মোগল সম্রাটের পরগনা ঘোড়াঘাটে ঘোড়াশালসহ ঐতিহাসিক দুর্গ বিলুপ্তির পথে

প্রকাশিত: ১০:০০ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২৪

মোগল সম্রাটের পরগনা ঘোড়াঘাটে ঘোড়াশালসহ ঐতিহাসিক দুর্গ বিলুপ্তির পথে

Manual1 Ad Code

বিশেষ প্রতিবেদক | দিনাজপুর, ২৫ জুন ২০২৪ : দিনাজপুর জেলার ঐতিহাসিক স্থান মোগল সম্রাটের ঘোড়াঘাট পরগনার ঘোড়াশালসহ ঐতিহাসিক নিদর্শন সম্রাট সুজার দুর্গ বিলুপ্তির পথে। সরকারি হস্তক্ষেপে এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের দাবি উঠেছে সর্বমহল থেকে।

Manual1 Ad Code

সম্প্রতি এ ঐতিহাসিক মোগল সম্রাটের ঘোড়াঘাট পরগনার দুর্গ ও ঐতিহাসিক ঘোড়াশালা পরিদর্শন করেছেন দিনাজপুর জেলা প্রশাসক শাকিল আহমেদ ও পুলিশ সুপার শাহ ইফতেখার আহমেদ। জেলা প্রশাসক এ ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য একটি পদক্ষেপ গ্রহণে আশ্বস্ত করেছেন। প্রাথমিকভাবে ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামকে ঘোড়াঘাট দুর্গের ও ঘোড়াশালার স্থান এবং ঘোড়া পালনের পরীখা খনন স্থানসহ সামগ্রিক বিষয় পরিমাপ অনুসন্ধান করে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

Manual8 Ad Code

জেলা প্রশাসক বলেছেন, সম্রাট সুজার তৈরি করা মসজিদটিতে এখন আর নামাজ পড়া হয়না, ভাঙ্গা মসজিদ নামে ওই এলাকায় পরিচিতি পেয়েছে। ওই মসজিদটি যাতে নামাজ পড়া শুরু হয়, সে বিষয়টি তিনি নিশ্চিত করবেন।

জেলা প্রশাসকের পরিদর্শনের পর সম্রাট সুজার মসজিদের সম্মুখে একটি সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। ওই সাইন বোর্ডটি বন বিভাগের এজমি গুলো মালিক হিসেবে দাবি করা হয়েছে।

Manual1 Ad Code

জনশ্রুতি রয়েছে, মোগল সম্রাটের ঘোড়া পালন ও যুদ্ধবিদ্যা প্রশিক্ষণের জন্য ঘোড়াঘাট পরগনা করতোয়া নদীর ধারে প্রায় সাড়ে ৩ শ একর জমিতে তৎকালীন এ পরীখা ও ঘোড়াশাল প্রতিষ্ঠিত করা হয়। ঘোড়াশালের তিন দিক পরীখা খনন করে উঁচু মাটির নিরাপদ বেষ্টনী নির্মাণ করা হয়। বেষ্টনী দিয়ে পরীখা খনন করে জলাশয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কালের পরিক্রমায় বিভিন্নভাবে বহিরাগত ব্যক্তিদের ঘোড়াঘাট উপজেলায় আগমন ঘটে। পরিত্যক্ত ঘোড়াশালায় গড়ে উঠেছে একাধিক বহিরাগত লোকদের বসত বাড়ি। এছাড়া এলাকার কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তিরা ঘোড়াশালার মাটির প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট উঁচু বেষ্টনীর মাটি বিভিন্ন ইট ভাটায় বিক্রি করে তার আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। ঘোড়াশালার বেষ্টনীর নিচে পরীখা ভরাট করে বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদসহ বসতবাড়ি নির্ণয়ের কাজ চলমান রয়েছে।

নতুন প্রজন্মের তরুণেরা জানতেই পারছেন না, এ ঘোড়াঘাট পরগনার মোগল সম্রাটের ঘোড়াশাল ও সম্রাট সুজার ঐতিহাসিক দুর্গ এবং তার নির্মিত এ কথিত ভাঙ্গা মসজিদের ইতিহাস।

ঘোড়াঘাট পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউনুছ আলী মন্ডল বলেন, এ ঐতিহাসিক দুর্গ রক্ষায়, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পর, করতোয়া নদীর তীর রক্ষা বাধ নির্মাণ করা হয়েছিল। ফলে মোগল সম্রাটের ঘোড়াশালা অরক্ষিত ছিল। গত বিএনপি- জামাত জোট সরকার আমলে ওই বাঁধের উপরে ছিল বিভিন্ন ধরনের আকাশমনি, মেহগনিসহ অনেক মূল্যবান গাছের সারি বদ্ধ। গত ২০০২ সাল থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে লুটেরারা গাছগুলো কর্তন করে লুট করে নিয়ে যায়। এরপর শুরু হয় ওই করতোয়া নদীর তীর রক্ষা বাধ কেটে নদী থেকে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলনের কাজ। এভাবেই ভূমিদস্যুদের হাতে বিলীন হয়ে যায় তীর রক্ষা বাঁধ এবং ওই বাঁধের উপরে সারিবদ্ধ বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান গাছ।

এখন ধ্বংসের প্রান্তে মোগল সম্রাট ঘোড়াশালা কিছু অংশ ভেঙ্গে নদীতে গেছে। তীর রক্ষা বাঁধ না থাকায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ঘোড়াশালের অনেক অংশই ভাঙ্গন ধরে নদীর দিকে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারের দপ্তরকে সরজমিন পরিদর্শন করে এ ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণ এর দাবি জানান।

দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের সংরক্ষিত গেজেটিয়ারে পাওয়া যায়, মোঘল সম্রাটের শাসনকার্য বিস্তারে ২৪টি পরগনার মধ্যে ঘোড়াঘাট একটি পরগনা। সে সময় এ পরগণায় ঘোড়াঘাট সরকার চালু করে সমগ্র উত্তর অঞ্চল শাসন ব্যবস্থা বিস্তারিত ছিল। মোগল সম্রাটের শাসনামলে রাজধানীকে শক্রর হাত হতে রক্ষা করার জন্য পার্বতীপুর থানার হাবড়া গ্রামে একটা দূর্গ এবং দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত রক্ষার্থে ঘোড়াঘাটে আর একটি কেন্দ্রীয়দুূর্গ নির্মাণ করা হয়েছিল। ওই পরগনার দুর্গ থেকেই দিনাজপুর তথা উত্তরাঞ্চল শাসন কার্য পরিচালিত হতো। সংরক্ষিত তথ্য ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, সম্রাট সুজার শাসনা আমল সমাপ্তির পর ব্রিটিশ শাসনা আমলে ১৭৮৭ সাল থেকে ১৭৯৩ সাল পর্যন্ত ৭ বছর ঘোড়াঘাট জেলা হিসেবে এ অঞ্চল শাসন কার্য পরিচালিত হয়েছিল। তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা গ্রিজানাথের অনুরোধে ১৭৯৪ সালে দিনাজপুর মৌজার নামে দিনাজপুর জেলা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ওই থেকে দিনাজপুর জেলার শাসন কার্য পরিচালিত হয়ে আসছে।

কিন্তু মোগল সম্রাটের সেই ঘোড়াঘাট পরগনার দুর্গ এবং ঘোড়াশালার ও সম্রাট সুজার নির্মিত মসজিদ যা আজ ভাঙ্গা মসজিদ নামে পরিচিত বিলুপ্ত হয়ে যেতে বসেছে।

দিনাজপুর ৬ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক এমপি বলেন, বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিহাস সংরক্ষণ করেন। তিনি কোন ইতিহাস বিলুপ্ত করতে বিশ্বাসী নয়। তাই তিনি এ ঐতিহাসিক নিদর্শন ঘোড়াঘাট পরগনার সকল ইতিহাস সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গ্রহণে আশ্বস্ত করেন। সেই সাথে এ এলাকাবাসীর সাথে ঐতিহাসিক স্থানটি সংরক্ষণের দাবি জানান।

দিনাজপুর ঐতিহাসিক মেহরাব আলীর সংরক্ষিত ইতিহাস থেকে জানা যায়, গত ১২০১ খৃস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী লক্ষণ সেনকে বিতাড়িত করে নদীয়া জয় করে উত্তর বঙ্গের দিনাজপুর জেলার দক্ষিণ অঞ্চলের বৃহত্তম এলাকায় তার শাসন কেন্দ্র ঘোড়াঘাট পরগনা রাজধানী করেন। মালিক ইখতিয়ার উদ্দীনের উদ্দেশ্য ছিল এদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচার ও রাজ্য বিস্তার করা।

Manual7 Ad Code

ঐতিহাসিক মেহেরবালির তথ্যচিত্রে, মোঘল সম্রাট আকবর বৈরাম খানের অভিভাবকত্বে ১৫৫৬ খৃঃ পানি পথের দ্বিতীয় যুদ্ধে জয়লাভ করে দিল্লীর অধিপতি হন। বালেগ হয়ে বৈরাম খানের অভিভাবকত্ব ছিন্ন করে মহামতি আকবর ১৫৭৬ খৃঃ কররানীকে পরাভুত করে বাংলা জয় করেন। বিষ্ণদত্তকে কান্নগো রুপে দিনাজপরের রাজস্ব নির্ধারণ ও আদায়ের বন্দোবস্তের জন্যই তাকে প্রেরণ করেন।

সর্বশেষ সম্রাট শাহজাহানের পুত্র সম্রাট সুজা শাসন আমলে ঘোড়াঘাট সরকার ও পরগনার বিলুপ্ত হয়ে যায়।

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ