সিলেট ২৪শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১:৪৭ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৬, ২০২৩
অতীতে একটি বিশেষ সাদা-চামড়ার জাতির মানুষদের দেশীয় লোকেরা কখনো ‘ট্যাঁশ’, তো কখনো আবার ‘ফিরিঙ্গি’ বলে অভিহিত করতেন। এছাড়া আরো বহু নামে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সাহেবরা নানা শব্দে তাঁদের অভিহিত করেছিলেন। ইউরোপীয়ানদের লেখা বিভিন্ন গ্রন্থ ও নথিতে – ‘টোপাস’, ‘মুস্তি’, ‘ক্রিওল’, ‘পর্তুগীজ’, ‘এ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান’, ‘ইণ্ডো-বৃটন’, ‘মেস্তিজ’, ‘কান্তি’ ইত্যাদি শব্দগুলি একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে বলে দেখতে পাওয়া যায়। আগে যেসব ইংরেজ ভারত সম্পর্কে বই লিখেছিলেন, তাঁরা ‘এ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান’ বলে ভারতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী যেকোন ইংরেজকেই বোঝাতে চেয়েছিলেন। পদ যাই হোক না কেন, রক্তের দিক থেকে তাঁরা খাঁটি ইংরেজই ছিলেন। তবে বিংশ শতক থেকে ভারতে এ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান বলতে মিশ্রবর্ণের নরনারীদের বোঝানো হয়। রক্তে দিক থেকে তাঁরা কুলীন নন। শব্দটি উনার্থক। কিন্তু এ্যাংলো-ইণ্ডিয়ানদের বহু আগেই ভারতে ফিরিঙ্গিদের উদ্ভব হয়েছিল। হলওয়েলের ব্যাখ্যানুসারে ফিরিঙ্গি শব্দের অর্থ হল – পর্তুগীজ ভারতীয় মিশ্রণ। হলওয়েলের ব্যাখ্যাকেই সরকারী ভাষ্য বলে মেনে নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, “ফিরিঙ্গিরা পর্তুগীজ ও ভারতীয় হিন্দু-মুসলমানের মিশ্রণে উৎপন্ন। ধর্মে খৃস্টান হলেও ইংল্যাণ্ডের রাজা অপেক্ষা মোঘল সম্রাটের উপরে তাঁদের আনুগত্য বেশি। রয়্যাল চার্টারে এঁদের হিন্দু বা মুসলমানদের ন্যায় নেটিভ বলেই গণ্য করা হয়েছে।” (“By Feringy I mean all the black mustu Portuguese Christian residing in the settlement as a people distinct from natural and proper subjects of Portugal; and as a people who sprung originally from Hindoos or Mussalman, and who by the law of nations cannot by their conversion to Christianity be exempted from their allegiance to the Mogul their natural lord, any more than a British subject is freed from his allegiance to the king of England by embracing the Mohomedan faith and consequently this race of people are comprehended in in the Royal Charter under the word Natives as much as the Hindoos or Mussulman.” – Holwell’s letter Consultations, 16th June, 1755) অন্যদিকে ‘হাচিসন’ বলেছিলেন ‘ইউরেশিয়ান’রা – “এ মিকশ্চার অব ইউরোপীয়ান এণ্ড নেটিভ ব্লাড”। তাঁদের স্বভাববৈশিষ্ট্যের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, “জাতি হিসাবে তাঁরা ভালো-ভালো পোশাক পরতে ভালবাসেন। বড়ই অনুকরণপ্রিয়। নিজেদের মর্যাদা সম্পর্কে বড়ই সচেতন। হাস্যোদ্রেককারী অলীক মর্যাদাবোধ এত প্রবল যে, রাইটারের চাকরি ছাড়া আর কোন চাকরি তাঁরা নেন না। জুতো তৈরী, দর্জির কাজ, ছুতোর, রাজমিস্ত্রী ইত্যাদি প্রয়োজনীয় অর্থকরী কাজে তাঁরা হাত দেন না। অথচ এই সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিভার অভাব নেই। তাদের নিজের সমাজ তথা সমগ্র দেশের অলঙ্কাররূপে গণ্য করা যায়, এমন গুণবান ব্যক্তি অনেকে আছেন। সাহিত্যে ও বিজ্ঞানে তাঁদের অবদান মূল্যবান। প্রসঙ্গতঃ কিড ও ডি. রোজারিওর (ডিরোজিও) নাম করা যায়।” (“As a people they are very fond of dress, very vain and imitative, exceedingly jealous of their dignity and consequence, and from a false and ridiculous feeling of pride they confined themselves to the profession of writers, to the exclusion of all the more useful trade, such as shoe-makers, tailors, carpenters, brick-layers etc. Many of them are however highly gifted, talented and useful men, as ornamental to Society as beautiful to their fellow-creatures.”) আবার ‘বিশপ হেবার’ তাঁদের ‘হাফকাস্ট’ বলেছিলেন। তিনি গভীর সহানুভূতির সঙ্গে সমগ্র বিষয়টি পর্যালোচনা করে লিখেছিলেন, “ইউরোপীয়রা ব্যবসা-বাণিজ্য বা সরকারী কার্যোপলক্ষে ভারতে আসেন। সঙ্গে স্ত্রী থাকে না; বাধ্য হয়ে জৈবধর্মের তাগিদে তাঁরা অসৎ সংসর্গে, দেশীয় মহিলাদের সঙ্গে লিপ্ত হন। অথচ ভারতে খাঁটি ইউরোপীয় অনাথা মেয়ের কোন অভাব নেই। তাঁদের সম্ভাব্য পাত্রের সন্ধান করবার জন্য মাঝে মাঝেই ইউরোপে পাঠানো হয়। কিন্তু প্রায়ই ইউরোপে তাঁদের কোন পাত্র জোটে না। ব্যর্থমনোরথ হয়ে তাঁরা আবার ভারতে ফিরে আসে। … আমি ভারতে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে এমন একজনকেও দেখিনি যিনি হাফ-কাস্টদের সংখ্যাবৃদ্ধিতে, তাঁদের বর্তমান দুর্দশা, এবং এই কলোনির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ভঙ্গের আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন নি। ভারতে বসবাসকারী অনাথা শ্বেতাঙ্গদের বিবাহের ব্যাপারে এত আপত্তি কেন? যে ভবিষ্যৎ বিপদের আশঙ্কা সবাই করছেন, এতে সেই বিপদ অন্ততঃ দূর হবে।”
ইউরোপীয়ানদের প্রভাবে আঠারো-ঊনিশ শতকের ভারতের সামাজিক অবস্থার কতটা যে অবনতি ঘটেছিল, সেটা ‘স্কেচেস অব ইণ্ডিয়া’ গ্রন্থের গ্রন্থকার খেলাখুলি লিখেছিলেন। অমন অপ্রিয় সত্যভাষণ সমকালীন আর কোন ইংরেজ লেখকের রচনায় দেখতে পাওয়া যায় না। তিনি লিখেছিলেন, “ভারতের ইউরোপীয়রা ব্যাপকভাবে উপপত্নী গ্রহণ করেন। বিবাহিত পরিবারের লোকজন উপপত্নী গ্রহণকারী ব্যাচেলরদের বাড়ি যাওয়া মোটেই পছন্দ করেন না। উপপত্নী যদি ইউরোপীয়ান হন, তবুও তাঁকে হীনচরিত্রা বলে পরিহার করেন। … যদি হিসাব দিয়ে বলি যে, বিবাহিতরা ছাড়া বাকি ইউরোপীয়দের তিন-চতুর্থাংশ উপপত্নী গ্রহণকারী, তবে অত্যন্ত শোভন ও সত্যভাষণ করা হবে। আরও একটু সাহস করে যদি বলি যে, এই সব ব্যক্তির (উপপত্নীগ্রহণকারী ইউরোপীয়রা) অর্ধাংশ গড়ে দুটি করে সন্তানের পিতা, তবে আদৌ বাড়িয়ে বলা হবে না, এবং অবৈধ সংস্রবজাত ‘ডেমি-বেঙ্গলী’ (আধা-বাঙালী) বর্ণসঙ্কর শিশুদের বিপুল সংখ্যা থেকে ভবিষ্যৎ বিপদের পরিমাণ আন্দাজ করে নেওয়া যায়।” এরপরে ফিরিঙ্গিদের স্বভাব বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন, “দেশী অধিবাসীদের যাবতীয় কুসংস্কার ও দোষগুলিকে তাঁরা আত্মসাৎ করেছেন, কেবলমাত্র ভীরুতা ছাড়া। ইউরোপীয়ানদের অধ্যবসায়, ঔদার্য, সত্যানুসন্ধিৎসা বর্জন করে তাঁরা কেবলই তাঁদের দোষ-ত্রুটিগুলিকে গ্রহণ করেছেন। নানাশ্রেণীর মিশ্রণে তাঁদের উদ্ভব – কারো মা হিন্দু, কারো মা মুসলমান, তো কারো মা আবার মালয়ী। এই বৃহৎ অসন্তুষ্ট গোষ্ঠী যদি ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে কী না ঘটতে পারে! দক্ষিণ আমেরিকায় যা ঘটেছে, ভারতেও যদি তাই একদিন ঘটে যায়, তবে অবাক হবার কি আছে? … এঁদের আছে কি? অর্থ নেই, মযাদা নেই, আত্মোৎসর্গের কোন সুযোগ নেই। এই সর্বরিক্তের দল বিপ্লবের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে। এ যেন এক নাট্যমঞ্চ, যেখানে সবাই সবকিছু আশা করতে পারে। কিন্তু ব্যর্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার পুরানো নগণ্যতায় ফিরে যাওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই।” উদ্ধৃত অংশে লেখকের শেষ মন্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই মন্তব্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হলে, আগে এই বর্ণসঙ্করদেব পটভূমির দিকে দৃষ্টিপাত করবার প্রয়োজন রয়েছে।
বস্তুতঃ ইংরেজরা ভারতে আসবার বহু আগেই এদেশে ইউরেশিয়ানদের উদ্ভব হয়েছিল। ইউরোপীয়দের মধ্যে পর্তুগীজরা সবার আগে ভারতে এসেছিলেন। দস্যুতা, নারীহরণ, দাস-ব্যবসা, ধর্মপ্রচার ইত্যাদি সব কাজেই তাঁরা অগ্রণী ছিলেন। তাঁরা দেশীয় নারীদের সঙ্গে বেপরোয়া সংসর্গ স্থাপন করেছিলেন। ফলে ইউরেশিয়ানেদের উদ্ভব হয়েছিল। তাঁদের পরে ফরাসিরা ভারতে এসে সেই একই পথ অনুসরণ করেছিলেন। তবে ভারতে আগত ইউরোপীয়ানদের মধ্যে একমাত্র ইংরেজদের মধ্যেই বর্ণের আভিজাত্যবোধ প্রবল হওয়ার জন্য, তাঁদের সঙ্গেই ভারতীয়দের সবচেয়ে কম পরিমাণে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। আঠারো শতক থেকে রোমান ক্যাথলিক মিশনারী ও কিছু উদারচেতা ইংরেজরা অবহেলিত ইউরেশিয়ানদের সামাজিক মর্যাদাদানের চেষ্টা করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে ‘সিয়ের লুয়ের’ (Sieur Luillier) ১৭০২ সালে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছিলেন, “টোপাস নামক ভারতীয় বালকদের ফরাসি পোশাক পরিয়ে মিশনারীরা রোমান-ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত করেছেন।” (“… ‘Topasses’ were Indian boys brought up and clothed in the French fashion and instructed in the Catholic faith by Missionaries.” – A voyage to the East India, Sieur Luillier.) ড্যানিশ মিশনারীরাও সেই একই পথ অনুসরণ করেছিলেন। বস্তুতঃ সেদিনের সেই অজ্ঞ কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভারতীয় সমাজের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, যিনিই ইউরোপীয় পোশাক পরেন, তিনিই খৃস্টান! তখন ভারতীয়রা বিশ্বাস করতেন যে, মাথায় হ্যাট, পায়ে বুট, পরিধানে সাহেবি পোশাক, এবং মুখে যেকোন ইউরোপীয় ভাষা থাকলেই সেই ব্যক্তি ইউরেশিয়ান। তখন যেসব পর্তুগীজ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বাসিন্দা ছিলেন, তাঁরাও পরবর্তীকালে ইউরেশিয়ান বলেই গণ্য হয়েছিলেন। আবার সেকালে যেসব ভারতীয় খৃস্টানধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের জাতে তোলবার জন্য পর্তুগীজ মিশনারীরা ইউরেশিয়ান বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন। যেহেতু তাঁদের পোশাক ইউরোপীয় হত, মুখে ভাঙ্গা পর্তুগীজ বুলি থাকত, এবং গায়ের রঙ অবশ্যই কালো ছিল, সেহেতু তাঁদের ইউরেশিয়ান বলে চালিয়ে দেওয়াই সুবিধাজনক ছিল। পক্ষান্তরে তখন যাঁরা খৃস্টান হতেন, তাঁরাও খাঁটি ইউরোপীয়ানদের সঙ্গে আত্মীয়তাবোধের লোভে নিজেদের ইউরেশিয়ান বলতে কোন দ্বিধা করতেন না। ১৭৯০ সালেও, মাথায় টুপি ও পরিধানে ইউরোপীয় পোশাক পরিহিত পর্তুগীজ ও ভারতীয় সবাইকেই ‘টোপাস’ বলে অভিহিত করা হত। এই প্রসঙ্গে ‘মেজর ব্ল্যাকিসটন’ তাঁর ‘টুয়েলভ ইয়ার্স মিলিটারি এডভেঞ্চার্স ইন থ্রী কোয়াটার্স অফ দ্যা গ্লোব’ গ্রন্থে লিখেছিলেন , “গায়ের রঙ যতই কালো হোক না কেন, মাথায় হ্যাট থাকলেই তাঁকে ভাস্কো-ডা-গামার কোন অনুচরের বংশধর বলে গণ্য করা হয়।” (“Any man of colour however dark, who wears a hat, passes for a descendant of the companions of the renowned Vasco-da-Gama.”) আঠারো শতকের শুরু থেকেই পর্তুগীজদের পথ অনুসরণ করে ফরাসি ও ইংরেজরাও ভারতে ইউরেশিয়ানদের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটিয়েছিলেন। ফরাসিদের মনে কোনদিনই বর্ণবিদ্বেষ ছিল না। স্বয়ং ‘ডুপ্লে’ চন্দননগরের একজন ‘ক্রিওল’ রমণীকে বিবাহ করেছিলেন। তখন ভারতীয় ও ফরাসি মিশ্রণকে ‘ক্রিওল’ বলা হত। ১৭৯০ সালে ‘গ্র্যাণ্ডপ্রি’ জানিয়েছিলেন, “পণ্ডিচেরীতে মাত্র দুটি কুলীন ফরাসি পরিবার আছে। তার মধ্যেও একটি পরিবারের একটি পুত্র দেশীয় রমণীকে বিবাহ করে কুলভঙ্গ করেছেন।” আঠারো শতকের শেষের দিকে ভারতে ইউরেশিয়ানদের সংখ্যা অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছিল। ‘এ্যাব দ্যুবয়’ সেই সময়কার অবস্থা বর্ণনা করে লিখেছিলেন যে, “ভারতে পর্তুগীজ মাত্রই ইউরেশিয়ান। খাঁটি পর্তুগীজের সংখ্যা নগণ্য, এবং তাঁরাও দীর্ঘদিন ধরে ভারতে অবস্থানের ফলে নিজেদের চরিত্র নষ্ট করেছেন।”
আঠারো শতকের আগে ভারতে যেসব ইউরেশিয়ানের জন্ম হয়েছিল, তাঁদের প্রায় সবাই অবৈধ সংসর্গ জাত ছিলেন। দুই পক্ষের মধ্যে ঠিকঠাক বিবাহ তখন খুব কমই হত। অবশ্য ‘স্কিনার’ বা ‘হিয়ার্সের’ মত কিছু ভাগ্যবান ব্যক্তি তখন অভিজাত রাজপুত বা মোঘল কন্যাকে বিবাহ করবার সুযোগ পেয়েছিলেন।
প্রথম দিকে পর্তুগীজ দস্যু ও বণিক সম্প্রদায় সেই অবৈধ সংসর্গ স্থাপনে অগ্রণী হয়েছিলেন। তারপরে বিদেশী সৈনিকেরা সেই ব্যাপারে এগিয়ে এসেছিলেন। ফরাসিদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য ইংরেজ ও ফরাসি উভয় পক্ষকেই তাঁদের নিজের নিজের দেশ থেকে ভারতে সৈন্যবাহিনী আনতে হয়েছিল। তখন যখন যেখানে কোন সেনাদলের শিবির স্থাপিত হয়েছিল, সেখানেই তাঁরা নিম্নশ্রেণীর দেহপসারিণী নারীদের সঙ্গে সংসর্গ স্থাপন করেছিলেন। তারপরে যুদ্ধ শেষে তাঁরা যে যাঁর দেশে চলে গিয়েছিলেন। কোন বিদেশী জাহাজ কোন ভারতীয় অবস্থানকালে সেই জাহাজের নাবিকের দলও ওই একই পথ অনুসরণ করেছিলেন। তাঁরা সেখানকার সহজলভ্যা নারীদের সংস্রবে এসেছিলেন। আবার জাহাজ বন্দর ত্যাগ করে দূরপথে রওনা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরাও বন্দরের বন্ধন কাটিয়ে চলে গেলেও, ভারতের মাটিতে তাঁদের রক্তবাহী সন্তান-সন্ততিদের রেখে গিয়েছিলেন। মাদ্রাজে এই ধরণের ঘটনা সর্বাধিক ঘটেছিল।
পলাশী যুদ্ধের পরে কলকাতা তথা সারা ভারত হয়ে ইউরোপের কুলগ্রোত্রহীন ‘ভ্যাগাবণ্ড’দের শ্রীক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। তখন ইউরোপ থেকে সবাই নিজেদের ভাগ্যান্বেষণে ভারতে আসতেন। তাঁদের সবারই ধারণা ছিল যে, এদেশের মাটি কামড়ে পড়ে থাকলে তাঁরা নিশ্চিতভাবে কোন না কোনদিন ‘নাবুব’ হতে পারবেন। তাঁদের অধিকাংশই বিত্তহীন ছিলেন। তাঁরা ইউরেশিয়ান কন্যাদের বিবাহ করতেন। তাছাড়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীর লোকেরাও ইউরেশিয়ান নারীদের বিবাহ করতেন। কিন্তু কোম্পানির অফিসার বা অন্যান্য পদস্থ কর্মচারীরা বা শহরের অন্যান্য ভদ্রলোক ইংরেজরা কিন্তু তাঁদের বিবাহ করতেন না। কারণ, স্বকৃতভঙ্গ হলে তাঁরা তৎকালীন ইউরোপীয় সমাজে খাতির পেতেন না। তাই তাঁরা খাঁটি শ্বেতাঙ্গিনীদের বিবাহ করলেও, ইউরেশিয়ানদের উপপত্নীরূপে গ্রহণ করতেন; যেমন ‘উইলিয়াম হিকি’ করেছিলেন। ইউরেশিয়ানদের আভিজাত্য-সচেতনতাকে ইংরেজরা ঠিক কোন দৃষ্টিতে দেখতেন, সেটা আগেই বলা হয়েছে। তখন কোন ইংরেজ ইউরেশিয়ান কন্যাকে বিবাহ করলে তিনি যেমন ভদ্র সোসাইটিতে আমন্ত্রণ পেতেন না, তেমনি গভর্ণর জেনারেলের বাড়িতেও তাঁর কোনদিন ডাক পড়ত না। এই প্রসঙ্গে ‘টেনান্ট’ লিখেছিলেন, “Marriages with officers were unpopular, because the parties were often excluded from society. But as the girls were unfitted by education for marriage with boys of their own class, they often became officers’ mistresses.” ‘মিসেস ফেণ্টন’ লিখেছিলেন, “It is very strange the prejudice existing here against half-castes.” ১৭৮০ সালে ‘ইনস মনরো’ লিখেছিলেন, “Portuguese girls, a few Moorish and Pariah women and those who have lost caste fell to European soldiers as temporary wives.” ‘উইলিয়মসন’ পরবর্তী বিশ বছরের কথা বলতে গিয়ে লিখেছিলেন যে, পর্তুগীজ বা ইউরেশিয়ান আয়ারা – “many of whom became housekeepers to single gentleman.” বিশপ হেবার ও অন্যান্যরা ঊনিশ শতকের কথা লিখেছিলেন।
এখনও পর্যন্ত এই লেখায় যাঁদের কথা বলা হয়েছে তাঁরা সৈনিক, ভাগ্যাবণ্ড বা সেনাদল-বিতাড়িত ভাগ্যবিড়ম্বিত ব্যক্তি, নাবিক বা বণিক ছিলেন। ইংল্যাণ্ডে যেমন তাঁদের কোন সঙ্গতি ছিল না, এদেশেও তেমন কিছু ছিল না। তাঁদের মধ্যে কেবলমাত্র লালসা ছিল। তাই নিজেদের পরিত্যক্ত সন্তান-সন্ততিদের জন্য অন্ধকার ভবিষ্যৎ ছাড়া তাঁরা ভারতে অন্য কোন সম্বলই রেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তখনকার যেসব পদস্থ ধনবান ইংরেজ ভারতীয় বা ইউরেশিয়ান মহিলাদের বিবাহ করেছিলেন, বা উপপত্নীরূপে গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের পুত্রকন্যারা কিন্তু সব সময়ে অবহেলিত হতেন না। তাঁদের সন্তানদের মধ্যে যাঁদের গাত্রবর্ণ মোটামুটি ফর্সা হত, তাঁদের বিলেতে লেখাপড়া শেখার জন্য পাঠানো হত। এই প্রসঙ্গে ১৮০০ সালে ‘পামার’ হেস্টিংসকে লিখেছিলেন, “দু’জনের গায়ের রঙ প্রায় ইংরেজদের মত ফর্সা। কিন্তু তৃতীয় জনের গায়ের রঙ কালো। তাঁকে বিলেতে পাঠাতে গেলে ধরা পরে যাবে (too dark to escape detection)।” বিলেতে তাঁরা যতদিন পড়াশুনা করতেন, ততদিন তাঁরা ‘নাবুবের পুত্র’ হয়ে থাকতেন। ওই সময়ে তাঁদের অর্থের কোন অভাব হত না। কিন্তু লেখাপড়া শেষ করে যখনই তাঁরা দেশে ফিরে আসতেন, তখন থেকেই তাঁদের জীবনে সত্যিকারের ‘ট্র্যাজেডি’ শুরু হত। বাপের টাকায় বিলেতে থাকাকালীন তাঁরা দারিদ্র্য কাকে বলে জানতে পারতেন না। সেখানে তাঁরা ভদ্রপরিবেশে উন্নত জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়তেন, রুচিতে মার্জিত হতেন। আর দেশে ফিরে আসবার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের স্বপ্নভঙ্গ হত। সাধারণ কেরানীগিরি ছাড়া তাঁদের কপালে কোন বড় চাকরিও জুটত না। আর দেশে ফিরে এসে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা দেখতে পেতেন যে, ততদিনে তাঁদের ধনবান পিতা ভারত ছেড়ে ইংল্যাণ্ডে রওনা হয়ে গিয়েছেন, এবং নিজের সঙ্গে অর্জিত সমস্ত অর্থও নিয়ে গিয়েছেন। ফলে বাপের তদ্বিরের জোরে তাঁরা যে ভাল কোন চাকরি জোটাবেন, সে পথও বন্ধ হয়ে যেত। বাপের আমলে হাতে অর্থ থাকলেও, পরে তাঁরা অভাবী হয়ে পড়বার জন্য কেউ তাঁদের খাতিরও করতেন না। অথচ বিলেতে লেখাপড়া শেখবার ফলে তাঁদের নজর উচ্চ হয়ে যেত। তাঁদের অনেক সাধ থাকলেও, সাধ্য ছিল না। তার উপরে ১৭৯২ সালে একটি নতুন আইন জারি করে সেই ‘হাফ-কাস্টদের’ সরকারী চাকরিতে গ্রহণ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
তখন ‘হাফ-কাস্টদের’ মধ্যে যাঁরা বিলেতে যাওয়ার সুযোগ পেতেন না, তাঁদের জন্য কলকাতা ও মাদ্রাজে অনেকদিন থেকেই ‘অরফ্যানেজ’ চালু ছিল। ১৭৮২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অফিসার-পুত্রদের শিক্ষার জন্য নতুন যে আইন করা হয়েছিল, তদনুসারে তখন ইংরেজ অফিসারদের বেতনের একটি অংশ কেটে নেওয়া হত। কিন্তু তাতে লেখাপড়ার সুবিধা হলেও চাকরির সুবিধা কিন্তু হয়নি। ফলে লেখাপড়া কিছু শিখে বা একেবারেই না শিখে তাঁরা সওদাগরি অফিসের কেরানী বা দোকানের ‘শপ-এ্যাসিস্ট্যান্ট’ হতেন। আবার তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ সেনাবাহিনীতে, তো কেউ পুলিসে যোগ দিতেন। তবে সেনাবাহিনীতে যুদ্ধের জন্য নয়, ব্যাণ্ড ব্যাগ পাইপ বাজাবার জন্যই তাঁদের ভর্তি করা হত। পরবর্তীকালে সঙ্গীতে, খেলাধূলায় ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে তাঁদের মধ্যে অনেকেই কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন।
আঠারো-ঊনিশ শতকের বাংলার এ্যাংলো ইণ্ডিয়ানদের মধ্যে অন্ততঃ দু’জনের কথা আজও বাঙালী মাত্রেই অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তাঁদের মধ্যে একজন ‘আন্টনি ফিরিঙ্গি’ নামে ইতিহাসে বিখ্যাত। আর অন্যজন হলেন উনিশ শতকী বাংলার রেনেসাঁর পথিকৃৎ ‘ডিরোজিও’। তাঁদের সমকালীন একজন বিশিষ্ট বাঙালী ‘রাজনারায়ণ বসু’ তাঁর ‘সেকাল আর একাল’ গ্রন্থে ঐ দু’জনের সম্পর্কে যা লিখেছিলেন, তা নিম্নরূপ –
“তাঁহার নাম আন্টনি ফিরিঙ্গী। একজন ফিরিঙ্গী হিন্দু-কবিওয়ালাদিগের দলে প্রবিষ্ট হইয়া খ্যাতিলাভ করিয়াছিল এই আশ্চৰ্য। শুনা গিয়াছে, আণ্টনি ফরাস-ডাঙ্গার একজন সম্ভ্রান্ত ফরাসির পুত্র। তিনি যৌবনের প্রারম্ভে ফরাসডাঙ্গার বিখ্যাত গাঁজিয়ালদের সংসর্গে পড়িয়া বয়ে গিয়েছিলেন। তৎপরে কবিওয়ালাদিগের দলে প্রবিষ্ট হইয়া একজন বিখ্যাত কবিওয়ালা হইয়া উঠিয়াছিলেন। তিনি দুর্গার প্রতি উক্তি করিয়া বলিয়াছিলেন –
‘যদি দয়া করে তরো মোরে এ ভবে, মাতঙ্গি!
ভজন সাধন জানিনে, মা! জেতেতে ফিরিঙ্গী।’
…
আন্টনি ফিরিঙ্গী বলে, নিদানকালে মা
দিও চরণ দুখানি, দিও চরণ দুখানি।’
… ডিরোজিও সাহেব একজন ফিরিঙ্গী ছিলেন। তাঁহার পিতা একজন ইটালীয়ান ও মাতা এতদ্দেশীয় স্ত্রীলোক ছিলেন। তিনি (হিন্দু) কলেজের চতুর্থ শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু ছাত্রেরা তাঁহাকেই অধিক চিনিত, প্রধান শিক্ষককে অত চিনিত না। তিনি প্রগাঢ় বিদ্যা ও অকৃত্রিম স্নেহ দ্বারা ছাত্রদিগকে এমন বশীভূত করিয়াছিলেন যে, তাঁহাকে তাঁহারা ছাড়িতে চাহিত না। তিনি অতি প্রিয়স্পদ ও সুকবি ছিলেন। … তাঁহার এই দেশে জন্ম ৷ কিন্তু অন্যান্য ফিরিঙ্গীরা যেমন বলে – ‘মোদের বিলাত’, তিনি সেরূপ বলিতেন না। এই দেশকে তিনি স্বদেশজ্ঞান করিয়া ইহার প্রতি যথেষ্ট মমতা বোধ করিতেন। তাঁহার একটি কবিতাতে তাঁহার স্বদেশানুরাগের অত্যুৎকষ্ট পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। সে কবিতাটি তাঁহার রচিত ভারতের একটি পুরাতন কাব্যের মুখবন্ধ।
‘স্বদেশ আমার। কিবা জ্যোতির মণ্ডলী
ভূষিতা ললাট তব; অস্তে গেছে চলি
সেদিন তোমার, হায়! সেই দিন যবে
দেবতা সমান পুজ্য ছিলে এই ভবে।
কোথায় সে বন্দাপদ! মহিমা কোথায়!
গগনবিহারী পক্ষী ভূমিতে লুটায়।
বন্দিগণ বিরচিত গীত উপহার
দুঃখের কাহিনী বিনা কিবা আছে আর?
দেখি দেখি কালার্ণবে হইয়া মগন
অন্বেষিয়া পাই যদি বিলুপ্ত রতন।
কিছু যদি পাই তার ভগ্ন অবশেষ
আর কিছু পরে যার না রহিবে লেশ।
এ শ্রমের এইমাত্র পুরস্কার গণি,
তব শুভ ধ্যায় লোকে, অভাগা জননি।’
দুঃখের বিষয় এই যে, একজন ফিরিঙ্গী ভারতবর্ষকে এমন প্রেমের চক্ষে দেখিতেন, কিন্তু এক্ষণকার কোন কোন হিন্দু সন্তানকে সেরূপ করিতে দেখা যায় না। ডিরোজিওর স্বদেশানুরাগ, তাঁহার সদাশয়তা, তাঁহার প্রগাঢ় বিদ্যা ও জ্ঞান দেখিয়া তাঁহার কতকগুলি ছাত্র এমন মুগ্ধ হইয়াছিল যে, তাঁহারা সর্বদাই তাঁহার সহবাসে থাকিতে ভালবাসিত। তিনিও তাহাদিগের সহবাসে সর্বদা থাকিতে ভালবাসিতেন। তিনি বঙ্গদেশে জন্মগ্রহণপূর্বক বাঙালীদিগের সংসর্গে এরূপ বাঙালী হইয়া যান যে, তিনি যে সাহেবের পুত্র তাহা বিস্মৃত হইয়া গিয়াছিলেন।”
©️রানা©️
(তথ্যসূত্র:
১- সেকাল আর একাল, রাজনারায়ণ বসু।
২- An Anglo-Indian Domestic Sketch: A Letter from an Artist in India to His Mother in England, Colesworthey Grant.
৩- THE EAST INDIA COMPANY & THE BRITISH EMPIRE IN THE FAR EAST, Marguerite E. WILBUR.
৪- Hutchinson’s story of the nations.
৫- Calcutta old and new, H. E. A. Cotton.
৬- India tracts, J. Z. Holwell.
৭- A voyage to the East India, Sieur Luillier.
৮- Twelve Years’ Military Adventure in Three Quarters of the Globe, John Blakiston.
৯- Bishop Heber in northern India, selections from Heber’s journal; Reginald Heber.)
©️রানা চক্রবর্তী©️

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি