দক্ষিণ এশিয়ায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হুমকির মুখে, নিরাপত্তাহীনতায় উদ্বেগ প্রকাশ বিশেষজ্ঞদের

প্রকাশিত: ৪:১৫ অপরাহ্ণ, মে ৮, ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হুমকির মুখে, নিরাপত্তাহীনতায় উদ্বেগ প্রকাশ বিশেষজ্ঞদের

Manual3 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৮ মে ২০২৬ : দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ক্রমেই কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক মেরুকরণ, কর্পোরেট ও আর্থিক চাপ, বিজ্ঞাপননির্ভর সংবাদব্যবস্থা, ডিজিটাল অপপ্রচার এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতার কারণে স্বাধীন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হুমকির মুখে পড়েছে বলে সতর্ক করেছেন দেশি-বিদেশি সাংবাদিক, সম্পাদক ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা।

Manual5 Ad Code

রাজধানীর রেডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনে শুক্রবার (৮ মে ২০২৬) অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স’-এ বক্তারা বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে এখন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর চাপ এবং সংবাদমাধ্যমের আর্থিক নির্ভরতা। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, হয়রানি, অনলাইন ট্রলিং, বিজ্ঞাপন বন্ধের হুমকি এবং প্রতিষ্ঠানিক চাপও বেড়ে চলেছে।

Manual3 Ad Code

সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে অংশ নেওয়া বক্তারা বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কেবল তথ্য প্রকাশের বিষয় নয়; এটি গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সংবাদমাধ্যমগুলো রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের চাপে নিজেদের স্বাধীনতা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।

‘শুধু সাংবাদিকের সাহস যথেষ্ট নয়’

পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ডন’-এর সম্পাদক জাফর আব্বাস বলেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এখন আর শুধু প্রতিবেদকের ব্যক্তিগত সাহস বা দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না। বরং এটি নির্ভর করে সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষ ও ব্যবস্থাপনা কতটা রাজনৈতিক ও আর্থিক ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত তার ওপর।

রাজনৈতিকভাবে মেরুকৃত সমাজে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ নিয়ে আয়োজিত এক সেশনে তিনি বলেন, “দুর্নীতি, অর্থপাচার কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে কাজ করতে গেলে সাংবাদিকরা প্রায়ই পরিকল্পিত অপপ্রচার, বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার এবং নানা ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক চাপে পড়েন। আপনি যখন রাষ্ট্রীয় বা বেসরকারি খাতের দুর্নীতি উন্মোচন করবেন, তখন পাল্টা আঘাত আসবেই।”

Manual4 Ad Code

তিনি বলেন, অনেক সময় সম্পাদকরা গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশে আগ্রহী থাকলেও মালিকপক্ষের সমর্থন না থাকলে তা প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সম্পাদকীয় স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে মালিকপক্ষের দৃঢ় অবস্থান প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জাফর আব্বাস বলেন, প্রোপার্টি ব্যবসা, আর্থিক খাত ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে তার সংবাদমাধ্যমকে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। বিজ্ঞাপন হারানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলের বিরূপ প্রতিক্রিয়া—সবকিছুরই সম্মুখীন হতে হয়েছে তাদের।

Manual5 Ad Code

‘দুর্নীতি এখন বৈশ্বিক বাস্তবতা’

কানাডীয় অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলিয়ান শের বলেন, বর্তমান বিশ্বে দুর্নীতি আর কোনো নির্দিষ্ট দেশের সীমার মধ্যে আবদ্ধ নেই। অর্থ পাচার, অবৈধ সম্পদ স্থানান্তর এবং কর ফাঁকির মতো অপরাধ আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তৃত হওয়ায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের মধ্যেও বৈশ্বিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, “আমি কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, দুর্নীতি এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। অর্থ এক দেশ থেকে অন্য দেশে খুব দ্রুত স্থানান্তরিত হয়। তাই এসব অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া কার্যকর ফল পাওয়া কঠিন।”

জুলিয়ান শেরের মতে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা স্বভাবগতভাবেই একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। কারণ এই ধরনের প্রতিবেদনে প্রভাবশালী ব্যক্তি, করপোরেট গোষ্ঠী কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়। ফলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, “একজন সাংবাদিক একা এখন আর বড় ধরনের অনুসন্ধান সফলভাবে শেষ করতে পারেন না। তথ্য, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা—সবকিছুর জন্য সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন।”

সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা নিয়ে উদ্বেগ

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দেশে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা কিংবা সংবাদমাধ্যমকে লক্ষ্য করে সহিংসতার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

তিনি বলেন, “বিশ্বের বহু দেশে সাংবাদিকরা নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে কাজ করেন। কিন্তু বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের ওপর যেভাবে হামলা হয়েছে এবং অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে কার্যত নীরব থেকেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং দায়িত্বহীনতার পরিচয় বহন করে।”

ড. ইফতেখারুজ্জামান অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি বলেন, “সরকারের কাছে তথ্য ছিল, বিভিন্ন পর্যায়ে আবেদনও করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরো প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে।”

তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নয়; এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মৌলিক দায়বদ্ধতা। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা না হলে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার আরও বাড়বে বলে সতর্ক করেন তিনি।

বাণিজ্যিকীকরণে দুর্বল হচ্ছে জবাবদিহিতামূলক সাংবাদিকতা

সম্মেলনের বক্তারা বলেন, সংবাদমাধ্যম শিল্পের দ্রুত বাণিজ্যিকীকরণ অনুসন্ধানী ও জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। অনেক গণমাধ্যম এখন দর্শকসংখ্যা, বিজ্ঞাপন এবং করপোরেট স্বার্থের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে।

বক্তাদের মতে, দীর্ঘ সময়, দক্ষ জনবল এবং আর্থিক বিনিয়োগের প্রয়োজন হওয়ায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এখন অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ফলে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা পাওয়া যায় এমন সংবাদে গুরুত্ব বাড়ছে, আর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ছে।

তারা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের ফলে তথ্যপ্রবাহ দ্রুত হলেও ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তি ও সংগঠিত অপপ্রচারও বেড়েছে। এতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টাও বাড়ছে।

‘ওয়াচডগ’ ভূমিকা হারানোর শঙ্কা

সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা বলেন, গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদমাধ্যমের প্রধান দায়িত্ব হলো ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় রাখা। কিন্তু সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা না গেলে সংবাদমাধ্যম তার ‘ওয়াচডগ’ বা অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা হারাতে পারে।

বক্তারা অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, আইনি সহায়তা, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা ও দমনমূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটানোর আহ্বান জানান তারা।

সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের সাংবাদিক, মিডিয়া বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রায় ৪ হাজার সাংবাদিক এই আয়োজনে অংশ নিতে রেজিষ্ট্রেশন করেছেন — যা আমাদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই কনফারেন্স ঘিরে অভূতপূর্ব সাড়ায় আমরা সত্যিই অভিভূত ও কৃতজ্ঞ।

আয়োজকরা বলেন, “এই আয়োজন ঘিরে যে আগ্রহ ও অংশগ্রহণ দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে সাংবাদিকতা পেশার ভবিষ্যৎ, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে দেশের সাংবাদিক সমাজ গভীরভাবে চিন্তিত এবং একই সঙ্গে আশাবাদীও।”

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ