নজরুলের স্ত্রী প্রমীলা দেবী: দু:খ-দুর্দশা আর সংগ্রামের মাঝে কবির পাশে প্রেরণাদায়িনী এক মহিয়সী নারী

প্রকাশিত: ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ, মে ১২, ২০২৪

নজরুলের স্ত্রী প্রমীলা দেবী: দু:খ-দুর্দশা আর সংগ্রামের মাঝে কবির পাশে প্রেরণাদায়িনী এক মহিয়সী নারী

Manual4 Ad Code

সংগৃহীত কথা |

কাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রী প্রমীলা দেবী নামে পরিচিত হলেও তার পরিবার থেকে দেয়া নাম আশালতা সেনগুপ্তা ওরফে দোলনা সংক্ষেপে দুলী। ‘প্রমীলা’ নামটি কাজী নজরুল ইসলামের দেয়া।

মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার ঐতিহ্যবাহী তেওতা গ্রামে প্রমীলা সেনগুপ্তার জন্ম। পিতার নাম বসন্ত কুমার সেনগুপ্ত। মায়ের নাম গিরিবালা সেনগুপ্তা। মা ও বাবা একই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বসন্ত কুমার সেনগুপ্তের আরও দু’ভাই ছিলেন। তিনি ছিলেন মধ্যম। জগতকুমার সেনগুপ্ত ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা এবং ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত ছিলেন তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা। প্রমীলা সেনগুপ্তা বাংলা ১৩১৫ সালের ২৭ বৈশাখ (১০ মে ১৯০৮) জন্মগ্রহণ করেন। কবি আবদুল কাদির সাহেব ‘নজরুল প্রতিভার স্বরূপ’ গ্রন্থে (পৃ. ৬৭) তাঁর জন্ম তারিখ উল্লেখ করেছেন ১৭ বৈশাখ, বাংলা ১৩১৬। চুরুলিয়ায় প্রমীলার সমাধি গাত্রে তাঁর জন্ম ২৭ বৈশাখ ১৩১৫ উল্লেখ আছে।

কবি আবদুল কাদির সাহেবের গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত তেওতা গ্রামে আশালতার জন্ম হয়। তাঁর ডাক নাম ছিল দোলনা দেবী। গুরুজনেরা আদর করে ডাকতেন ‘দুলী’ বলে। কৈশোরে তার গাত্রবর্ণ ছিল চাঁপাকলির মতো। নজরুল জেলে থাকতে চম্পাকান্তি দোলনা দেবীকে স্মরণ করেই তাঁর দ্বিতীয় কাব্যের নামকরণ করেছিলেন ‘দোলন চাপা’ (আশ্বিন ১৩৩০)। আশালতার পিতা বসন্ত কুমার সেনগুপ্ত ত্রিপুরা রাজ্যে নায়েবের পদে চাকরি করতেন। তিনি অকালে পরলোকপ্রাপ্ত হলে বিধবা গিরিবালা দেবী অনূঢ়া আশালতাকে নিয়ে কুমিল্লা চলে আসেন। আশালতার ছোটকাকা ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত কুমিল্লার কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ইন্সপেক্টর ছিলেন।’

Manual2 Ad Code

মোঃ আজহারুল ইসলাম সম্পাদিত ‘মানিকগঞ্জের শত মানিক’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বসন্ত কুমার সেনগুপ্ত ছিলেন কুমিল্লার তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রায় বাহাদুর ড. উমাকান্তের পেশকার। কর্মসূত্রে তিনি কুমিল্লাতেই থাকতেন। কনিষ্ঠভ্রাতা ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তকেও তিনি কুমিল্লা কোর্টে চাকরি যোগাড় করে দেন। দু’ভাই মিলে কুমিল্লার কান্দির পাড়ে একই বাড়িতে সপরিবারে বসবাস করতেন। তবে প্রতিবছর পুজোর সময় অন্য প্রবাসী বাবুদের মতো তারাও পরিবার পরিজন নিয়ে নিজ গামে আসতেন।

Manual3 Ad Code

গত বছর প্রমীলার পৈর্তৃক ভিটায় আমরা ক’বন্ধু পৌঁছে তাঁর পিসতুতো ভাই প্রবোধ চন্দ্র দাশগুপ্তের সঙ্গে সাক্ষাত করি। তিনি তখন তেওতা ডাকঘরের পোস্ট মাস্টার। তিনি এবং দুলী (প্রমীলা) প্রায় সমসাময়িক ছিলেন। প্রবোধ বাবু দুলী সম্পর্কে অনেক তথ্য প্রদান করেন। দুলী খুব চঞ্চল ছিল। ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত তেওতা গ্রামেই সে লেখাপড়া করেছে। তার পিতার মৃত্যু হলে তার মা গিরিবালা দেবী চরম দারিদ্র্যের সম্মুখীন হন। এই পরিস্থিতিতে তার ছোটকাকা ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত দুলী ও তাঁর মাকে কুমিল্লায় নিয়ে যান। দুলীদের বাড়িতে তখনও তার পিতার নির্মিত মাটির বেড়া দেয়া ৪টি দু’চালা টিনের ঘর ছিল। দক্ষিণ দিকের ঘরটিতে দুলী তার মায়ের সঙ্গে থাকত বলে প্রবোধ বাবু আমাদের জানান। যা হোক প্রমীলা সেন ১৯২০-২১ সালে তার মা গিরিবালা দেবীর সঙ্গে কুমিল্লায় তার কাকার বাসায় আসেন। প্রমীলা তখন ১২/১৩ বছরের এক কিশোরী। পুস্তক ব্যবসায়ী আলী আকবর খানের অনুরোধে এবং অর্থানুকূল্যে কাজী নজরুল ইসলামও বাংলা ১৩২৭ সালের চৈত্র মাসে (ইংরেজী ১৯২১) প্রথম কুমিল্লার দৌলতপুরে বেড়াতে আসেন। পূর্বদিন সন্ধ্যায় কলকাতা থেকে রওয়ানা হয়ে তারা পরদিন সন্ধ্যায় কুমিল্লা পৌঁছেন। রাত হয়ে যাওয়ায় তারা কান্দির পাড়ে অবস্থিত প্রমীলার কাকা ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাসায় ওঠেন। ইন্দ্রবাবুর জ্যেষ্ঠ পুত্র বীরেন্দ্র কুমার সেনগুপ্ত ছিলেন আলী আকবর খানের বন্ধু। তিনি কলকাতায় থাকতেন এবং হাইস্কুলে শিক্ষকতা করতেন। আলী আকবর খান ইন্দ্র বাবুর স্ত্রী বিরজা সুন্দরী দেবীকে মা বলে ডাকতেন। সেই সুবাদে নজরুলও তাঁকে মা বলে ডাকা শুরু করেন। এ বাসাতেই নজরুল প্রথম কিশোরী প্রমীলাকে দেখেন। দৌলতপুর এসে নজরুল ১৩২৮ সালের ৪ আষাঢ় পর্যন্ত আলী আকবর খানের বাড়িতে অবস্থান করেন।

Manual6 Ad Code

সারাটি জীবন দু:খ-দুর্দশা আর সংগ্রামের মধ্যে কাটিয়ে নজরুলের প্রেরনাদায়িনী আদরের দুলী তথা প্রমীলা দেবী অসুস্থ অবস্থায় ৩০ জুন,১৯৬২ সালে কলকাতার বাড়ীতে নির্বাক কবিকে নি:স্ব রিক্ত অসহায় করে চলে যান না ফেরার দেশে।
#
তথ্যসূত্র:
উইকিপিডিয়া

Manual1 Ad Code

World Vision (বিশ্ব দর্শন)

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ