সিলেট ২৩শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৩:৪০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২২, ২০২৬
প্রত্যন্ত জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক | সিলেট, ২২ আগস্ট ২০২৬ : সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত ফুলসাইন্দ এলাকায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘গ্রামীণ কল্যাণ ফুলসাইন্দ সামাজিক হাসপাতাল ও আঞ্চলিক অফিস’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে।
নতুন এই সামাজিক হাসপাতাল চালুর ফলে গোলাপগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও স্বাস্থ্য পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
শনিবার (২২ আগস্ট ২০২৬) সকাল ১১টায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে হাসপাতাল ও আঞ্চলিক অফিসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান মো. আশরাফুল হাসান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গ্রামীণ কল্যাণের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম মঈনউদ্দিন চৌধুরী, খলিল বিন ওয়াহিদ, মেজর (অব.), বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং ৭ নম্বর লক্ষণাবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খলকুর রহমান।
এছাড়া ফুলসাইন্দ ও আশপাশের এলাকার জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, স্থানীয় সুধীজন, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার নতুন সুযোগ
দূরবর্তী গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে দূরত্ব, যাতায়াত ব্যয় এবং সময়ের সংকট দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। বিশেষ করে নিম্নআয়ের ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের জন্য ছোটখাটো অসুস্থতার চিকিৎসা থেকে শুরু করে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিংবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এ বাস্তবতায় ফুলসাইন্দে সামাজিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেখছে গ্রামীণ কল্যাণ।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো গোলাপগঞ্জ ও আশপাশের এলাকার মানুষের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসার জন্য দূরবর্তী শহর বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমানো। এর ফলে সাধারণ মানুষ সহজে প্রাথমিক চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশেষায়িত পরামর্শ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ পাবেন।
ফুলসাইন্দ সামাজিক হাসপাতালে সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা চালু করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে নারী ও প্রসূতি স্বাস্থ্যসেবা, চক্ষু চিকিৎসা, নাক-কান-গলা (ইএনটি) চিকিৎসা, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা ও পরামর্শ, স্যাটেলাইট স্বাস্থ্যসেবা, বাড়ি-বাড়ি স্বাস্থ্যসেবা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরামর্শ। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থাও থাকবে।
বাড়ি বাড়ি স্বাস্থ্যসেবা ও রেফারেল ব্যবস্থা
শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসার পরিবর্তে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে গ্রামীণ কল্যাণ। প্রতিষ্ঠানটির প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্য সহকারীরা নিয়মিতভাবে ফুলসাইন্দ ও আশপাশের এলাকার মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা, পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবেন।
এ কার্যক্রমের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির স্বাস্থ্যঝুঁকি বা জটিলতা প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হলে প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে সামাজিক হাসপাতালে রেফার করা হবে। এতে রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ কমার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো গড়ে উঠবে বলে আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রায় ৫০ হাজার মানুষের উপকারের আশা
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ৭ নম্বর লক্ষণাবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খলকুর রহমান বলেন, ফুলসাইন্দে গ্রামীণ কল্যাণের সামাজিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা স্থানীয় জনগণের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের বিষয়। হাসপাতালটি চালু হওয়ায় তাঁর ইউনিয়নসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ পাবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য হাতের নাগালে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন এই হাসপাতালের মাধ্যমে এলাকার মানুষের চিকিৎসা গ্রহণের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে। গ্রামীণ কল্যাণের কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে তাঁর এবং ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
সিলেট অঞ্চলের কার্যক্রমে বাড়বে সমন্বয়
ফুলসাইন্দে সামাজিক হাসপাতালের পাশাপাশি গ্রামীণ কল্যাণের আঞ্চলিক অফিস প্রতিষ্ঠা করায় সিলেট অঞ্চলে প্রতিষ্ঠানটির স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের সমন্বয়, তদারকি ও সম্প্রসারণ আরও কার্যকর হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আঞ্চলিক অফিসের মাধ্যমে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত কার্যক্রমের ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয় সহজ হওয়ার পাশাপাশি নতুন নতুন এলাকায় কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত চাহিদা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী সেবার পরিধি নির্ধারণ করাও সহজ হবে।
প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাসপাতাল ও আঞ্চলিক অফিসকে কেন্দ্র করে শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, স্বাস্থ্য সচেতনতা, রোগ প্রতিরোধ, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়েও স্থানীয় পর্যায়ে কার্যক্রম জোরদার করার সুযোগ তৈরি হবে।
১৯৯৬ সাল থেকে স্বাস্থ্যসেবায় গ্রামীণ কল্যাণ
সামাজিক ব্যবসার দর্শনকে সামনে রেখে ১৯৯৬ সাল থেকে দেশের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করে আসছে গ্রামীণ কল্যাণ। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৩৮টি জেলায় ১৫৩টি কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি কমিউনিটি-ভিত্তিক কার্যক্রমকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এর অংশ হিসেবে চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্য পরামর্শ, রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রেফারেল সেবার সমন্বয়ে একটি ধারাবাহিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা
গ্রামীণ কল্যাণের মতে, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার ও প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি দারিদ্র্য হ্রাস, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং একটি সুস্থ ও উৎপাদনশীল সমাজ গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অসুস্থতার কারণে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের ওপর যে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়, স্থানীয় পর্যায়ে সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে তা কমানো সম্ভব।
বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের স্বাস্থ্যসেবা, শিশুস্বাস্থ্য, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা সহজলভ্য হলে রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে বাড়ি-বাড়ি স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যচর্চার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেতে পারে।
ফুলসাইন্দ সামাজিক হাসপাতালকে এ বৃহত্তর উদ্যোগেরই একটি অংশ হিসেবে দেখছে গ্রামীণ কল্যাণ। প্রতিষ্ঠানটির প্রত্যাশা, নতুন এই হাসপাতাল ও আঞ্চলিক অফিসের মাধ্যমে গোলাপগঞ্জসহ সিলেট অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি আরও বিস্তৃত ও জনমুখী হবে।
স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি, দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানোর মধ্য দিয়ে ফুলসাইন্দ সামাজিক হাসপাতাল দীর্ঘমেয়াদে এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি