সিলেট ৯ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১২, ২০২৪
মওলানা ভাসানীকে ভারতবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে অপপ্রচার বন্ধ হোকঃ সত্য সামনে আসুক।
মওলানা এমনকি পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পরও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল নীতিমালার প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন। বাংলাদেশকে অনেকেই তখন ইসলামি প্রজাতন্ত্র বানাতে চায় এবং জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকা বদলাতে চায়- এটা শুনে মওলানা হাসপাতালের বিছানা থেকেই বললেন, ‘বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অনিবার্যতাকে অস্বীকার করিয়া এসব প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক চক্র একদিন বাংলার মাটি হইতে উৎখাত হইয়াছিল। আজ তাহারা বিদেশি দেশের টাকা-পয়সা ও উস্কানিতে অনুপ্রাণিত হইয়া বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সাম্প্রদায়িকতামূলক বক্তব্য, ভিন্ন দেশের শ্লোগান এবং চরম দেশদ্রোহিতামূলক বিবৃতি প্রদান করিয়া চলিয়াছে।’ মওলানা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তান জিন্দাবাদ শ্লোগান দেওয়া ধৃষ্টতা। ধর্মানুষ্ঠানকে রাজনৈতিক মঞ্চ বানানো বা ভিন্ন দেশের শ্লোগান দেওয়া ধর্মসম্মত নয়।’ তিনি বলেন, ‘এই দেশ লাখো শহীদের আত্মদানে, লাখো অবলার বেইজ্জতিতে, ইতিহাসের নজিরবিহীন নৃশংসতা ও ধ্বংসলীলার মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে, এটা ভোলা যাবে না।’
মওলানা ভাসানী এই সময় প্রায়শ অসুস্থ থাকতেন, তাঁর বয়সও হয়েছে। তবু তিনি ছিলেন মজলুম জনগণের ভাসানী। ফারাক্কা বাঁধের কথা শুনে তিনি ১৯৭৬ সালের মে মাসে ফারাক্কা মিছিলের ঘোষণা দেন। অসস্থতায় কাবু ছিলেন, ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞা না শুনেই তিনি মিছিলে নেতৃত্ব দেন। এই মিছিল তাঁর দূরদর্শিতার প্রমাণ করলেও অনেকেই তাঁকে ভারতবিরোধিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। ভাসানী এই প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আমার আন্দোলন ভারতের ক্ষতি করবে না, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সংহত করবে। বিশাল ও শক্তিশালী ভারতের পাশে ছোট বাংলাদেশ, তার স্বাধীন সত্তা ভারতের তোষণ দ্বারা হবে না, সমমর্যাদার ভিত্তিতেই হতে পারে।’ আর সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘উপমহাদেশ থেকে আমরা সাম্প্রদায়িকতা দূর করতে পারি নাই। সেটা আমাদের বিরাট ব্যর্থতা। মতিলাল নেহরু , জওহরলালের সঙ্গে আমি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি। আমার জীবনের বড় দুঃখ, ভারতের শাসক শ্রেণীকে আমার সমালোচনা করতে হয়। ভারত হিন্দুপ্রধান রাষ্ট্র। বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি বড় অংশ হিন্দুধর্মাবলম্বী। আমি যখন ভারতের সমালোচনা করি, তখন এখানকার হিন্দুদের অনেকেই কষ্ট পায়। আমি সেটা বুঝি। যদিও ভারতের আধিপত্যবাদী আচরণের জন্য, ভারতের শোষক শ্রেণীর কোনও কাজের জন্য বাংলাদেশের হিন্দুরা দায়ি নয়। তবুও সাইকোলজির উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। দুই দেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতা দূর করতে না পারলে মানুষের মুক্তি নাই। তাই মানুষের মনের পরিবর্তন দরকার। রাজনীতির স্বার্থে সাম্প্রদায়িকতাকে জিইয়ে রাখা হয়। এর থেকে খুব সহজে মুক্তি নাই।’
মওলানাকে যারা সাম্প্রদায়িক মওলানা বলে সমালোচনা করছিলেন তাদের সমালোচনার জবাবে সাংবাদিক নির্মল সেন লিখেছেন, ‘মওলানার রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে কারা সাম্প্রদায়িক।’ কমরেড অমল সেন বলেছেন, ‘ গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা চাইলে, সীমান্তে চোরাচালানের কথা বললে, ভারতের মুনাফালোভী ব্যবসায়ী ও শোষকের বিরুদ্ধে বললে তাঁকে আক্রমণ করার প্রধান অস্ত্র সাম্প্রদায়িক আখ্যায়িত করা। উপমহাদেশে স্পষ্ট কথা বলা কঠিন।’ কমরেড শরদিন্দু দস্তিদার বলেছেন, ‘মওলানা সম্পর্কে কারও কারও এধারনা ছিল যে তিনি ভারতবিদ্বেষী। তাঁর সাথে বিভিন্ন সময় আলোচনা করে আমার তা মনে হয়নি। তিনি ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। তাঁর কথাবার্তায় আমার সবসময় মনে হতো তিনি ভারতকে দুভাবে দেখতেন। একভাগে রয়েছে ভারতের অগণিত সাধারণ মানুষের সংগ্রামী ভূমিকা, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর দক্ষিণ এশিয় উপমহাদেশে আধিপত্য বিস্তারের ভূমিকা। সেই শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ছিল তাঁর আমরণ সংগ্রাম, যা তিনি করে গেছেন নিজ মাতৃভূমিতে ক্ষমতাসীন শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।’ কমরেড দেবেন শিকদার বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার্থে তিনি ভারতের সমালোচনা করেছেন, বাংলাদেশের বামেরাও করেন। তিনি সাম্প্রদায়িকতা থেকে ভারতবিদ্বেষ পোষণ করতেন না।’
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সংকটে মওলানা ভাসানী যেন এক আলোক বর্তিকা। কারণ আসাম- বেঙ্গলের নিপীড়িত মুসলিম চাষিদের নিয়ে কাজ করলেও তিনি কখনো সাম্প্রদায়িক ছিলেননা। তাঁর সংগ্রামে গরীব হিন্দুদের অবাধ অংশগ্রহণ তিনি নিশ্চিত করতেন। অন্যদিকে ধর্মীয় আচার- অনুষ্ঠানের প্রতি অবিচল থেকেও তিনি বলেছেন, ইসলাম আমার ধর্ম, বাঙালি আমার জাতিত্ব, বাংলা আমার সংস্কৃতি। তিনি কোনও সময়ই হিন্দু বা ভারত বিদ্বেষী ছিলেন না।
১৯৭৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মওলানা ভাসানী মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু ৪৮ বছর পরও তিনি আমাদের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক।
#
শরীফ শমসির
লেখক ও গবেষক

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি