বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরীন বানু মিতিলের দশম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১২:১০ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২১, ২০২৬

বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরীন বানু মিতিলের দশম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Manual6 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২১ জুলাই ২০২৬ : স্বাধীনতা অর্জনের সশস্ত্র লড়াইয়ে পুরুষের ছদ্মবেশে অংশ নেয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরীন বানু মিতিলের দশম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

প্রায় নিভৃতে দশ বছর আগে (২০১৬ সালের ২১শে জুলাই) রাত ১.৩০ মিনিটে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে তিনি মারা যান।

আমাদের অমার্জনীয় বিস্মৃতি চর্চার অন্যতম ‘বলি’, এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। মৃত্যু’র পর তাঁর বীরত্বগাঁথা তুলে এনে কতোটা লাভ হবে, জানা নেই। তবুও, তাঁর বিদেহী আত্মার কাছে ক্ষমা চেয়েই লিখছি।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে নারীর অবদান অনির্ণেয় ও অসীম। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে নারী কখনো গেরিলা যুদ্ধে, কখনও সম্মুখ যুদ্ধে, কখনো সেবিকা, কখনো বার্তাবাহক হিসেবে অবদান রেখেছেন। অগণিত নারী শহীদ হয়েছেন, অগণিতজন তাঁদের আপনতম স্বজন হারিয়েছেন। তাঁদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। সন্দেহ নেই স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্তির ক্ষনেও, তাঁদের উজ্জ্বলতম অবদান স্বীকার করতেই আমাদের যতো কৃপণতা।

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা মহিয়সী মানুষ, শ্রদ্ধেয় শিরীন বানু মিতিলের জন্ম, ১৯৫১ সালের ২রা সেপ্টেম্বর পাবনা জেলায়। বাবা খন্দকার শাহজাহান মোহাম্মদ ও মা সেলিনা বানু। বাবা ছাত্রজীবনে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মা পাবনা জেলার ন্যাপ সভানেত্রী এবং ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের এমপি ছিলেন। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেয়ায় নিজেও ছিলেন রাজনীতি সচেতন। ছোটবেলা থেকেই ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

শিরীন বানু মিতিলের দুই চাচাতো ভাই জিন্দান ও জিঞ্জির যুদ্ধের ময়দানে রওনা হয় তাদের মায়ের নির্দেশে৷ এই মায়ের কথা না বললেই নয়৷ তিনি তাঁর ছেলেদের বলতেন, ‘তোমাদের কি মানুষ করেছি ঘরে থেকে অসহায়ভাবে মরার জন্য? মরতে হলে যুদ্ধ করতে করতে মরো৷” তিনি ছিলেন পাবনা মহিলা পরিষদের আহবায়ক কমিটির সভানেত্রী রাকিবা বেগম ৷ এমন পরিস্থিতিতে মিতিলও ঘরে বসে থাকেননি৷ শার্ট প্যান্ট পরে কিশোর যোদ্ধা সেজে যুদ্ধে অংশ নেন৷
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। এছাড়াও ১৯৭০-১৯৭৩ সাল পর্যন্ত পাবনা জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভানেত্রী এবং কিছু সময়ের জন্য পাবনা জেলা মহিলা পরিষদের যুগ্ম সম্পাদিকা ছিলেন।

২৫শে মার্চ ১৯৭১ সালে দেশের অন্যান্য স্থানের মত পাবনা জেলাও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আক্রমনের শিকার হয়। সাধারন মানুষের উপর নেমে আসে অবর্ণনীয় অত্যাচার। ২৭শে মার্চ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শুরু হয় পাল্টা আক্রমণ। ২৭শে মার্চ পাবনা পুলিশলাইনে যে যুদ্ধ সংগঠিত হয় সেখানে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেয়। তাই নারী হয়ে শত প্রতিকুলতার মাঝে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। জিঞ্জিরের কাছে মাত্র ত্রিশ মিনিটে থ্রি নট থ্রি চালনা শিখে ফেলেন। কিন্তু নারী হিসেবে সে সময়কার সমাজে সম্মুখ যুদ্ধে যাওয়া ছিল খুবই কঠিন ব্যাপার। তাই তিনি বীরকন্যা প্রীতিলতাকে অনুসরন করে পুরুষের পোশাক পরিধান করে পুরুষবেশে যুদ্ধে যোগ দেন।

Manual2 Ad Code

২৮ মার্চ শহরের জেল রোডে টেলিফোন ভবনে দখলদার ৩৬ জন পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে যুদ্ধ হয়৷ যুদ্ধে পাক সেনাদের সবাই মারা পড়ে৷ দু’জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন৷ তখন যুদ্ধ চলছিল নগরবাড়ী ঘাট, আতাইকুলা ও কাশীনাথপুরে৷ এছাড়াও ৩১শে মার্চ পাবনার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপিত হয়। ৯ এপ্রিল নগরবাড়িতে এক প্রচণ্ড যুদ্ধ সংগঠিত হয়। সে সময় কন্ট্রোল রুমের পুরো দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ শুরু হয় আকাশপথে৷ পাশের জেলা কুষ্টিয়ার প্রতিরোধ ভেঙে পড়ছে৷ তাদের বিভিন্ন দল পিছিয়ে যাচ্ছে চুয়াডাঙ্গার দিকে৷ পাবনার ছাত্রনেতা ইকবালের দল একটি গাড়িতে করে কুষ্টিয়া হয়ে চুয়াডাঙ্গার দিকে রওনা হয়৷ গাড়িতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় মিতিল ও তাঁর এক ভাই থেকে যায় কুষ্টিয়ায়৷ পরে কুষ্টিয়া থেকে চুয়াডাঙ্গা যাওয়ার সময় ভারতীয় সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাৎ হয়৷ এরপর ভারতের স্টেটসম্যান পত্রিকার সাংবাদিক মানস ঘোষ মিতিলের ছবিসহ সাক্ষাৎকার ছাপেন৷ ফলে ছেলে সেজে যুদ্ধ করার আর সুযোগ পাননি মিতিল৷
এরপর আরো প্রশিক্ষণের জন্য ভারত চলে যান এ বীর মুক্তিযোদ্ধা। এ সময়ে নাচোল বিদ্রোহের নেত্রী ইলা মিত্রের বাসায় কাটাতে হয়েছে তাঁকে কিছুদিন৷ প্রথমে কয়েকজন নারী বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে ঘুরে ঘুরে মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দল গঠন শুরু করেন৷ তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন তিনি৷

অবশেষে ৩৬ জন নারী নিয়ে গোবরা ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ শুরু হয়৷ আস্তে আস্তে সদস্য সংখ্যা বেড়ে যায়৷ এক পর্যায়ে সদস্য ছিল ২৪০ এর ওপরে৷ সেখানে প্রশিক্ষণ নেন তিনি৷ পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কলকাতায় বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিতে থাকেন৷ অস্ত্রের অভাব থাকায় মহিলা গ্রুপের হাতে অস্ত্র সরবরাহ করা সম্ভব ছিল না৷ তাই প্রথম দলের একটি অংশ আগরতলায় যায় মেডিক্যাল কোরের সদস্য হিসেবে৷ বাকিরা বিভিন্ন এলাকায় ভাগ হয়ে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেন৷

দুঃসাহসী এ মুক্তিযোদ্ধার অবদান ও সাহসিকতা সর্বজন স্বীকৃত। মুক্তিযুদ্ধে তার অংশগ্রহণ ও অবদান নিয়ে কোন প্রশ্ন না থাকলেও, মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় স্থগিত করে রাখা হয়েছে তাঁর নাম। পাবনার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কিত প্রায় প্রতিটি গ্রন্থ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণায়, এই বীর মুক্তিযোদ্ধার গৌরবগাঁথা উচ্চারিত হলেও অজ্ঞাত কারণে জেলা প্রশাসনের তথ্য বাতায়নে সংযুক্ত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নেই তাঁর নাম ও অবদানের কথা।

রাষ্ট্র যদি, এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে তাঁর অর্জিত সম্মানটুকু নাও দেয়, আমাদের আক্ষেপ নেই। শিরীন বানু মিতিল’রা খেতাব অর্জনের লোভে বা মৃত্যুর পর ‘ভেঁপু’র শব্দে দাফনের জন্য যুদ্ধে যাননি। (হ্যাঁ তাঁর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় ভেঁপু বেজেছিল কফিন সামনে রেখে)
পরম করুনাময় চিরশান্তির স্থানে আপনাকে আসীন করুন।

বিদায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা। বর্তমান সময়ে আপনার চলে যাওয়া বড় বেশী কষ্টের। দশম মৃত্যুবার্ষিকীতে আপনাকে স্মরণ করি, আর্দ্র হৃদয়ে, ভালোবাসা আর গভীর শ্রদ্ধায়।

শিরীন বানু মিতিল
—সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরীন বানু মিতিল
লাল সালাম, মহীয়সী বীর

আজও কি ভোরের আলো নামে সেই রক্তমাখা পথে,
আজও কি শপথ জেগে ওঠে বাংলার নীরব রথে?
আজও কি পদ্মার বাতাস বয়ে আনে আগুন-গন্ধ,
স্বাধীনতার প্রতিটি শ্বাসে জাগে রণডঙ্কার ছন্দ?

যে নামটি ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকার কথা,
যে নামটি উচ্চারিত হলে কাঁপে মুক্তির ব্যাকুল ব্যথা,
সে নাম আজও অবহেলায় ধুলোয় পড়ে থাকে—
তবু সে নাম সূর্যের মতো জ্বলে মানুষের চোখে।

শিরীন বানু মিতিল—
বাংলার এক দুর্জয় কন্যা, অগ্নিশিখার দীপ,
যার বুকজুড়ে স্বাধীনতার অমর অনল-দীপ।
যে শিখেছিল—দেশের চেয়ে বড় নয় কোনো প্রাণ,
মুক্ত আকাশের চেয়ে বড় নয় ব্যক্তিগত সম্মান।

পাবনার মাটিতে জন্ম তার, নদী যেমন স্নিগ্ধ,
তেমনি ছিল হৃদয় তার, প্রতিবাদে অদম্য দৃঢ়।
রাজনীতির আলোকঘেরা সচেতন এক ঘর,
সেই ঘরেরই কন্যা হয়ে উঠেছিল অগ্নিস্বর।

পিতা ছিলেন সংগ্রামের পথের দৃঢ় সহযাত্রী,
মাতার চোখে স্বাধীনতার অমল দীপ্তি মাত্রই।
যে পরিবার শেখায় সন্তান—
অন্যায়ের সামনে মাথা নোয়াবে না,
দাসত্বের শৃঙ্খল ছিঁড়ে
স্বাধীনতার পতাকাই হবে শেষ পরিচয় সবার।

মার্চ এল—
কালরাত্রির আগুন নেমে এলো বাংলার বুকে,
মানুষ তখন মৃত্যুকে ডাকে জীবনের সুখে।
চারদিকে শুধু ধোঁয়া, রক্ত, আগুনেরই ঢেউ,
মাতৃভূমি ডাকছে সবাইকে—”এসো, রুখে দাও শত্রুকে।”

সেই ডাকে সাড়া দিয়েছিল এক তরুণী,
নাম তার শিরীন বানু মিতিল।
নারী বলে থেমে থাকেনি,
সমাজের বাঁধন মানেনি,
ভয়কে করেছে নির্বাসিত,
মৃত্যুকেও করেছে অবহেলা।

Manual2 Ad Code

শার্ট পরে, প্যান্ট পরে,
চুল গুটিয়ে, কণ্ঠ বদলে
পুরুষের ছদ্মবেশে
নেমে পড়েছিল রণাঙ্গনে।

এ কেবল পোশাক বদল নয়—
এ ছিল যুগের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
এ ছিল লিঙ্গবৈষম্যের বুকে
একটি বজ্রাঘাত।

মাত্র ত্রিশ মিনিটে শিখে নেয় থ্রি-নট-থ্রি,
তারপর হাতে রাইফেল তুলে দাঁড়ায় শত্রুর দ্বারেই।
কে বলবে সে নারী?
সে তো তখন বাংলারই আরেক সূর্যসন্তান,
যার কাঁধে স্বাধীনতার মানচিত্র।

জেল রোডে যুদ্ধ যখন,
টেলিফোন ভবনের দেয়াল কাঁপে,
গর্জে ওঠে গুলির শব্দ,
মৃত্যু নেমে আসে শত্রুর শিবিরে।
বাংলার সন্তান লড়ে যায়,
মিতিলও ছিল সেই কাতারে।

নগরবাড়ী, আতাইকুলা, কাশীনাথপুর—
প্রতিটি নামই ইতিহাস।
প্রতিটি ধুলোয় মিশে আছে
অসংখ্য বীরের নিশ্বাস।
সেই ইতিহাসের প্রতিটি পাতায়
শিরীন বানুর পদচিহ্ন রয়ে গেছে।

পলিটেকনিকের কন্ট্রোল রুমে
দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় সে।
যুদ্ধ মানে কেবল বন্দুক নয়,
যুদ্ধ মানে সংগঠনও।
যুদ্ধ মানে সাহসের সঙ্গে
বুদ্ধিরও নির্ভুল প্রয়োগ।

কুষ্টিয়ার পথে,
চুয়াডাঙ্গার পথে,
এক বিদেশি সাংবাদিকের ক্যামেরা
ধরে ফেলে ইতিহাস।
ছদ্মবেশ ভেঙে যায়,
কিন্তু ভাঙে না তার সংকল্প।

মানস ঘোষের প্রতিবেদনে
ছড়িয়ে পড়ে এক বাঙালি কন্যার বীরত্ব।
বিশ্ব জানল—
বাংলার মেয়েরাও বন্দুক ধরে,
বাংলার মেয়েরাও যুদ্ধ করে,
বাংলার মেয়েরাও মৃত্যুকে হাসিমুখে গ্রহণ করে।

ভারতের মাটিতে গিয়ে
নতুন লড়াই শুরু।
গোবরা ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ,
নারীদের সংগঠিত করা,
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বক্তব্য,
শরণার্থী শিবিরে আশার প্রদীপ জ্বালানো।

ইলা মিত্রের সান্নিধ্যে
সংগ্রামের আরেক পাঠ শেখা।
ইতিহাস যেন ইতিহাসকে
হাতে হাত রেখে এগিয়ে দেয়।

ছত্রিশ নারী থেকে
দুইশ চল্লিশের অধিক যোদ্ধা—
এ কেবল সংখ্যা নয়,
এ এক মহাকাব্যের বিস্তার।

অস্ত্র ছিল না যথেষ্ট,
তবু সাহসের ঘাটতি ছিল না।
কারও হাতে ব্যান্ডেজ,
কারও হাতে ওষুধ,
কারও হাতে বার্তা,
কারও হাতে রাইফেল—
সবাই ছিল একই যুদ্ধের সৈনিক।

স্বাধীনতা এল।
পতাকা উঠল।
বাংলার আকাশে লাল-সবুজ উড়ল।

Manual6 Ad Code

কিন্তু তারপর?

কত নাম উঠে এল,
কত মুখ পেল আলো,
কতজন পেল সম্মান—
আর কতজন হারিয়ে গেল
বিস্মৃতির কুয়াশায়।

শিরীন বানু মিতিল,
তুমি কি সেই বিস্মৃত নামেরই প্রতীক?

যে নারীর সাহস নিয়ে
প্রজন্মের পর প্রজন্ম লেখা উচিত ছিল পাঠ্যপুস্তক,
যার জীবন নিয়ে নির্মিত হওয়া উচিত ছিল চলচ্চিত্র,
যার নামে প্রতিষ্ঠিত হতে পারত
বিশ্ববিদ্যালয়, সড়ক, গ্রন্থাগার,
তার নামই আজও প্রশ্নের মুখে!

কী আশ্চর্য রাষ্ট্র!
যে সন্তান বুকের রক্ত দিল,
তার পরিচয় দিতে পারে না!
যে নারী যুদ্ধ করল,
তার নাম তালিকায় তুলতেও
দ্বিধা, বিলম্ব, অবহেলা!

কিন্তু ইতিহাসের আদালত
রাষ্ট্রের চেয়ে বড়।
মানুষের হৃদয়
দপ্তরের নথির চেয়ে অনেক বিস্তৃত।

তোমার সম্মান
কোনো সনদে আটকে নেই।
তোমার পরিচয়
কোনো তালিকার দয়ায় নির্ভর করে না।

Manual7 Ad Code

কারণ—
তুমি মুক্তিযোদ্ধা।
এটাই তোমার সর্বোচ্চ পরিচয়।

তুমি খেতাবের জন্য যুদ্ধ করোনি।
রাষ্ট্রীয় ভেঁপুর জন্য যুদ্ধ করোনি।
ক্ষমতার করতালির জন্য যুদ্ধ করোনি।
তুমি যুদ্ধ করেছিলে
বাংলা ভাষার জন্য,
বাংলার মানুষের জন্য,
স্বাধীনতার পতাকার জন্য।

আজ দশ বছর
তুমি চলে গেছ।

কিন্তু সত্যিই কি চলে গেছ?

যখন কোনো কিশোরী
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়—
সেখানে তুমি আছ।

যখন কোনো তরুণ
দেশকে ভালোবাসতে শেখে—
সেখানে তুমি আছ।

যখন কোনো নারী
সমাজের ভয়কে অস্বীকার করে
নিজের অধিকার দাবি করে—
সেখানে তুমি আছ।

তুমি আছো
বাংলার প্রতিটি মুক্ত বাতাসে,
প্রতিটি লাল-সবুজ পতাকায়,
প্রতিটি শহীদের রক্তরাঙা স্মৃতিতে।

আজ আমরা লজ্জিত।
আমরা কৃতজ্ঞও।

লজ্জিত—
কারণ তোমাদের যথার্থ সম্মান
আমরা দিতে পারিনি।

কৃতজ্ঞ—
কারণ তোমরা জীবন দিয়ে
আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছ।

হে মহীয়সী বীর,
ক্ষমা করো আমাদের বিস্মৃতি।
ক্ষমা করো আমাদের অবহেলা।
ক্ষমা করো আমাদের নীরবতা।

আমরা প্রতিজ্ঞা করি—
তোমার নাম আর হারাবে না।
তোমার ইতিহাস আর চাপা পড়বে না।
তোমার বীরত্ব আর বিস্মৃত হবে না।

যতদিন পদ্মা বইবে,
যতদিন মেঘনা গাইবে,
যতদিন বাংলার আকাশে
লাল-সবুজ পতাকা উড়বে—
ততদিন উচ্চারিত হবে তোমার নাম।

শিরীন বানু মিতিল—
তুমি কেবল একজন মুক্তিযোদ্ধা নও,
তুমি স্বাধীনতার সাহসী উচ্চারণ,
তুমি বাংলার নারীমুক্তির দীপ্ত প্রতীক,
তুমি প্রতিবাদের অগ্নিশিখা,
তুমি অবিনশ্বর এক ইতিহাস।

তোমাকে জানাই
অন্তহীন শ্রদ্ধা।
অশেষ কৃতজ্ঞতা।
অমলিন ভালোবাসা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরীন বানু মিতিল—
লাল সালাম!
রেড সেলুট, মহীয়সী বীর!

তোমার স্মৃতি হোক
বাংলার প্রতিটি সন্তানের শপথ,
প্রতিটি হৃদয়ের প্রেরণা,
প্রতিটি সংগ্রামের সাহস।

আর ইতিহাস—
সে যেন আর কখনো
তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের
বিস্মৃতির অন্ধকারে
ফেলে না রাখে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ