সিলেট ১৩ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৭:০৬ অপরাহ্ণ, মে ২৩, ২০২৪
আর্মি অফিসারের মেয়ে হওয়ার সুবাদে কলেজ জীবনে আমাকে অনেক টিকাটিপ্পনী শুনতে হত। আমি নাকি অনেক অন্যায় সুযোগ সুবিধা পাচ্ছি। আর যেগুলো পাচ্ছিনা সেগুলো হাতিয়ে নিতে এক মুহূর্তও দ্বিধাবোধ করছিনা। সময়টা ছিল এরশাদের মার্শাল ল, তাই এরশাদের যাবতীয় অপকর্মের দায়ভাগ আমাকে একাই বহন করতে হয়েছে। কারণ আমি ছিলাম সেই দুর্বৃত্ত যার বাবা একজন সেনা কর্মকর্তা।
বিদেশে এসেও মাঝে মাঝে এমন অভিযোগ যে শুনতে হয়নি তা না। যেমন এবারের ঈদ গ্যাদারিং। সবাই বসে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছি, হঠাত কিভাবে জানি কথাটা উঠল— আর্মিতে আমরা কি কি পেতাম তার একটা বিশাল তালিকা। সম্ভব অসম্ভব সবকিছু সেই তালিকায় যোগ হতে থাকল। আমার চাচাতো ভাই রাওয়াল আবার সেটাকে উস্কে দেবার জন্য চোখ বড় বড় করে জানালো— ওরা রেশন এত বেশি পরিমানে পেত যে কাকু তার থেকে আমাদেরকেও দিতেন! এখন রাওয়ালের এই কথাটা মনে আছে, কি করে এটাও একটা রহস্য! কারণ যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে ওই সময়ে আমারি বয়স ৩/৪ এর মতো আর রাওয়ালতো আমার থেকে আরো ৬ মাসের ছোট। কাজেই সংসারের কোন জিনিসটা কোনখান থেকে আসছে, ওই বয়সেই তার খোঁজ খবর রাখা—হুম, সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
কিন্তু তাতে কি? সবাই হৈহৈ করে উঠল। রেশনে আমরা কি কি পেতাম (তাদের মতে বিনামুল্যে), তার মুখে মুখে ফর্দ তৈরি হল। আমি মুচকি মুচকি হেসে ওদের কথা শুনছিলাম। জানা কথা এগুলো বলা হচ্ছে স্রেফ খেপাবার জন্য। ক্ষেপে গেলে চুড়ান্ত বোকামি হবে। এক পর্যায়ে একজন বলে ওঠে— ওরা কম্বলও পেতো। শুনে আর থাকতে পারলামনা। আমি আর সুমনা (সেও আর্মি অফিসারের মেয়ে) হো হো করে হেসে উঠলাম।
এই কম্বলের জন্য যে আমরা কোনদিন কারো হিংসার পাত্র হতে পারি, তা কখনও মনে আসেনি। কারণ কম্বলগুলি দেখতে যেমন ছিল বদখত, তেমনি গায়ে দেয়ামাত্র এমন কুটকুট করত যে বলার না। আমি নিশ্চিন্তমনে যেকারো সাথে বাজি রাখতে পারি যে এই কম্বল গায়ে দিয়ে একমিনিটও টিকতে পারবেনা। বিছানায় বিছিয়ে তার উপর দুই তিনটা চাদর দেবার পরও সেটা গায়ে বিঁধত। কিন্তু প্রতিটা আর্মি বাসায় এই কম্বল মজুদ থাকতো। অন্যরা কি করতো জানিনা, কিন্তু আমাদের বাসায় সেটার গতি হয়েছিল ইস্ত্রির টেবিলে। নিচে কম্বল, তার উপর কাথা, তার উপর চাদর বিছিয়ে আমরা ইস্ত্রি করতাম।
তো বাসায় ফিরেও এই নিয়ে হাসছিলাম। হঠাত মনে পড়ল আমাদের ফুললি ফারনিশড আর্মি থেকে পাওয়া বাসায় (খুবি অন্যায়!) আর কি কি ছিল? অনেক ভেবেচিন্তে একটা লিস্ট খাড়া করলাম—
১। মেরুন রঙের সোফাসেট— প্রত্যেক বাসার ড্রয়িং রুমে একটা করে থাকতো। আর্মিতে অনেক রকম প্রোটোকল মানা হত, জুনিয়র অফিসার/ সিনিয়র অফিসারের বিরাট ডিমারকেশন ছিল কিন্তু এই ফোমের সোফাসেট সব ভেদাভেদ ঘুচিয়ে দিয়েছিল। জুনিয়র অফিসারের মেয়ে হয়ে যে সোফায় বসেছি, চাকরিজীবনের শেষ প্রান্তে আসা সিনিয়র অফিসারের মেয়ে হয়েও সেই একই সোফাসেটে বসেছি। অনেকটা ‘সকলে আমরা সকলের তরে, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ টাইপ আরকি! আমার তো মনে হয় মেরুন রঙ ছাড়া অন্য রঙের সোফাকে আমরা সোফা বলেই মনে করতামনা!
২। আর্মির চেয়ার— আর্মি জীবনের সাথে এই চেয়ার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোনো ছেলেমেয়ে বলতে পারবেনা যে সে এই চেয়ারে বসেনি। এদের উপস্থিতি সর্বত্র। বাসায় তো বটেই, বাবার অফিসে গেলে এই চেয়ার, সি এম এইচ এ ডাক্তার আঙ্কেলের কাছে যাও, সেখানেও এই চেয়ার। যেখানেই যাও এই চেয়ার এড়ানো অসম্ভব। এমন শক্তসমর্থ অথচ চুড়ান্তভাবে আনকমফোর্টেবল চেয়ার আমি জীবনেও দেখিনি। বেশিক্ষন বসলে এর প্লাস্টিকের ফিতার ডিজাইনের দাগ শরীরে ফুটে উঠত। বারবার পোস্টিং হবার ফলে আমাদের নিজেদের ফার্নিচার অনেক সময়ই ভেঙ্গে গেছে কিন্তু এই চেয়ারের এতটুকু কোনা আমি কোনদিন ভাঙতে দেখিনি। নিউক্লিয়ার ওয়ার হলেও এই চেয়ার অক্ষত থাকবে বলে আমার বিশ্বাস।
৩। বিছানা/ হসপিটাল বেড— আর্মির বিছানা তুলনাহীন। মূল কাঠামো কাঠের হলেও মাঝের অংশ ব্যান্ডেজের মতো একধরনের ফিতার বুনুনিতে তৈরি। আবহমানকাল ধরে এগুলো ব্যাবহার হয়ে আসছে, ফলে মাঝের অংশ ঝুলে গিয়ে খাটের চেয়ে দোলনার সাথেই এদের মিল বেশি। দুইজনে একসাথে শুলে দুইজনকেই ৪৫ ডিগ্রী অ্যাঙ্গেলে সারারাত কাটাতে হত, পাশ ফেরা এক প্রাণান্তকর ব্যাপার। বিছানায় ওঠা ও নামাও এভারেস্ট জয়ের সমান।
বাবা আর্মির ডাক্তার, তাই হসপিটাল বেডও মাঝে মাঝে পেতাম। সেগুলো আরেক টর্চার ডিভাইস। সারারাত আটেনশান হয়ে শুয়ে থাকতে হত, উপুড়, চিত, পাশ ফিরে— যেভাবেই শোয়া হোক না কেন আরামের লেশমাত্র ছিলনা।
এছাড়াও জারিকেন পেয়েছি। যেটা সাইজে বড়, মুখ ছোট, ধরারও ভালো ব্যাবস্থা নাই। ত্রিপলও পেতাম,সেগুলি দিয়ে কি করা হত হাজার চেস্টা করেও মনে করতে পারছিনা।
কিন্তু মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করছি, আর্মিতে আমরা আসলেই অন্যায়রকম সুযোগ সুবিধা পেয়েছি।
*** *** ***
অন্যায়রকম সুযোগ সুবিধা পেয়েছিলাম কিনা জানিনা কিন্তু আমরা পেয়েছি এক ইউনিক ছেলেবেলা। ক্যন্টনমেনটের খোলামেলা পরিবেশে গাছগাছালির মাঝে বেড়ে উঠেছি। যার জন্য আজীবন গাছের প্রতি ভালোবাসা জন্মে গেছে। ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে পড়েছি অন্যান্য আর্মি অফিসারের ছেলেমেয়েদের সাথে, তাদের সাথে আত্মার বন্ধনে জড়িয়ে গেছি। বাসে করে স্কুলে যাওয়া, বিকেলে বন্ধুদের সাথে হাঁটতে বের হওয়া, পার্কে খেলা করা, সাইকেল চড়া, শীতকালে বাসায় বাসায় ব্যাডমিন্টন কোর্ট কেটে খেলা, পিকনিকে যাওয়া, সবাই মিলে একসাথে গ্যারিসনে সিনেমা দেখতে যাওয়া— সব স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। আর ছিল লাইব্রেরী। আমার যে বইপড়ার নেশা তা বই কিনে পূরণ করা সম্ভব ছিলনা। কারন পকেটের স্বাস্থ্য খুবই দুর্বল। আমাদের সময়ে বাবামা মনে করত যে ছেলেমেয়েদের হাতে টাকাপয়সা দেয়া মানেই তাদের বিগড়ানোর পথ পরিস্কার করে দেয়া। তাই হাত বেশীরভাগ সময় খালি থাকত। কিন্তু প্রতিটা ক্যানটনমেন্টে একটা করে লাইব্রেরী থাকত। সেখানে অসংখ্য ইংরেজী বাংলা বই। একেকবারে চারটা করে বই ইস্যু করার নিয়ম ছিল। সেই চারটা বই পড়তে আমার খুবই কম সময় লাগত। তখন আবার দৌড় লাইব্রেরীতে। আমার ক্লাসিক পড়া শুরু এই লাইব্রেরীর বই দিয়ে, ডিটেকটিভ বই পড়া শুরু এই লাইব্রেরীর বই দিয়ে। ইংরেজী বইপড়াও শুরু (ফেয়ারী টেলস বাদে) এখান থেকে।
আরো ছিল যখন তখন পোস্টিং। জিনিসপত্র বাধোছাদো। নতুন ক্যান্টে গিয়ে প্রথমে ‘রূপসা’ নামের দুইকামরার বাসায় গিয়ে ওঠা। পরে বাসা পেলে আবার সেখানে শিফট করা। পোস্টিঙের কোন মা-বাপ ছিলনা। স্কুল বছরের শুরুতে, শেষে, মাঝখানে, পরীক্ষার ঠিক আগে দিয়ে— কোনো ঠিকঠিকানা নাই। এত পোস্টিং হত যে আমরা প্রত্যেকেই এক একজন প্যাকিং এক্সপার্ট।
আর কি ছিল? আর ছিল কিছুটা অনিশচয়তা। তবে এটাকে আমরা জীবনের অংশ হিসেবেই জানতাম। কারন এর বাইরে যে কিছু হতে পারে তা আমাদের জানা ছিলনা। স্বাধীনতা যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন আমরা রংপুরে। আব্বুকে ‘ইফেকটিভ ইমিডিয়েটলি’ ঢাকায় পোস্টিং দেয়া হয়। আব্বু শুধু একরাত সময় পায় আমাকে, আম্মুকে, নানুকে আর কাজল খালাম্মাকে রাজশাহীতে পৌঁছে দেবার জন্য। তাও সাথে গার্ড ছিল যাতে পালিয়ে যেতে না পারে। আমাদের রাজশাহীতে নামিয়ে দিয়েই আব্বু চলে যায়। দেশ স্বাধীন হয়ে গেল, আমরা আব্বুর কোনো খবর জানিনা। কারন যোগাযোগ ব্যাবস্থা নস্ট। আব্বুর বাঁচার কথাও ছিলনা কারণ তাদের সবাইকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে জড় করা হয়েছিল মেরে ফেলবার জন্য। কিভাবে জানি পালিয়ে বেঁচে আসে। এসব অবশ্য অন্যের মুখে শোনা, আমি তখন খুবই ছোট।
এর বছর দেড়েক বাদে তাকে যেতে হয় আরব ইজরায়েল ওয়ারে অংশ নেবার জন্য। দুপুরে খাবার টেবিলে আব্বু যখন বোমাটা ফাটালো, আম্মু রাগে দুঃখে প্লেট ভেঙ্গে ফেলে।
প্রেসিডেন্ট জিয়াকে যখন হত্যা করা হয়, আমরা তখন চিটাগং ক্যান্টনমেন্টে। আমাদের বাসা জেনারেল মঞ্জুরের বাসার রাস্তার ঠিক উল্টাদিকে। মনে আছে ভোরবেলায় টেলিফোন ঝনঝন করে বেজে উঠল। আব্বু ফোন ধরে দুইচারবার ‘আচ্ছা’ আচ্ছা’ বলে ফোন রেখে দিয়েই হুড়মুড় করে তৈরি হতে আরম্ভ করে। আব্বুর ব্যস্ততা দেখার মতো, কিসের নাস্তা কিসের কি। কোনমতে দৌড়াতে দৌড়াতে জিপে ওঠার আগে আম্মুকে বলে গেল— মনে হচ্ছে ক্যু হয়েছে।
ইতিমধ্যে আব্বুর হুলুস্থুল দেখে আমরাও উঠে গেছি।
ক্যু মানে যে কি আমি তখন তা জানতামনা কিন্তু আম্মুর মুখ দেখে আন্দাজ করলাম যে ভালো কিছু না।
অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতার মধ্যদিয়ে আমরা সকালটা পার করলাম। পুরা এলাকায় এক দমবন্ধকরা নীরবতা। সবার সাথে সবার যোগাযোগ ছিন্ন। ঘরে শুধু রেডিও চালু। সেই রেডিওতে একটু পরপর হুশিয়ার করে দেয়া হচ্ছে— ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় কার্ফু জারি হয়েছে। কাউকে রাস্তায়, এমনকি বাসার বারান্দায় দেখা গেলে তাকে সাথে সাথে গুলি করা হবে।
আব্বু সেই যে গেল, মাসখানেকের আগে আর বাড়ি আসেনি। তখন ২৪ ঘন্টাই অফিস করতে হয়েছে। আর পরিস্থিতি আয়ত্তে আসবার আগে তো আমরা পুরোপুরি অরক্ষিত ছিলাম। বাসায় বাসায় খালি মহিলা আর বাচ্চারা। যে কোনো সময় একটা কিছু ঘটে যেতে পারত। তার উপরে ছিল গুজবের পর গুজব। কি যে হচ্ছে কিছুই বোঝা যাচ্ছেনা, কে শত্রু কে মিত্র তারও কোনো আন্দাজ নাই। একদিন শুনলাম ঢাকা থেকে বোমারু বিমান পাঠানো হবে ক্যানটনমেন্ট ধ্বংস করবার জন্য। সেরাত্রে আমরা সি এম এইচে আশ্রয় নিয়েছিলাম এই ভেবে যে হসপিটালে নিশ্চয় বোমা ফেলবে না।
তারপর জেনারেল মঞ্জুর ও তার দল ধরা পড়ল। এক এক করে নাম জানতে পারছি আর আমরা আকাশ থেকে আছড়ে আছড়ে পড়ছি! অমুক আংকেল! অমুকের বাবা! কি করে? হতেই পারেনা! আমাদের বাসার সামনের বাসার আন্টির সাথে দেখা করতে গেলাম। আন্টি তখন প্রেগন্যান্ট, জায়নামাজে বসে কাঁদতে থাকলেন— আমি তো কিছুই জানিনা, কিছুই বুঝতে পারছিনা।
পরে তার মৃত সন্তান হয়েছে খবর পেয়েছিলাম।
আর এক আন্টির মাত্র ছয়মাস হয়েছে বিয়ে হয়েছে।
এক অফিসারের বাবাও আর্মি অফিসার। তার মৃত্যুদণ্ডাদেশের স্বাক্ষর তার বাবাকে করতে হয় কারণ তিনি তখন জেলে অন ডেপুটেশনে কর্মরত।
এর কিছুদিন পরে আবার পোস্টিং অর্ডার, আবার বাধোছাদো। এবারের গন্তব্য ঢাকা।
সেসময়ে আর্মি অফিসারদের বেতন হাস্যকর রকমের কম ছিল কিন্তু যে স্মৃতি আমাদের মনে গেঁথে আছে, তার কোনো মুল্য ধার্য করা যাবেনা।
তাই আমরা গর্বের সাথে বলি— আই এম এন আর্মি কিড।
#
লেখক: Tabassum Naz ?

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি