পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সন্ত্রাস, আগ্রাসন ও সাম্প্রদায়িক উসকানির নিন্দা ও প্রতিবাদ

প্রকাশিত: ১২:৪৫ অপরাহ্ণ, মে ৭, ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সন্ত্রাস, আগ্রাসন ও সাম্প্রদায়িক উসকানির নিন্দা ও প্রতিবাদ

Manual3 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৭ মে ২০২৬ : গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভের সাথে লক্ষ্য করছে যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়লাভের অব্যবহিত পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিতভাবে বিরোধী রাজনৈতিক দল, বামপন্থী সংগঠন, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের উপর ধারাবাহিক হামলা, ভাঙচুর, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িক উসকানি চালানো হচ্ছে।

এই নির্বাচনকে ঘিরে শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপ, বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন, ভোটার তালিকার তথাকথিত “Special Intensive Revision (SIR)”–এর নামে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ—বিশেষত সংখ্যালঘু ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া, প্রশাসনিক পক্ষপাত, নির্বাচন কমিশনের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা এবং নানা কারচুপির অভিযোগ গোটা ভারতজুড়ে ব্যাপক উদ্বেগ ও উতকন্ঠা সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে যে এই প্রক্রিয়ায় ২৭ লক্ষেরও বেশি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে এবং এর বড় অংশ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষ।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন যে শতাধিক আসন কার্যত “চুরি” করা হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও কেন্দ্রীয় সরকারের যোগসাজশে “গণতন্ত্রের হত্যাকাণ্ড” সংঘটিত হয়েছে।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই কলকাতা, হাওড়া, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, জলপাইগুড়ি, বীরভূম, বহরমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিরোধী রাজনৈতিক দলের অফিসে হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং নেতা-কর্মীদের উপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। টালিগঞ্জ, কসবা, বারুইপুর, কামারহাটি, বরানগর ও বহরমপুরে বিরোধী দলীয় কার্যালয় ভাঙচুরের খবর প্রকাশিত হয়েছে।

বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে লেনিনের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার ঘটনা। বিজেপির বিজয়ের পর উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী সেখানে হামলা চালিয়ে লেনিনের ভাস্কর্য ভাঙচুর করে এবং সেখানে সাম্প্রদায়িক প্রতীক স্থাপনের দাবি তোলে। এই ঘটনা কেবল একটি ভাস্কর্য ভাঙা নয়—এটি পশ্চিমবঙ্গের প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও বামপন্থী রাজনৈতিক ঐতিহ্যের উপর সরাসরি আঘাত। একইভাবে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও বামপন্থী নেতা প্রয়াত কমরেড জ্যোতি বসুর আবক্ষ ভাস্কর্যেও কালিমা লেপন করার মতো ঘৃণ্য ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

একইভাবে কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকায় গরুর মাংস বিক্রেতাদের দোকান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও চরম নিন্দনীয়। এটি স্পষ্টতই সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবিকা, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকারের উপর হিন্দুত্ববাদী আক্রমণ। কেন্দ্রের শাসকদলের সমর্থকদের এই “বুলডোজার রাজনীতি” গণতন্ত্রের নয়, বরং উগ্র ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রচর্চার প্রতিফলন।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ঐতিহাসিকভাবে বহুত্ববাদী, যুক্তিবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিদ্যাসাগর, সুভাষ বসু, ভগৎ সিংহ, আশফাকউল্লাহসহ শ্রমিক আন্দোলন ও বামপন্থী সংগ্রামের উত্তরাধিকারবাহী এই ভূখণ্ডে বিজেপির ঘৃণা, বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও সংখ্যাগুরুবাদী হিন্দুত্ববাদ সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এই প্রচেষ্টা শুধু ভারতের গণতন্ত্রের জন্য নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করা ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক।

Manual1 Ad Code

আমরা আরও তীব্র প্রতিবাদ জানাই বিজেপির বিভিন্ন নেতার বাংলাদেশবিরোধী কুরুচিপূর্ণ, উসকানিমূলক ও অবমাননাকর বক্তব্যের বিরুদ্ধে। প্রতিবেশী একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র সম্পর্কে এ ধরনের দম্ভ, অবমাননা ও রাজনৈতিক বিদ্বেষ শুধু কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী নয়, বরং জনগণের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিদ্বেষ সৃষ্টির অপচেষ্টা। বাংলাদেশ কোনো শক্তির করুণা বা তত্ত্বাবধানে পরিচালিত রাষ্ট্র নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত জনগণের স্বাধীন স্বার্বভৌম দেশ। বাংলাদেশের জনগণ সাম্প্রদায়িকতা, আধিপত্যবাদ,সাম্রাজ্যবাদসহ সকল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অতীতেও লড়েছে, এখনও লড়বে।

গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল শক্তির পাশে দৃঢ় সংহতি প্রকাশ করছে। আমরা দাবি জানাই—

১. বিরোধী রাজনৈতিক দল, বামপন্থী সংগঠন ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উপর হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

Manual6 Ad Code

২. জিয়াগঞ্জে লেনিনের ভাস্কর্য ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার করতে হবে।

৩. গরুর মাংস বিক্রেতাদের দোকান ভাঙচুরসহ সকল সাম্প্রদায়িক হামলার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

Manual3 Ad Code

৪. নির্বাচন-পরবর্তী সন্ত্রাস, ভোটার তালিকা কারচুপি ও প্রশাসনিক পক্ষপাতের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।

৫. বিজেপির হিন্দুত্ববাদী ঘৃণার রাজনীতি ও বাংলাদেশবিরোধী উসকানিমূলক বক্তব্য বন্ধ করতে হবে।

আমরা বিশ্বাস করি—গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায় ও জনগণের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম সীমান্ত মানে না। পশ্চিমবঙ্গের গণতান্ত্রিক মানুষের লড়াইয়ে আমাদের পূর্ণ সমর্থন ও সংহতি জানাই। হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদ রুখে দাঁড়াও।

Manual8 Ad Code

গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জনগণের অধিকারের পক্ষে ঐক্য গড়ে তোল।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন, বাসদের সাধারণ সম্পাদক কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ, সিপিবির সভাপতি কমরেড সাজ্জাদ জহির চন্দন, সাধারণ সম্পাদক কমরেড আবদুল্লাহ ক্কাফি রতন, বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া, সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বিপ্লবী কমিউনিষ্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক কমরেড ইকবাল কবির জাহিদ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদ (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক কমরেড মাসুদ রানা, বাসদ (মাহবুব) সাধারণ সম্পাদক কমরেড হারুনার রশীদ ভূইয়া, সমাজতান্ত্রিক পার্টির নির্বাহী সভাপতি কমরেড আব্দুল আলী, জাতীয় গণফ্রন্টের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক রজত হুদা, সোনার বাংলা পাটির সভাপতি সৈয়দ হারুনুর রশীদ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ