বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে মন্ত্রীর মর্যাদা

প্রকাশিত: ১২:৫২ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২৬

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে মন্ত্রীর মর্যাদা

Manual6 Ad Code
  • আনুষ্ঠানিক কার্যাবলীতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার মন্ত্রীর সমতুল্য প্রটোকল সুবিধা; দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে দিল্লির বিশেষ বার্তা দেখছেন বিশ্লেষকরা

কূটনৈতিক প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৫ জুন ২০২৬ : বাংলাদেশে নবনিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে আনুষ্ঠানিক কার্যাবলীর ক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একজন মন্ত্রীর সমতুল্য মর্যাদা প্রদান করেছে ভারত সরকার।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

হাইকমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ভারতের অগ্রাধিকার সারণী (Table of Precedence) আনুষ্ঠানিকভাবে সংশোধন না করেই বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার শ্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার মন্ত্রীর সমতুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তবে এই মর্যাদা শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক ও প্রটোকল-সংশ্লিষ্ট কার্যাবলীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে এবং এটিকে অগ্রাধিকার সারণীর স্থায়ী সংশোধন হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।

Manual7 Ad Code

ভারতের সরকারের আন্ডার সেক্রেটারি কমলেশ রবিদাস স্বাক্ষরিত একটি অফিস মেমোরেন্ডামে এ সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে বুধবার ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (জননিরাপত্তা বিভাগ) জারি করা অফিস স্মারকেও একই বিষয় নিশ্চিত করা হয়।

Manual5 Ad Code

পরিচয়পত্র পেশ করবেন রাষ্ট্রপতির কাছে

বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের উদ্দেশ্যে গত ৫ জুন ঢাকায় পৌঁছান দীনেশ ত্রিবেদী। বৃহস্পতিবার তিনি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে তার পরিচয়পত্র পেশ করার কথা রয়েছে। পরিচয়পত্র পেশের মধ্য দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করবেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদকে ঢাকায় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ এবং তাকে মন্ত্রীর মর্যাদা প্রদান—দুই সিদ্ধান্তই ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।

সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ে দিল্লির কৌশল

গত কয়েক বছরে আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক নানা কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

এমন প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় পাঠানোকে কেবল একটি কূটনৈতিক নিয়োগ হিসেবে নয়, বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন গতি দেওয়ার একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত

দীনেশ ত্রিবেদীর অন্যতম শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তার ভালো ধারণা। তিনি বাংলা বলতে পারেন এবং দুই বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত।

রাজনীতির পাশাপাশি তিনি একজন সেতারবাদক হিসেবেও পরিচিত। ফলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও তিনি ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন

Manual1 Ad Code

গুজরাটি পরিবারে জন্ম নেওয়া দীনেশ ত্রিবেদী হিমাচল প্রদেশের একটি বোর্ডিং স্কুলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে কমার্সে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন।

তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় কংগ্রেসের মাধ্যমে। আশির দশকে কংগ্রেস রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার পর ১৯৯০ সালে তিনি জনতা দলে যোগ দেন। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি জনতা দলের প্রতিনিধি হিসেবে ভারতের রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন।

Manual1 Ad Code

১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করলে তিনি সেই দলে যোগ দেন এবং দলটির প্রথম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন

২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুর আসন থেকে জয়লাভ করে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। পরে ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়লে দীনেশ ত্রিবেদী রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগের কারণে আলোচনায় আসেন। যদিও পরবর্তী সময়ে তাকে সেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

তৃণমূল থেকে বিজেপিতে

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি আবারও ব্যারাকপুর আসন থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হন। তবে সে নির্বাচনে বিজেপির অর্জুন সিংয়ের কাছে পরাজিত হন। এরপর তৃণমূল কংগ্রেস তাকে পুনরায় রাজ্যসভায় পাঠায়।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে দলের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়তে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি তৃণমূল কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন এবং একই বছরের ৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দেন।

কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন দায়িত্ব

দীর্ঘ সংসদীয় ও মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার তিনি কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে তার কার্যক্রম দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার মন্ত্রীর সমতুল্য আনুষ্ঠানিক মর্যাদা প্রদানকে অনেকেই তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বের গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আরও সক্রিয় ও ফলপ্রসূ করার ক্ষেত্রে দিল্লির কূটনৈতিক অগ্রাধিকারেরও একটি প্রতীকী প্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ