বীর মুক্তিযোদ্ধা, কবি ও গীতিকার ফজল-এ-খোদা স্মরণে

প্রকাশিত: ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৪, ২০২৬

বীর মুক্তিযোদ্ধা, কবি ও গীতিকার ফজল-এ-খোদা স্মরণে

Manual8 Ad Code
  • ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’–এর স্রষ্টাকে নানা মহলের শ্রদ্ধা

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৪ জুলাই ২০২৬ : একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণার অন্যতম কণ্ঠস্বর, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট কবি, গীতিকার, ছড়াকার ও সাংস্কৃতিক সংগঠক ফজল-এ-খোদা’র পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

২০২১ সালের ৪ জুলাই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

ফজল-এ-খোদা শুধু একজন গীতিকারই ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সংস্কৃতি ও দেশাত্মবোধের এক অনন্য প্রতীক। তাঁর রচিত কালজয়ী দেশাত্মবোধক গান ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতাকামী বাঙালির সংগ্রামী চেতনাকে জাগিয়ে তুলেছিল। কিংবদন্তি শিল্পী আব্দুল জব্বারের কণ্ঠে গানটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় স্থান দখল করে আছে এবং আজও জাতীয় দিবস ও রাষ্ট্রীয় নানা আয়োজনে সমানভাবে উচ্চারিত হয়।

দীর্ঘ সাংস্কৃতিক জীবনের উজ্জ্বল অধ্যায়

১৯৬৩ সালে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তান, ঢাকা কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত গীতিকার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ফজল-এ-খোদা। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বেতারে দীর্ঘদিন নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরিচালক পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বেতারের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা বাংলা গান ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।

দেশাত্মবোধক গানের পাশাপাশি প্রেম, প্রকৃতি, মানবিক অনুভূতি ও গ্রামীণ জীবন নিয়ে অসংখ্য জনপ্রিয় গান রচনা করেছেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে রয়েছে—

– ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’
– ‘যে দেশেতে শাপলা শালুক ঝিলের জলে ভাসে’
– ‘ভালোবাসার মূল্য কত আমি কিছু জানি না’
– ‘কলসি কাঁধে ঘাটে যায় কোন রূপসী’
– ‘বাসন্তী রং শাড়ি পরে কোন রমণী চলে যায়’
– ‘আমি প্রদীপের মতো রাত জেগে জেগে’
– ‘প্রেমের এক নাম জীবন’
– ‘ভাবনা আমার আহত পাখির মতো, পথের ধুলোয় লুটোবে’

বাংলা গানের ভাণ্ডারে তাঁর এসব সৃষ্টি আজও শ্রোতাদের কাছে সমান জনপ্রিয়।

শিশু-কিশোর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অগ্রদূত

গান লেখার পাশাপাশি ফজল-এ-খোদা ছিলেন একজন খ্যাতিমান ছড়াকার, কবি, সম্পাদক ও সংগঠক। শিশু-কিশোরদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিকাশে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।

Manual5 Ad Code

তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শিশু-কিশোর সংগঠন ‘শাপলা শালুকের আসর’, যা দীর্ঘদিন ধরে নতুন প্রজন্মের সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে। সত্তরের দশকে তিনি ‘শাপলা শালুক’ নামে শিশু-কিশোরদের মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন।

সাহিত্যজীবনে তাঁর রচিত ১০টি ছড়াগ্রন্থ, ৫টি কবিতার গ্রন্থসহ মোট ৩৩টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর সাহিত্যকর্মে দেশপ্রেম, মানবিকতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জীবনবোধের গভীর প্রকাশ ঘটেছে।

শেষ সময়

Manual8 Ad Code

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আগে থেকেই ফজল-এ-খোদা দীর্ঘদিন কিডনি জটিলতা ও ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০২১ সালের ৪ জুলাই ভোর ৪টায় তিনি ইন্তেকাল করেন।

সেদিন সকাল সাড়ে ১০টায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে তাঁর জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়।

তাঁর মৃত্যুর সময় স্ত্রী মাহমুদা সুলতানাও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি তিন ছেলে—ওয়াসিফ-এ-খোদা, ওনাসিস-এ-খোদা (সজীব ওনাসিস) ও ওয়েসিস-এ-খোদাকে রেখে গেছেন।

পরিবারের সদস্য সজীব ওনাসিস সে সময় জানিয়েছিলেন, বড় ভাই ওয়াসিফ-এ-খোদা ও তাঁর স্ত্রীও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেও পরে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

ওয়ার্কার্স পার্টির শ্রদ্ধা

ফজল-এ-খোদার পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি এবং সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা এমপি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

Manual8 Ad Code

এক যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, ফজল-এ-খোদা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ এবং গণমানুষের সংস্কৃতির এক নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী। তাঁর রচিত দেশাত্মবোধক গান মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন মানুষকে সাহস জুগিয়েছিল, তেমনি আজও নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

সৈয়দ আমিরুজ্জামানের শ্রদ্ধা

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আমিরুজ্জামান এক বিবৃতিতে বলেন, ফজল-এ-খোদা ছিলেন এমন এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি তাঁর কলমের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধকে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তিনি বলেন, “‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ শুধু একটি গান নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, আত্মত্যাগ এবং জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। নতুন প্রজন্মের কাছে ফজল-এ-খোদার সাহিত্য ও সংগীতকে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরতে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন।”

স্থানীয় নেতাদের শ্রদ্ধা

ফজল-এ-খোদার পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে আরও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক তাপস ঘোষ, শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সভাপতি দেওয়ান মাসুকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক জালাল উদ্দীন, শ্রীমঙ্গল পৌর শাখার সভাপতি শেখ জুয়েল রানা ও সাধারণ সম্পাদক রোহেল আহমদ, বাংলাদেশ যুবমৈত্রীর শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার সভাপতি জামাল মুশরাফিয়া এবং বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর মৌলভীবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অজিত বোনার্জি।

তাঁরা পৃথক বিবৃতিতে বলেন, ফজল-এ-খোদার সৃষ্টিকর্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, প্রগতিশীল সংস্কৃতি এবং মানবিক সমাজ নির্মাণে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তাঁর আদর্শ ও কর্ম নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম, সংস্কৃতিচর্চা এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ধারণে উৎসাহিত করবে।

জাতির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে অমলিন

Manual8 Ad Code

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির ইতিহাসে ফজল-এ-খোদার নাম এক অনিবার্য অধ্যায়। তাঁর লেখা গান, কবিতা, ছড়া এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আজও সমান প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ গানটি বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা এবং জাতীয় গৌরবের প্রতীক হিসেবে যুগে যুগে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।

পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য সংগঠন তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছে। একই সঙ্গে তাঁরা তাঁর সাহিত্য ও সংগীত ঐতিহ্য সংরক্ষণ, গবেষণা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ