মুফতীয়ে আজম আল্লামা আবু তাহের রহমানপুরীর ১৪তম ওরুশ ৯ সেপ্টেম্বর

প্রকাশিত: ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬

মুফতীয়ে আজম আল্লামা আবু তাহের রহমানপুরীর ১৪তম ওরুশ ৯ সেপ্টেম্বর

Manual6 Ad Code
বিশেষ প্রতিনিধি | বাহুবল (হবিগঞ্জ), ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : বর্তমান শতাব্দীর তরীকত জগতের অন্যতম পথিকৃৎ, প্রথিতযশা ইসলামী চিন্তাবিদ, পৃথিবী বিখ্যাত ধর্মীয় নেতা, ‘৭১-এর বীর মুক্তিযোদ্ধা, পাক পাঞ্জাতন আহলে বায়েতের প্রবক্তা ও দার্শনিক, মুফতীয়ে আজম, মুর্শীদে বরহক, মোফাক্কেরে ইসলাম, ইমামে আহলে সুন্নাত, মুজাদ্দেদে জামান, অসংখ্য গ্রন্থের প্রণেতা, সাবহে সাইয়ারা, আল্লামা গাজী সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ আবু তাহের সাহেব কিবলা রহমানপুরী (রহ:) আউলিয়ার ১৪তম পবিত্র ওরুশ মোবারক আগামী ৯ সেপ্টেম্বর বুধবার হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার স্নানঘাট ইউনিয়নের আশাতলা গ্রামে অনুষ্ঠিত হবে।

এ উপলক্ষে তাঁর মাজার শরীফ প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী বিভিন্ন ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওরুশে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাঁর ভক্ত, অনুসারী, মুরিদ ও শুভানুধ্যায়ীরা অংশ নেবেন। এ ছাড়া দেশের বাইরে অবস্থানরত তাঁর অনুসারীদের মধ্য থেকেও অনেকে এ আয়োজনে উপস্থিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওরুশ উপলক্ষে আশাতলা ও আশপাশের এলাকায় ইতোমধ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
দুনিয়ার সফর সমাপ্ত করে আল্লাহ ও তাঁর হাবিবে পাক (দঃ)-এর সান্নিধ্য ও নৈকট্য লাভে মুফতীয়ে আজম আল্লামা আবু তাহের রহমানপুরী ২০১২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর শ্রীমঙ্গল শহরের কলেজ রোডের নিজ বাসভবনে আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।
পর্দা নেওয়ার পর তাঁর মরদেহ হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার স্নানঘাট ইউনিয়নের আশাতলা গ্রামে সমাহিত করা হয়। প্রতিবছর তাঁর ইন্তেকালবার্ষিকী উপলক্ষে সেখানে ওরুশ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। চলতি বছর তাঁর ইন্তেকালের ১৪ বছর পূর্ণ হচ্ছে।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
মুর্শীদে বরহক মোফাক্কেরে ইসলাম ইমামে আহলে সুন্নাত মুজাদ্দেদে জামান, গাজী সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ আবু তাহের সাহেব কিবলা রহমানপুরী ১৯২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ফজরের নামাজের পূর্বে কুমিল্লা জেলার অন্তর্গত ৯ নম্বর দক্ষিণ শিলমুড়ী ইউনিয়নের রহমানপুর দরবার শরীফে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন জান্নাতবাসী মহাসাধক জিন্দাপীর শাহ্সুফী গাজী লালমিয়া শাহ্ দরবেশ (রহ.)। রহমানপুর দরবার শরীফের আধ্যাত্মিক পরিবেশেই তাঁর শৈশব ও পারিবারিক জীবন গড়ে ওঠে।
শৈশব থেকেই তিনি ধর্মীয় শিক্ষা ও ইসলামী জ্ঞানচর্চার প্রতি মনোযোগী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ফিকহ, হাদিস, তাফসির, আরবি, ফার্সি, উর্দুসহ ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর অনুসারীদের মতে, ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি তিনি আধ্যাত্মিক সাধনা ও ইসলামী দর্শনচর্চায়ও আজীবন সময় ব্যয় করেন।
আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা
শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল মিশরের ঐতিহাসিক আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অধ্যয়ন। ১৯৫১ সালে ফিকহ শাস্ত্রে কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ‘সাবহে সাইয়ারাহ’ হিসেবে অভিহিত হন এবং ‘মুফতীয়ে আজম’ উপাধি, সনদ ও স্বর্ণপদক লাভ করেন বলে তাঁর অনুসারী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো উল্লেখ করে থাকে।
আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি দেশে-বিদেশে ইসলামী জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ইসলামী গবেষণা ও গ্রন্থ রচনা করেন।
শিক্ষকতা, জ্ঞানচর্চা ও ধর্ম প্রচার
ষাটের দশকের অধিকাংশ সময় তিনি বিভিন্ন মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরবি, ফার্সি ও উর্দু বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। ভারতের হায়দ্রাবাদের মাদ্রাসায়ে নিজামিয়ায় তিনি ‘মোহাদ্দেছে আজম’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষকতা জীবনে তিনি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; ইসলামী দর্শন, ফিকহ, আধ্যাত্মিকতা, আহলে সুন্নাতের আকিদা এবং পাক পাঞ্জাতন আহলে বায়েতের ভাবধারা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা ও লেখালেখি করতেন। তাঁর রচনাবলিতে ধর্মীয় জ্ঞান, আধ্যাত্মিক সাধনা ও ইসলামী দর্শনের বিভিন্ন বিষয় স্থান পেয়েছে বলে অনুসারীরা জানান।
তাঁর জীবদ্দশায় তিনি অসংখ্য ইসলামী গ্রন্থ রচনা করেন। এসব গ্রন্থ ও তাঁর বক্তৃতা-লেখালেখির মাধ্যমে দেশের পাশাপাশি বিদেশেও তাঁর অনুসারী ও পাঠকগোষ্ঠী তৈরি হয়।
দেশ-বিদেশে ধর্মীয় সফর
ইসলামী কর্মকাণ্ড, শিক্ষা, গবেষণা ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আল্লামা রহমানপুরী বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা পরিদর্শন করেন। তাঁর সফরের মধ্যে মক্কা মোয়াজ্জমা, মদিনা মনোয়ারা, আরব আমিরাত, ইরাক, ইরান, মিশর, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কুয়েত উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন মাজার শরীফ, মাদ্রাসা ও ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্রেও তিনি সফর করেন। আজমীর শরীফসহ ভারতের বিভিন্ন ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্রের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল বলে তাঁর অনুসারীরা জানান।
যুক্তরাজ্যে আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলনে অংশগ্রহণ
আল্লামা আবু তাহের রহমানপুরীর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতির ক্ষেত্রে ১৯৮৯ সালে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত ইমাম আহমদ রেজা আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলনে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ওই সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশ থেকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হন।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্য ওলামা সংসদ আয়োজিত বিভিন্ন ইসলামী সম্মেলনেও তিনি সম্মানিত অতিথি হিসেবে অংশ নেন। এসব সম্মেলনে ইসলামী দর্শন, ফিকহ, আধ্যাত্মিকতা ও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয় নিয়ে তিনি বক্তব্য দেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
মুক্তিযুদ্ধেও সম্পৃক্ততা
আল্লামা রহমানপুরীর জীবনীতে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের স্বাধীনতার পক্ষে ভূমিকা রাখেন এবং একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন স্মারক ও লেখায় মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
তরীকত ও আধ্যাত্মিক সাধনায় পথিকৃৎ 
আল্লামা আবু তাহের রহমানপুরী ছিলেন শরীয়ত, হাকিকত ও মারেফাতের পাশাপাশি তরীকত ও আধ্যাত্মিক সাধনার একজন পথপ্রদর্শক ও পথিকৃৎ। পাক পাঞ্জাতন আহলে বায়েতের প্রতি ভালোবাসা, ইসলামী আধ্যাত্মিকতা, মানবকল্যাণ ও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ওপর তিনি গুরুত্ব দিতেন।
তাঁকে অনুসরণকারী ভক্তদের অনেকে মনে করেন, তাঁর ধর্মীয় শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক দর্শন পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধ ও নৈতিক চেতনা বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে। এ কারণে তাঁর প্রয়াণদিবস ঘিরে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনুসারীরা আশাতলায় এসে মিলিত হন।
৯ সেপ্টেম্বর ওরুশ
২০১২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি দুনিয়ার সফর সমাপ্ত করে আল্লাহ ও তাঁর হাবিবে পাক (দঃ)-এর সান্নিধ্য ও নৈকট্য লাভে আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নেওয়ার পর থেকে প্রতিবছর ৯ সেপ্টেম্বর তাঁর স্মরণে ওরুশ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবার ১৪তম ওরুশ উপলক্ষে আশাতলায় তাঁর মাজার শরীফকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।
ওরুশকে ঘিরে কোরআন তেলাওয়াত, ওয়াজ-মাহফিল, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তাঁর জীবন ও কর্মের ওপর আলোচনা এবং তাঁর রুহানি ফয়েজ হাসিলের জন্য মানবকূলের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়ারও আয়োজন থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুলসংখ্যক ভক্ত, অনুসারী ও ধর্মপ্রাণ মানুষ ওরুশে অংশ নেবেন। আগতদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
আশাতলায় শেষ ঠিকানা
প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও পীর হিসেবে দীর্ঘ কর্মময় সুফিবাদী জীবন শেষে ২০১২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর শ্রীমঙ্গলের কলেজ রোডের নিজ বাসভবনে আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন আল্লামা আবু তাহের রহমানপুরী। পরে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার স্নানঘাট ইউনিয়নের আশাতলায় তাঁকে সমাহিত করা হয়। বর্তমানে সেখানেই তাঁর মাজার শরীফ অবস্থিত।
প্রতি বছর তাঁর ওরুশ উপলক্ষে আশাতলায় ধর্মপ্রাণ মানুষের সমাগম ঘটে। ভক্ত-অনুসারীদের কাছে স্থানটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। তাঁর জীবন, শিক্ষা, ধর্মীয় চিন্তা ও আধ্যাত্মিক দর্শন নিয়ে আলোচনা করতেই প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এখানে আসেন।
এবারও ৯ সেপ্টেম্বরের ওরুশকে কেন্দ্র করে আশাতলা এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে দেশ-বিদেশের ভক্ত ও অনুসারীদের ওরুশে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।