নারী–কন্যাশিশুর ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদারে আইন সংস্কার ও সমন্বিত পদক্ষেপের তাগিদ

প্রকাশিত: ৯:৩১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৭, ২০২৫

নারী–কন্যাশিশুর ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদারে আইন সংস্কার ও সমন্বিত পদক্ষেপের তাগিদ

Manual1 Ad Code

স্টাফ রিপোর্টার | ঢাকা, ২৭ নভেম্বর ২০২৫ : বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশুর ওপর দ্রুত বাড়তে থাকা অনলাইন সহিংসতা মোকাবিলায় আইন সংস্কার, শক্তিশালী সুরক্ষা কাঠামো এবং ব্যাপক ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচি চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠক। বিশ্বব্যাপী জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে চলমান ‘১৬ দিনের ক্যাম্পেইন’-এর অংশ হিসেবে এ বছরের প্রতিপাদ্য “নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে ডিজিটাল সহিংসতা বন্ধে ঐক্যবদ্ধ হই” সামনে রেখে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

Manual2 Ad Code

বৃহস্পতিবার আগারগাঁওস্থ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই গোলটেবিলের যৌথ উদ্যোগে ছিল— ইউএনওপস বাংলাদেশ, এসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই), আইসিটি বিভাগ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) এবং বাংলাদেশস্থ মালদ্বীপ প্রজাতন্ত্রের হাইকমিশন।

সাইবার সহিংসতার বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগ

গোলটেবিল বৈঠকে সরকারি নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক, আইন বিশেষজ্ঞ, মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শক, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, সিভিল সোসাইটি সদস্য এবং গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন। তাঁরা সাইবারস্টকিং, অনলাইন হয়রানি, ডিপফেক, ছবি ও ভিডিও বিকৃতি, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহারসহ বিভিন্ন ধরণের ডিজিটাল সহিংসতার ঝুঁকি, এর সামাজিক–মানসিক প্রভাব এবং প্রতিকারব্যবস্থা নিয়ে মতবিনিময় করেন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন এবং রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট–এর প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর ড. তাসনিম আরেফা সিদ্দিকী।

“ডিজিটাল রূপান্তরকে নিরাপত্তার ওপর দাঁড় করাতে হবে”— আইসিটি সচিব

Manual2 Ad Code

আইসিটি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরকে নিরাপত্তা ও জবাবদিহির শক্ত ভিত্তির ওপর গড়ে তুলতে হবে। অনলাইন অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তব্যবস্থা আরও আধুনিক করা এবং সাইবার তদন্ত সক্ষমতা উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।”
তিনি দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিকত্ব গঠনে ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মসূচির গুরুত্বও তুলে ধরেন।

ডিজিটাল সহিংসতা উন্নয়ন–মানবাধিকার–সুশাসনের চ্যালেঞ্জ: ইউএনওপস প্রতিনিধি

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইউএনওপস বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজার সুধীর মুরালিধারণ বলেন,
“ডিজিটাল সহিংসতা কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি উন্নয়ন, সুশাসন এবং মানবাধিকার—এই তিন ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিত কাঠামোর অধীনে কাজ করতে হবে।”

“নারীদের ভয়মুক্ত ডিজিটাল অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে”— এটুআই

Manual2 Ad Code

এটুআই–এর প্রকল্প পরিচালক (যুগ্মসচিব) মোহাঃ আব্দুর রফিক বলেন, “ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সুযোগ তৈরি করলেও তা কখনোই ভয় বা সহিংসতার ক্ষেত্র হতে পারে না। নারীদের নিরাপদ অংশগ্রহণ ছাড়া সমতা–ভিত্তিক ডিজিটাল ভবিষ্যৎ অর্জনের কল্পনাও অসম্ভব।”

Manual8 Ad Code

আইনি কাঠামোতে ‘গ্যাপ’— বিদ্যমান আইন প্রযুক্তির গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তাসনুভা শেলী। তিনি বলেন, “ডিপফেক, ইমেজ-বেইজড অ্যাবিউজ, অনলাইন হয়রানি—এসব নতুন প্রযুক্তিগত ঝুঁকির মোকাবিলায় বর্তমান আইন অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নয়।
দ্রুত প্রতিকার, নিরাপদ প্রমাণ সংরক্ষণ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়বদ্ধতা ও তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে প্রযুক্তি–সংবেদনশীল আইনি কাঠামো অত্যন্ত জরুরি।”

আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান: মালদ্বীপের হাইকমিশনার

মালদ্বীপের হাইকমিশনার শিউনিন রাশেদ বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর ডিজিটাল নিরাপত্তা এখন আঞ্চলিক অগ্রাধিকার। অভিজ্ঞতা বিনিময়, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং সফল উদ্যোগগুলো ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে একটি আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে।”

সবার অংশগ্রহণেই সম্ভব নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ

আলোচনায় আরও অংশ নেন—
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হক; এটুআই–এর আন্তর্জাতিক প্রকল্প ব্যবস্থাপক মাহা আবু ইমাইর; এটুআই–এর প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট লিড আবদুল্লাহ আল ফাহিম; বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ও অতিরিক্ত ডিআইজি ড. মোছাঃ শেহেলা পারভীন; রবি আজিয়াটা লিমিটেডের সিনিয়র ডিরেক্টর অনামিকা ভক্ত; অক্সফাম ইন বাংলাদেশ–এর জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড সোশ্যাল ইনক্লুশন স্পেশালিস্ট রওশন আক্তার উর্মি; অভিনেত্রী শবনম ফারিয়া এবং আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরা।

বক্তারা বলেন—
অনলাইন সহিংসতা ঠেকাতে কেবল ফৌজদারি আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থায় ডিজিটাল নাগরিকত্ব ও মিডিয়া–সাক্ষরতা অন্তর্ভুক্ত করা, পরিবার–সমাজকে সম্পৃক্ত করা, প্রযুক্তি কোম্পানি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর জবাবদিহি আরোপ এবং ভুক্তভোগীদের জন্য সহজলভ্য ও গোপনীয় সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ