সিলেট ২৪শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০:৪২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২৬
শুধু সাম্রাজ্যবাদবিরোধী স্লোগান দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের করপোরেট অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। পুঁজির আধিপত্যের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেওয়া সহজ, কিন্তু সেই পুঁজির শোষণ থেকে মানুষকে মুক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন। বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি একসময় মুখের কথায় পরিণত হয়, আর মানুষের জীবন বদলানোর রাজনীতি ক্রমে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের বামপন্থীদের সামনে আজ এই কঠিন বাস্তবতা।
চীনের নেতা দেং জিয়াও পিংয়ের বহুল আলোচিত একটি বক্তব্য এখানে প্রাসঙ্গিক। তাঁর কথা ছিল, বিড়াল কালো না সাদা, সেটি বড় কথা নয়; ইঁদুর ধরতে পারলেই বিড়াল ভালো। কথাটির রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। কোনো অর্থনৈতিক নীতি বা ব্যবস্থা কতটা বিপ্লবী, তার বিচার শুধু তার নাম, তত্ত্ব কিংবা মতাদর্শ দিয়ে হয় না; বিচার করতে হয় মানুষের জীবন কতটা বদলাতে পারল, উৎপাদনশীলতা কতটা বাড়ল, দারিদ্র্য কতটা কমল এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা কার হাতে থাকল, তা দিয়ে।
দেংয়ের সংস্কারনীতি চীনকে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত করার পথ খুলে দিয়েছে। বাজার, বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে কাজে লাগিয়ে চীন যে উৎপাদনক্ষমতা গড়ে তুলেছে, তা মার্কিন নেতৃত্বাধীন করপোরেট অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একমাত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তবে চীনের অভিজ্ঞতাকে নিখুঁত সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বাস্তবায়ন বলে ধরে নেওয়ারও সুযোগ নেই। সেখানে আয়বৈষম্য, শ্রমিকের অধিকার, পরিবেশগত ক্ষতি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। শিক্ষা হলো, অর্থনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা জরুরি; একই সঙ্গে সেই শক্তি কার স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, তারও জবাবদিহি থাকতে হবে।
একবিংশ শতাব্দীর বামপন্থীদের তাই দুটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। প্রথমত, বাজার অর্থনীতির বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কি মানুষের জীবন বদলানো সম্ভব? দ্বিতীয়ত, বাজারকে কাজে লাগাতে গিয়ে যদি মুনাফাই সমাজের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, তাহলে সমাজতন্ত্রের স্বাতন্ত্র্য কোথায় থাকবে?এই দুই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে।
চীনের সংস্কার অভিজ্ঞতা থেকে ভিয়েতনামও শিক্ষা নিয়েছে। ১৯৮৬ সালে শুরু হওয়া ‘দই মই’ সংস্কারের মাধ্যমে দেশটি কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব বজায় রেখে বাজারের শক্তিকে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা দেখায়, সমাজতান্ত্রিক পরিচয় বজায় রেখেও অর্থনৈতিক নীতি পরিবর্তন করা যায়। তবে সেখানেও শ্রমিকের অধিকার, আয়বৈষম্য, পরিবেশ ও রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন অমীমাংসিত।
কিউবার অভিজ্ঞতা আবার ভিন্ন। দীর্ঘদিনের মার্কিন অবরোধ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে দেশটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি ক্ষুদ্র বেসরকারি উদ্যোগ ও সমবায়ের পরিসর বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংস্কার, খাদ্য ও জ্বালানির সংকট, উৎপাদনশীলতা এবং নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্ন সেখানে এখনো গুরুত্বপূর্ণ। চীন, ভিয়েতনাম ও কিউবা একই পথ অনুসরণ করছে না। প্রত্যেকেই নিজস্ব ইতিহাস, রাজনৈতিক কাঠামো ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে পথ খুঁজছে।
অতএব, বাংলাদেশের বামপন্থীদের কাজ চীন, ভিয়েতনাম কিংবা কিউবার মডেল হুবহু অনুকরণ করা নয়। বরং তাদের অভিজ্ঞতার সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের জন্য কার্যকর বিকল্প নির্মাণ করা।
কিন্তু বাংলাদেশের বাম রাজনীতিতে সেই প্রস্তুতি কতটা আছে? সাম্রাজ্যবাদ, লুটেরা পুঁজি, করপোরেট আধিপত্য ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ রয়েছে। শ্রমিক-কৃষকের অধিকার নিয়ে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসও রয়েছে। কিন্তু সেই সংগ্রামের পাশাপাশি উৎপাদন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, বাজার, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি সুস্পষ্ট বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মসূচি কতটা দৃশ্যমান? শুধু পুঁজিবাদের পতনের প্রত্যাশা থাকলেই তো চলবে না; তার পরিবর্তে কী প্রতিষ্ঠিত হবে, কীভাবে হবে এবং সাধারণ মানুষ তার সুফল কীভাবে পাবে, তার উত্তরও দিতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির দিকে তাকালেই বিকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কৃষক উৎপাদন করেন, কিন্তু উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান না। মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজারের শক্তিশালী পক্ষগুলো অনেক সময় উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে বাড়তি মুনাফা তুলে নেয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পুঁজি ও ঋণের সংকটে পড়েন। শ্রমিক উৎপাদনে অবদান রাখেন, কিন্তু মজুরি ও কর্মপরিবেশের ন্যায্যতা নিশ্চিত হয় না। অন্যদিকে, ব্যাংকঋণ, সরকারি ক্রয়, জমি, জ্বালানি ও নীতিগত সুবিধা বণ্টনে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বাড়তি সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব সমস্যা শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতায় দূর হবে না; প্রয়োজন বিকল্প প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক গণতন্ত্র এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা।
আমার বিবেচনায়, বাংলাদেশের বামপন্থীদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে উৎপাদকদের ক্ষমতা বাড়ানো। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের নিয়ে বহুমুখী সমবায় গড়ে তুলতে হবে। এই সমবায় শুধু ঋণ বিতরণ বা সার-বীজ সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। যৌথভাবে কৃষি উপকরণ কেনা, যন্ত্রপাতি ব্যবহার, ফসল সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমবে, অপচয় হ্রাস পাবে এবং বাজারে দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। তিস্তা অববাহিকার মতো কৃষিনির্ভর অঞ্চলে এ ধরনের সমবায় কৃষি, মৎস্য, পশুপালন ও ক্ষুদ্র শিল্পের সমন্বিত অর্থনীতি গড়ে তোলার ভিত্তি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, শ্রমিকের অধিকার ও উৎপাদনশীলতাকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা যাবে না। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দক্ষতা, প্রযুক্তি ও উৎপাদনের মান বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে সুলভ অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বাজারসংযোগ দিতে হবে। শ্রমিকের অধিকার ক্ষুণ্ন করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কৌশল যেমন টেকসই নয়, তেমনি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির প্রশ্ন উপেক্ষা করেও কর্মসংস্থান ও মজুরি বাড়ানো যাবে না।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় মালিকানা আর জনস্বার্থ এক কথা নয়। কোনো প্রতিষ্ঠান সরকারের মালিকানায় থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জনগণের সম্পদ হয়ে ওঠে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিয়োগ, দুর্নীতি, অপচয় ও অদক্ষতা থাকলে জনগণই তার মূল্য দেয়। তাই রাষ্ট্রীয় খাতের সংস্কার করতে হবে পেশাদার ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছ হিসাব, শ্রমিকের অংশগ্রহণ এবং জনস্বার্থের জবাবদিহির ভিত্তিতে। যেখানে বেসরকারি উদ্যোগ কার্যকর, সেখানে ন্যায্য প্রতিযোগিতা ও শ্রমিক-ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আর যেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি, বিদ্যুৎ ও মৌলিক সেবায় মুনাফার একচেটিয়া আধিপত্য জনস্বার্থের পরিপন্থী, সেখানে শক্তিশালী গণমুখী সরকারি ব্যবস্থার প্রয়োজন।
চতুর্থত, করপোরেট পুঁজির আধিপত্য মোকাবিলায় প্রযুক্তি ও জ্ঞানের ওপর গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ও ডিজিটাল বাণিজ্য অর্থনীতির চরিত্র বদলে দিচ্ছে। প্রযুক্তিকে কেবল বড় প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বাড়ানোর হাতিয়ার হতে দেওয়া যাবে না। কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী ও শ্রমিকের জন্য প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, সহজলভ্য ডিজিটাল সেবা এবং তথ্যের ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির কারণে কর্মসংস্থান হারানো মানুষের পুনঃপ্রশিক্ষণ ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
পঞ্চমত, বিকল্প অর্থনীতি গড়তে অর্থের সংস্থান কোথা থেকে আসবে, তার বাস্তবসম্মত উত্তর দিতে হবে। কর ফাঁকি বন্ধ, করব্যবস্থায় ন্যায্যতা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস, ব্যাংকঋণের সুশাসন এবং অবৈধ অর্থপ্রবাহ রোধের প্রশ্নকে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আনতে হবে। বড় সম্পদ ও উচ্চ আয়ের ওপর ন্যায়সংগত কর, উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ এবং সামাজিক সুরক্ষায় কার্যকর বিনিয়োগের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। শুধু রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলে চলবে না; রাজস্ব কোথা থেকে আসবে এবং অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, সেটিও স্পষ্ট করতে হবে।
তবে অর্থনৈতিক কর্মসূচিই যথেষ্ট নয়। বিকল্প সমাজতন্ত্রের কেন্দ্রে থাকতে হবে গণতন্ত্র। শ্রমিক-কৃষক ও সাধারণ মানুষের নামে কথা বললেই তাদের ক্ষমতায়ন হয় না। সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ, স্বাধীন সংগঠন গড়ার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে দুর্বল করে কিংবা ভিন্নমতকে দমন করে মানুষের মুক্তির সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায় না। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে মানুষের সম্মিলিত অধিকার ও গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণই হওয়া উচিত সমাজতান্ত্রিক বিকল্পের ভিত্তি।
বাংলাদেশের বামপন্থীদের আরেকটি দুর্বলতা হলো, বিভিন্ন বাম দল ও গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে ন্যূনতম অর্থনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে ঐক্য গড়ে তোলার ঘাটতি। মতাদর্শগত বিতর্ক থাকবে, রাজনৈতিক পথ নিয়েও মতভেদ থাকবে। কিন্তু কৃষকের ন্যায্য মূল্য, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সুশাসন, শিক্ষা-স্বাস্থ্যকে নাগরিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, একচেটিয়া ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের মতো প্রশ্নে অভিন্ন কর্মসূচি তৈরি করা সম্ভব। এই কর্মসূচিকে শুধু নির্বাচনী ইশতেহারে সীমাবদ্ধ না রেখে পাড়া, গ্রাম, কারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকার পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে।
এখানে একটি মৌলিক কথা মনে রাখা প্রয়োজন। সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে একটি বিদেশি শক্তির পরিবর্তে অন্য একটি বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া নয়। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত কিংবা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি গ্রহণে দরকার স্বচ্ছ চুক্তি, ন্যায্য শর্ত, স্থানীয় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা। আত্মনির্ভরতা মানে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা নয়; বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন সক্ষমতা নিয়ে অংশ নেওয়া, যাতে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতা অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে না হয়।
একবিংশ শতাব্দীর সমাজতন্ত্রের বিকল্প তাই অতীতের কোনো ব্যবস্থার হুবহু পুনরাবৃত্তি হতে পারে না। তাকে একই সঙ্গে উৎপাদনশীল, বৈষম্যহীন, পরিবেশবান্ধব, প্রযুক্তিসক্ষম ও গণতান্ত্রিক হতে হবে। বাজারকে প্রয়োজনমতো কাজে লাগাতে হবে, কিন্তু বাজারকে মানুষের ভাগ্যনির্ধারক হতে দেওয়া যাবে না। রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হবে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে জবাবদিহির বাইরে রাখা যাবে না। সমবায় ও সামাজিক মালিকানা সম্প্রসারণ করতে হবে, কিন্তু সেগুলোকে অদক্ষতা ও দলীয় নিয়ন্ত্রণের শিকার হতে দেওয়া যাবে না। এই ভারসাম্যই নতুন সমাজতান্ত্রিক চিন্তার বড় পরীক্ষা।
বাংলাদেশের বামপন্থীদের সামনে এখন সিদ্ধান্তের সময়। তাঁরা কি শুধু অতীতের গৌরব, বিপ্লবের স্মৃতি ও পরিচিত স্লোগানের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবেন, নাকি মানুষের বর্তমান সংকটের বাস্তব সমাধান নিয়ে মাঠে নামবেন? কৃষকের হাতে বাজারের ক্ষমতা, শ্রমিকের হাতে অধিকার ও মর্যাদা, তরুণের হাতে দক্ষতা ও কর্মসংস্থান, সাধারণ মানুষের হাতে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের সুযোগ এবং রাষ্ট্রের হাতে জনস্বার্থ রক্ষার কার্যকর ক্ষমতা—এই লক্ষ্যগুলোকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক কর্মসূচি গড়ে তোলাই হতে পারে উত্তরণের পথ।
দেং জিয়াও পিংয়ের বিড়ালের উপমার আসল শিক্ষা এখানেই। কোন তত্ত্বের নাম কত আকর্ষণীয়, কোন স্লোগান কত উচ্চকণ্ঠ কিংবা কে কত বেশি বিপ্লবী—সেটিই শেষ কথা নয়। শেষ কথা হলো, মানুষের জীবনে সেই রাজনীতি কী পরিবর্তন আনতে পারল। সাম্রাজ্যবাদের করপোরেট ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কার্যকর বিকল্প গড়তে হলে বামপন্থীদের এখন তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তবতার, প্রতিবাদের সঙ্গে নির্মাণের এবং রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতার সংযোগ ঘটাতে হবে।
সময় এসেছে শুধু বিদ্যমান ব্যবস্থার বিকল্প ন্যায়সংগত ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার রূপরেখা হাজির করার। সেই রূপরেখা যদি মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলেই বাম রাজনীতি নতুন প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পাবে। অন্যথায়, স্লোগান যতই উচ্চকণ্ঠ হোক, ইতিহাসের মঞ্চে তাদের উপস্থিতি ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসবে।
#
অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী
শিক্ষাবিদ, সমাজচিন্তক, কলামিস্ট এবং পরিবেশ ও নদী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি