্রথাভাঙা সেই নির্ভীক আলোকপুরুষ,
আপনারে ঘিরে বাংলাজুড়ে জাগুক নূতন রৌদ্রসূর্য।
যতদিন এই ভাষা বাঁচে, যতদিন মুক্ত মন,
ততদিনই উচ্চারিত হবে আপনারই নামগণ।
হুমায়ুন আজাদ—বাংলার বুকের দীপ্ত স্বাক্ষরখানি,
অন্ধ সময়ের বিরুদ্ধে লেখা অনিঃশেষ বাণী।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি