শেষদিন অব্দি তোমার ছোঁয়াটুকু!

প্রকাশিত: ৬:০৮ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৩, ২০২৩

শেষদিন অব্দি তোমার ছোঁয়াটুকু!

Manual5 Ad Code

পরশ পাথর |

পুরুষ তুমি ছুঁতে চাইলে এমনিভাবে ছোঁবে।

এই যে বাসে ট্রেনে, রাস্তাঘাটে, ভীড়ের ঠ্যালাঠেলিতে তুমি আমায় ছুঁয়ে দাও, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। এমন তো কতবার হয়েছে। কতজনে কতভাবে তাকিয়েছে, ছুঁয়েছে। একবার জানো কি হল? তখন বয়সটা বেশ অল্প। কলকাতায় লোকাল ট্রেনে চেপেছি। একটাই মাত্র স্টেশন মাঝে, কিন্তু একেবারে চাপাচাপি ভীড়। কোনরকমে ট্রেনে পা রাখতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। আমি ঝুলছি ট্রেনের বাইরে। কোনরকমে একটা লোহার রড ধরে আছি, কিন্তু ঘাম ঘাম হাতে তাও পিছলে যাচ্ছে। হঠাৎ একটা পুরুষালি হাত কনুইয়ের কাছটা ধরেই হ্যাঁচকা টানে ট্রেনের ভেতরের দিকে নিয়ে এল আমাকে। আমি বললাম, “প্লিজ ছাড়বেন না। আমি পড়ে যাব তাহলে।”

“ছাড়ছি না। ভয় নেই।” ভয় ছিল না আর।
আরেকবার। সেবার গায়ে জ্বর। মাথায় কি ঘুরছিল, চট করে হোস্টেল থেকে বাড়ি যেতে খুব ইচ্ছে হল। ট্রেন নেই, কোন ভাল বাস নেই। ঝরঝরে একটা বাস যা পেলাম উঠে পড়লাম। তিলার্ধ জায়গা নেই বাসে। আমি গায়ে জ্বর নিয়ে ধুঁকছি দরজার কাছটায়। পিঠের ওপর হাত পড়ল। একজন গ্রাম্য বৃদ্ধ। বললেন, “বসবে মা? আমি দাঁড়াতে পারব না। এই পাশটায় বস কষ্ট করে।” পাশে জায়গা ছিলনা তেমন। আমার মাথা তোলারও ক্ষমতা ছিল না। রীতিমত ওনার পায়ের ওপরে বসে পড়লাম। জানলার হাওয়া চোখেমুখে লাগল। আঃ শান্তি!

Manual2 Ad Code

এরকম হয় কিন্তু। রাস্তাঘাটে কেউ কেউ হাঁ করে তাকিয়ে দেখে। অস্বস্তি হয়। আমারও হয়। কিন্তু কখনো কখনো খুব ভাল লাগে। একবার যেমন। কোথাও যাচ্ছিলাম, বই পড়তে পড়তে বাসের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছি। শেষ স্টপেজে এসে কন্ডাক্টর ডেকে তুলল। চেয়ে দেখলাম একটা গন্ডগ্রাম। আর একটি ছেলে আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। আমি পাত্তা না দিয়ে বাস থেকে নেমে পড়লাম। বিকেল হয়ে এসেছিল। কন্ডাক্টর বলল এরপর বাস আবার দু’ঘন্টা পর। একা একা দাঁড়িয়ে আছি। ভাবছি কি করব। দেখি পেছনে ঐ ছেলেটিও এসেছে।

“এখানে একটা দোকানে আমার বাইক রাখা থাকে। আমি পৌঁছে দেব?”
“না না। কি দরকার।”
“ভয় নেই। বাড়ি অব্দি পৌঁছে দেব। পরের বাস আসতে আসতে রাত।”
কি মনে হল! বললাম “চলুন।”

“ভাল করলে ধরে বসুন তো। চাপ নেই।” বসলাম।
আমাকে ঠিকানা জিজ্ঞেস করে একদম বাড়ির দরজা অব্দি পৌঁছে দিয়ে গেল। আবার মাকে বলেও দিল, “বলুন কাকিমা, বাসে ওভাবে কেউ ঘুমিয়ে পড়ে?”

এই তাকিয়ে থাকাগুলোও বেশ লাগে তো। তারপর কেউ যদি এমনি এমনি আদর করে, ধর অচেনা কেউ, আমার তাও ভাল লাগে।

Manual7 Ad Code

তখন সন্তানসম্ভবা আমি। দূর্গাপুজোয় লাইনে দাঁড়িয়ে অষ্টমীর প্রসাদ নিচ্ছি। খুব গরম। হাঁসফাঁস করছি। এক চল্লিশোর্ধ এগিয়ে এলেন। একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে আমায় বসিয়ে ভোগ নিতে গেলেন। একটু পরে এসে ভোগের খিচুড়ি, পায়েসের প্লেট আমার হাতে দিলেন। যাবার সময় গালে আলতো ছুঁয়ে বললেন, “এই অবস্থায় অত রোদে কেন দাঁড়ালে? মুখটা দেখ, মা দূর্গা যেন।”
তারও অনেকদিন আগে, বেশ পাঁচ-ছ’বছর আগের ঘটনা। জীবনে প্রথমবার রেডিওথেরাপি নিচ্ছিলাম, এই দিনদশেকের। তখন জানতামই না এর কি মাহাত্ম্য। ব্যাঙ্গালোরে থাকি। বিদেশ বিভূঁয়ে বদনাম করার লোক পাওয়া যায়, পাশে থাকার লোক কম।

Manual8 Ad Code

প্রথম দুদিন বেশ নাচতে নাচতে থেরাপি নিলেও তৃতীয় দিনে এসে অবস্থা কাহিল। এরকমই একদিন থেরাপির জন্য অপেক্ষা করছি, অফিসের এক কলিগের ফোন এল। খুব কাছের নয়, মোটামুটি বন্ধু। জিজ্ঞেস করল কোথায় আছি। বললাম থেরাপি নিচ্ছি। আঁতকে উঠে বলল, “রেডিওথেরাপি চলছে, বলনি একবার?”

হসপিটালের নাম জিজ্ঞেস করল। সেদিন থেরাপি সেরে বাইরে এসে দেখি রিসেপশনে দাঁড়িয়ে আছে।
মাথায় একটা চাঁটি মেরে বলল, “আইডিয়া আছে কোনো কি হচ্ছে? এবার থেকে আমি আসব সাথে, খবরদার আসবে না একা।” সেদিন চোখের জলটা আর দেখতে দিই নি।

ছুঁতে হলে এমনি করে ছোঁও। এমন করে, যাতে শেষ দিন অব্দি তোমার ছোঁয়াটুকু মনে করে রাখতে পারি। গর্ব করে, আনন্দ করে বলতে পারি তুমি একটু হলেও অনেকখানি ছুঁয়েছিলে আমাকে। এখনও ছুঁয়ে আছো। প্রত্যেকবার এমনি করে ছুঁও। সত্যি বলছি, আমার ভাল লাগে। আমি কিচ্ছু মনে করি না।

কালেক্টেড পোস্ট ফ্রম ফেসবুক

Manual2 Ad Code