সময়ের চেয়ে অগ্রগামী ভাস্কর নভেরা আহমেদের জন্মদিন আজ

প্রকাশিত: ১:২৮ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৯, ২০২৬

সময়ের চেয়ে অগ্রগামী ভাস্কর নভেরা আহমেদের জন্মদিন আজ

Manual7 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৯ মার্চ ২০২৬ : আজ ২৯ মার্চ। বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যশিল্পের পথিকৃৎ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অন্যতম রূপকার, প্রখ্যাত ভাস্কর নভেরা আহমেদ–এর জন্মদিন। বেঁচে থাকলে আজ তিনি ৮৮ বছরে পদার্পণ করতেন। কিন্তু তিনি শুধু একজন শিল্পী নন; তিনি ছিলেন এক মানসিক বিপ্লব, এক নীরব বিদ্রোহ, এক সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের নাম।

জন্ম ও শৈশব

নভেরা আহমেদের জন্ম ১৯৩৯ সালের ২৯ মার্চ, ব্রিটিশ ভারতে। শৈশব থেকেই শিল্পের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। পরবর্তীতে তিনি লন্ডনের ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস এবং ইতালিতে ভাস্কর্যশিল্পে শিক্ষা লাভ করেন। ইউরোপীয় আধুনিক শিল্পধারার সঙ্গে পরিচিত হয়ে তিনি যে শিল্পভাবনা নিয়ে দেশে ফিরে আসেন, তা ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক বাস্তবতার তুলনায় অনেক এগিয়ে।

বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যের অগ্রদূত

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পূর্ব বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতির পুনর্গঠনে যে ক’জন শিল্পী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, তাঁদের মধ্যে নভেরা আহমেদ অন্যতম। তাঁকে বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক ভাস্কর বলা হয়।

ভাস্কর্যকে তিনি শুধু নান্দনিক শিল্প হিসেবে দেখেননি; বরং সমাজ, ইতিহাস, মানুষের সংগ্রাম ও পরিচয়ের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর কাজের মধ্যে নারী, প্রকৃতি, মানবদেহ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা—এসব বিষয় বারবার উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও ঐতিহাসিক অবদান

নভেরা আহমেদের নাম উচ্চারিত হলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কথাও আসে। শহীদ মিনারের নকশা স্থপতি হামিদুর রহমানের হলেও এর ভাস্কর্য ও শিল্পভাবনার কাজে নভেরা আহমেদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ধারণ করা এই স্থাপত্যের সঙ্গে তাঁর নাম ইতিহাসে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে আছে।

প্রথম প্রদর্শনী ও প্রবাস জীবন

১৯৬০ সালে ঢাকায় তাঁর প্রথম একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়, যা তৎকালীন শিল্পাঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। কিন্তু এই প্রদর্শনীর কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি স্থায়ীভাবে প্রবাস জীবন বেছে নেন। এরপর তাঁর দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় যথাক্রমে ব্যাংককে (১৯৭০) এবং প্যারিসে (১৯৭৩)।

দীর্ঘ সময় তিনি নিজেকে জনসম্মুখ থেকে আড়ালে রেখেছিলেন। প্রচারবিমুখ এই শিল্পী ব্যক্তিগত জীবন ও শিল্পচর্চা নিয়ে নিভৃতেই থাকতে পছন্দ করতেন। জীবনের শেষ প্রান্তে, ২০১৪ সালে প্যারিসে তাঁর একটি রেট্রোস্পেকটিভ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়, যা আন্তর্জাতিক শিল্পমহলে নতুন করে তাঁর কাজকে আলোচনায় নিয়ে আসে।

আত্মসম্মান ও ব্যক্তিত্ব

নভেরা আহমেদ ছিলেন অত্যন্ত আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন এবং স্বাধীনচেতা মানুষ। তিনি সারাজীবন বাংলাদেশি পাসপোর্ট বহন করেছেন এবং অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেননি—এটি তাঁর দেশপ্রেম ও পরিচয়ের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার প্রমাণ।

তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী এবং আপসহীন। সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি বা নারীর জন্য নির্ধারিত সীমাবদ্ধতা তিনি কখনো মেনে নেননি। তিনি নিজের জীবন নিজের মতো করে বেছে নিয়েছিলেন—যা সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল এক ধরনের নীরব বিপ্লব।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৭ সালে ভাস্কর্যে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে একুশে পদক প্রদান করে। তবে তিনি সেই সম্মাননা গ্রহণ করতে দেশে আসেননি। এটিও তাঁর ব্যক্তিত্বের এক বিশেষ দিক—সম্মান বা প্রচারের জন্য তিনি কখনো নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেননি।

শিল্পী নভেরা: মিথ, বিতর্ক ও পুনর্মূল্যায়ন

নভেরা আহমেদের জীবন নিয়ে নানা সময় নানা ভুল ধারণা, বিতর্ক ও মিথ তৈরি হয়েছে। পরবর্তীতে গবেষণা ও লেখালেখির মাধ্যমে তাঁর জীবন ও কাজকে নতুনভাবে মূল্যায়নের চেষ্টা হয়েছে। বিশেষ করে শিল্পী আনা ইসলামের গবেষণা ও গ্রন্থ নভেরা আহমেদকে নতুন প্রজন্মের সামনে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

নভেরা আহমেদের গুরুত্ব

নভেরা আহমেদ শুধু একজন ভাস্কর নন; তিনি ছিলেন—

বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যের পথিকৃৎ

নারী স্বাধীনতার প্রতীক

শিল্পে আধুনিকতার অগ্রদূত

সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের এক নীরব যোদ্ধা

তিনি এমন এক সময় শিল্পচর্চা করেছেন, যখন পূর্ব বাংলায় ভাস্কর্যশিল্প প্রায় অনুপস্থিত ছিল। সেই শূন্যতার মধ্যেই তিনি একটি নতুন শিল্পধারার সূচনা করেন।

উপসংহার

Manual2 Ad Code

নভেরা আহমেদকে আমরা তাঁর জীবদ্দশায় পুরোপুরি মূল্যায়ন করতে পারিনি—এ কথা অনেকেই বলেন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া ভাস্কর্য, তাঁর শিল্পদর্শন, তাঁর জীবনযাপন এবং তাঁর আত্মমর্যাদাবোধ আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।

সময়ের চেয়ে অগ্রগামী এই শিল্পী আমাদের শিল্প ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন শিল্পীকে স্মরণ করা নয়—বরং একটি সাহসী, স্বাধীন ও সৃজনশীল মানসিকতাকে শ্রদ্ধা জানানো।

নভেরা আহমেদ বেঁচে থাকবেন তাঁর শিল্পে, তাঁর সাহসে, তাঁর নীরব বিপ্লবে।

“নভেরা আহমেদ : অগ্রযাত্রার ভাস্কর”
— সৈয়দ আমিরুজ্জামান

নভেরা, তোমার নাম উচ্চারিত হলে আজও
পাথরের ভিতরে যেন স্পন্দন জেগে ওঠে,
নীরব ভাস্কর্য যেন কথা বলতে চায় ধীরে,
সময়ের দেয়ালে লেখা ইতিহাসের মতো।

তুমি ছিলে অগ্রদূত, তুমি ছিলে প্রথম,
অচেনা পথে হাঁটার সাহসী এক নারী,
যখন সমাজ ছিল ঘুমে আচ্ছন্ন, স্থবির,
তুমি তখন ভাঙছিলে অদৃশ্য সব শৃঙ্খল।

Manual2 Ad Code

উনিশশো উনচল্লিশ, মার্চের এক সকাল,
ব্রিটিশ ভারতের আকাশে জন্ম নিলে তুমি,
কে জানত একদিন ইতিহাসের পাতায়
একটি নাম জ্বলবে নক্ষত্রের মতো দীপ্যমান।

পঞ্চাশের দশকের ধূসর দিনগুলোতে
পূর্ব বাংলার শিল্প ছিল দিকহারা প্রায়,
তখনই কিছু মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল নতুন—
তুমি ছিলে তাদেরই সাহসী অগ্রসারী।

মাটি, পাথর, ধাতু, কাঠ—নীরব উপাদান
তোমার স্পর্শে পেত জীবনের উচ্চারণ,
নিঃশব্দ ভাস্কর্যে তুমি লিখেছিলে ভাষা,
যেখানে মানুষ, মাটি, ইতিহাস একাকার।

শহীদ মিনারের যে নীরব স্থাপত্য দাঁড়িয়ে,
ভাষার জন্য যারা জীবন দিল রক্তে,
সেই স্মৃতির ভিতর তোমার হাতের রেখা—
জাতির হৃদয়ে লেখা এক অমর স্বাক্ষর।

তবু কতদিন আমরা জানিনি তোমাকে,
নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলে নীরবে,
খ্যাতির আলো নয়, কাজের গভীরতায়
তুমি খুঁজে নিয়েছিলে নিজের পরিচয়।

ঢাকায় প্রথম প্রদর্শনী—ষাটের সেই বছর,
শিল্পাঙ্গনে যেন নতুন বাতাস বয়ে যায়,
মানুষ প্রথম দেখে অন্য এক ভাষা,
ভাস্কর্যের শরীরে আধুনিকতার জন্ম।

তারপর একদিন তুমি চলে গেলে দূরে,
স্বেচ্ছা নির্বাসনে বেছে নিলে প্রবাস,
তবু তোমার শিল্প রয়ে গেল এই দেশে,
পাথরের ভিতরে রেখে গেলে তোমার প্রাণ।

ব্যাংককের প্রদর্শনী, তারপর প্যারিস শহর,
বিশ্বের দরবারে তোমার শিল্পের ভাষা,
নিঃশব্দে বলেছে এক বাঙালি নারীর কথা—
যিনি মাথা নত করেননি কোনোদিন।

জীবনের শেষপ্রান্তে আবার ফিরে দেখা,
প্যারিসে রেট্রোস্পেকটিভ—সময়ের সম্মান,
দীর্ঘ নীরবতার পর ইতিহাস বলেছে—
নভেরা, তুমি সত্যিই সময়ের চেয়ে এগিয়ে।

একুশে পদক এলো রাষ্ট্রের স্বীকৃতি হয়ে,
তুমি তবু দেশে এসে নাওনি সেই সম্মান,
আত্মসম্মান ছিল তোমার জীবনের মন্ত্র,
সমঝোতার কাছে মাথা নত করোনি।

তুমি ছিলে একা, কিন্তু পরাজিত নও,
তুমি ছিলে নীরব, কিন্তু থেমে যাওনি,
তুমি ছিলে দূরে, তবু এই বাংলার মাটিতে
তোমার পদচিহ্ন আজও স্পষ্ট জেগে আছে।

বাংলাদেশের পাসপোর্ট ছিল তোমার কাছে,
অন্য কোনো দেশের নাগরিক হওনি তুমি,
দূরে থেকেও হৃদয়ের মানচিত্র জুড়ে
বাংলাদেশ ছিল তোমার একমাত্র দেশ।

শাড়ি ছিল প্রিয়—একটি বাঙালি পরিচয়,
প্যারিসের রাস্তায় হয়তো হেঁটেছ নীরবে,
তবু তোমার পোশাকে ছিল বাংলার রং,
তোমার নিঃসঙ্গতায় ছিল দেশের স্মৃতি।

সমাজ তোমাকে বুঝতে পারেনি অনেককাল,
মিথ্যা, অপবাদ, ভুল গল্পের অন্ধকার
ঢেকে রেখেছিল তোমার সত্য জীবন,
ইতিহাস কখনও কখনও অন্ধ হয়ে যায়।

তবু কিছু মানুষ খুঁজেছে সত্য আলো,
গবেষণা, লেখা, স্মৃতির ভাঙা টুকরো,
মিথ্যার দেয়াল ভেঙে একদিন প্রকাশিত—
নভেরা, তুমি আসলে কত বড় নাম।

তুমি কেবল ভাস্কর নও, তুমি এক প্রতীক,
তুমি স্বাধীন চিন্তা, তুমি প্রতিবাদ,
তুমি একা হেঁটে যাওয়া সাহসের নাম,
তুমি আত্মসম্মানের দীপ্ত উচ্চারণ।

আজ যদি বেঁচে থাকতে—অষ্টাশি বছর,
সময়ের কাছে তুমি আরও বিস্ময় হতে,
তরুণ শিল্পীরা শিখত তোমার পথ দেখে
কীভাবে একা হয়েও জিততে হয় জীবন।

তোমার ভাস্কর্য শুধু পাথর নয় কোনো,
ওগুলো সময়, ওগুলো ইতিহাস,
ওগুলো এক নারীর একাকী সংগ্রাম,
ওগুলো স্বাধীনতার নীরব ভাষণ।

Manual4 Ad Code

নভেরা, তোমাকে আমরা দেরিতে চিনেছি,
ইতিহাস অনেক সময় দেরিতে জাগে,
যারা সময়ের আগে হেঁটে যায় দূরে
তাদের মূল্য মানুষ বোঝে অনেক পরে।

তবু তুমি আছ—শহীদ মিনারের ছায়ায়,
তুমি আছ—ভাস্কর্যের নীরব দেহে,
তুমি আছ—বাংলাদেশের শিল্প ইতিহাসে,
তুমি আছ—একটি সাহসী নাম হয়ে।

যতদিন ভাষা থাকবে, দেশ থাকবে,
যতদিন শিল্প থাকবে মানুষের হৃদয়ে,
ততদিন তোমার নাম উচ্চারিত হবে—
নভেরা আহমেদ, অগ্রযাত্রার ভাস্কর।

আজ তোমার জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা জানাই,
সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা সেই নারীকে,
যিনি নীরবে গড়ে গেছেন ইতিহাস,
আর নিজে থেকেছেন ইতিহাসের আড়ালে।

নভেরা, তোমার প্রতি আমাদের প্রণাম—
বাংলার মাটি, মানুষের ভালোবাসা,
ভাস্কর্যের শরীরে তুমি চিরদিন বেঁচে,
সময় পেরিয়ে তুমি অমর হয়ে আছ।

তুমি ছিলে, তুমি আছ, তুমি থাকবে—
বাংলাদেশের শিল্পের প্রথম আধুনিক ভাস্কর,
নভেরা আহমেদ—একটি দীপ্ত নাম,
একটি সাহস, একটি ইতিহাস, একটি আলো।

—(নভেরা আহমেদ : অগ্রযাত্রার ভাস্কর,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

Manual1 Ad Code