মৌলভীবাজারে শুরু হলো চারদিনব্যাপী ভ্রাম্যমাণ বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব

প্রকাশিত: ৮:২০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০২৫

মৌলভীবাজারে শুরু হলো চারদিনব্যাপী ভ্রাম্যমাণ বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব

Manual4 Ad Code
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আয়োজনে পাঠচর্চা ও মননশীলতার উৎসব

নিজস্ব প্রতিবেদক | মৌলভীবাজার, ২৫ অক্টোবর ২০২৫ : বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আয়োজনে ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে শুরু হয়েছে চারদিনব্যাপী ভ্রাম্যমাণ বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব।

Manual4 Ad Code

শহীদ মিনার সংলগ্ন মাঠে আয়োজিত এ মেলা চলবে আগামী ২৮ অক্টোবর, মঙ্গলবার পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে রাত ৮টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ক্রেতা-দর্শনার্থীদের জন্য মেলার স্টল উন্মুক্ত থাকবে।

বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসবের উদ্বোধন করেন মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আসমা সুলতানা নাসরীন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমরা জেলা প্রশাসন ও সদর উপজেলা প্রশাসন থেকে মেলার প্রচার ও প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা রাখব। আমি ছোটবেলায় বই পড়ে অনেক মজা পেতাম, আর অনেক স্বপ্ন দেখতাম। আমাদের শিশুদেরও ভালো বইয়ের কাছাকাছি নিয়ে যেতে হবে, যেন তারা বই পড়ে আনন্দ পায় ও স্বপ্ন দেখতে শেখে। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়—তারা বড়দের অনুসরণ করে। তাই অভিভাবকেরাও যদি বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলেন, তাহলে শিশুরাও বই পড়বে। পরিবারেই বই পড়ার চর্চা শুরু হোক।”

তিনি আরও বলেন, বই কেবল জ্ঞান নয়, নৈতিকতা ও মানবিকতারও উৎস। শিশুদের মানসিক বিকাশে বইয়ের বিকল্প নেই।

অনুষ্ঠানে এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ বইমেলার ইউনিট ইনচার্জ অমিত চক্রবর্তী। তিনি বলেন, “দেশব্যাপী এই ভ্রাম্যমাণ বইমেলার লক্ষ্য হলো পাঠচর্চার প্রসার ও মননশীল সমাজ গঠন। বইকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলাই আমাদের উদ্দেশ্য। এ মেলার মাধ্যমে আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাঠপ্রেমী মানুষদের কাছে বই পৌঁছে দিতে চাই।”

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা, বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কর্মরত সংবাদকর্মী, মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দ, লেখক-সাহিত্যিক-গুণীজন, বইপ্রেমী শিক্ষক-শিক্ষার্থীবৃন্দ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

এ সময় বক্তারা বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে বইয়ের প্রতি আগ্রহ কমে গেলেও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের এই উদ্যোগ পাঠপ্রেম জাগিয়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তারা এমন আয়োজনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।

“জ্ঞান, মনন ও সৃজনশীলতার এক উজ্জ্বল যাত্রা”— কমরেড আমিরুজ্জামান

Manual1 Ad Code

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সংগঠক, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুন কথা–এর বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক এবং বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান মেলার সফলতা কামনা করে বলেন— “আলোকিত মানুষ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের হাত ধরে ১৯৭৮ সালে যাত্রা শুরু করেছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ৪৬ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীন, চিন্তাশীল ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ তৈরির নিরলস সাধনায় নিবেদিত।”

তিনি আরও জানান— “বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কোনো গৎবাঁধা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি জ্ঞান, মনন ও সৃজনশীলতার এক সজীব অঙ্গন। অনুসন্ধিৎসু ও সৌন্দর্যপ্রবণ মানুষদের মিলনস্থলই এই কেন্দ্র। বই পড়ার অভ্যাস, জ্ঞানচর্চা ও রুচিশীল সংস্কৃতি বিকাশই এর লক্ষ্য।”

তার আশাবাদ— “মৌলভীবাজারের এই ভ্রাম্যমাণ বইমেলায় জ্ঞানপিপাসু মানুষের অংশগ্রহণে ‘আলোকিত মানুষ গড়ার’ আন্দোলন আরও বেগবান হবে।”

পাঠপ্রেমীদের মিলনমেলা: উচ্ছ্বাসে মুখর তরুণ সমাজ

মৌলভীবাজার শহরজুড়ে বইপ্রেমী মানুষের মধ্যে ইতিমধ্যেই উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের দলগতভাবে মেলায় অংশগ্রহণের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও তরুণ পাঠকরা বলছেন— এমন উদ্যোগ নিয়মিত হলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বইপড়ার আগ্রহ আরও বাড়বে।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র: এক আলোকিত যাত্রার ধারাবাহিকতা

১৯৭৮ সালে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ-এর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পাঠাভ্যাস ও প্রজ্ঞামূলক সংস্কৃতিচর্চা ছড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে কেন্দ্রের পাঠচক্র, লাইব্রেরি ও মোবাইল লাইব্রেরি কর্মসূচি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্তৃত।

ভ্রাম্যমাণ বইমেলা সেই ধারাবাহিকতারই এক নবীন সংযোজন— যাতে রাজধানী থেকে শুরু করে প্রান্তিক জনপদেও পৌঁছে যাচ্ছে বই ও আলোচনার জগৎ।

মেলা প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয়েছে আকর্ষণীয় বইয়ের স্টল। শিশু-কিশোর সাহিত্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা, অনুবাদ সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ নানা বিষয়ের বই পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন বিকেল ও সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি, সংগীত পরিবেশনা এবং পাঠচক্রের আয়োজন।

মাঠ পর্যায়ে মেলা আয়োজনে সহযোগিতা করছে মেটলাইফ ফাউন্ডেশন, আর স্থানীয় পর্যায়ে সহযোগিতা দিচ্ছে জেলা প্রশাসন মৌলভীবাজার।

বইমেলাকে ঘিরে ইতোমধ্যে শহরের পাঠপ্রেমী মানুষদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। নানা বয়সের পাঠক প্রতিদিন বইমেলায় ভিড় করছেন।

Manual1 Ad Code

সমাপ্তি ২৮ অক্টোবর

আগামী ২৮ অক্টোবর, মঙ্গলবার মেলার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হবে। আয়োজকদের আশা— চারদিনব্যাপী এই আয়োজন মৌলভীবাজারের পাঠপ্রেমী মানুষকে নতুন অনুপ্রেরণা দেবে বইপড়া ও জ্ঞানচর্চার পথে এগিয়ে যেতে।

এই বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার নয়— এটি জ্ঞান, মনন ও আলোকিত সমাজ গঠনের এক উজ্জ্বল উৎসব।

“বইই মানুষকে আলোকিত করে— সেই আলো ছড়িয়ে দিতেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের এই যাত্রা।”

Manual8 Ad Code

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ