৭১-এর স্মৃতি ও পৃথিমপাশা নবাব বাড়ি : ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংগ্রামের এক জীবনছবি

প্রকাশিত: ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১, ২০২৫

৭১-এর স্মৃতি ও পৃথিমপাশা নবাব বাড়ি : ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংগ্রামের এক জীবনছবি

Manual3 Ad Code

সৈয়দ শাকিল আহাদ |

মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার পূর্ব প্রান্তে সবুজ পাহাড় আর হাকালুকি হাওরের জলরাশিকে সঙ্গী করে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিমপাশা নবাব বাড়ি—বাংলার জমিদারি আমলের অন্যতম প্রাচীন, ঐতিহ্যবহ ও জীবন্ত একটি স্থাপনা। প্রায় ২৫ একর জুড়ে বিস্তৃত এই জমিদারবাড়ি শুধু স্থাপত্য নয়, বহুকাল ধরে ইতিহাস, রাজনীতি ও সংস্কৃতির সাক্ষী হয়ে আছে। আলী আমজাদ খান থেকে আলী হায়দার, আলী সফদর খান থেকে আলী আব্বাস—প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পরিবার সিলেট অঞ্চলের ইতিহাসে রেখে গেছে গুরুত্বপূর্ণ ছাপ।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জমিদারির উত্থান

১৮ শতকের শেষভাগে শ্রীহট্ট (বর্তমান সিলেট) অঞ্চলের কাজী মোহাম্মদ আলীর পুত্র গাউস আলী খান এ এলাকার জমিদারির স্বত্ব লাভ করেন ব্রিটিশ শাসকদের অনুকম্পায়। কুকি বিদ্রোহ দমনে সহযোগিতার জন্য ব্রিটিশ সরকার তাকে প্রায় ১৪,৪০০ বিঘা জমি পুরস্কার হিসেবে প্রদান করে। এখান থেকেই পৃথিমপাশা জমিদার পরিবারের উত্থান।

পরবর্তীতে আলী আহমদ খান ও তাঁর পুত্র নবাব আলী আমজাদ খান এই জমিদারিকে নিয়ে যান প্রভাব, প্রাচুর্য ও উন্নয়নের শীর্ষে। ব্রিটিশ শাসনামলে সিলেট শহরের চাঁদনীঘাট, সুরমা নদীর তীর এবং কিংবদন্তিতুল্য আলী আমজাদের ঘড়ি টাওয়ার—সবই তাঁর উদ্যোগেরই চিহ্ন বহন করে।

রাজনীতি, কূটনীতি ও আতিথেয়তার ইতিহাস

পৃথিমপাশা নবাব বাড়ি বহু রাজন্যবর্গ, ইংরেজ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং অভিজাত পরিবারের মিলনমেলা ছিল। ত্রিপুরার মহারাজা রাধা কিশোর মানিক্য বহুদফা এই বাড়িতে আগমন করেছেন; ইরানের শাহ রেজা শাহ পাহলভিও সফর করেছেন জমিদারবাড়িটি। তাঁর সফরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান সরকার আইয়ুব খানকে প্রেরণ করে—যিনি পরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন।

Manual2 Ad Code

পরিবারটির সঙ্গে সিলেটের রাজপরিবারের আত্মীয়তার সম্পর্কও ছিল দীর্ঘদিনের। সৈয়দ ময়েজ উদ্দিনের কন্যা সৈয়দা ফাতেমা বানুর সঙ্গে নবাব আলী আমজাদ খানের বিয়েকে ঘিরে যে আয়োজন হয়েছিল, তা সে সময়ের আঞ্চলিক ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়। চল্লিশটি হাতির শোভাযাত্রা এবং অভিজাত অতিথিদের সমাবেশ বিয়েটিকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।

Manual1 Ad Code

বাংলার প্রথম মুসলিম টি-প্ল্যান্টার

নবাব আলী আমজাদ খানের আরেকটি বিশেষ পরিচয়—তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম মুসলিম চা-বাগান মালিক। ব্রিটিশ আমলে তাঁর এষ্টেটে ইংরেজ ম্যানেজার, নেপালি প্রহরী এবং শতাধিক অস্ত্রধারী প্রহরাবাহিনী ছিল। নবাববাড়ির মূল ফটকের দুই পাশে জীবন্ত বাঘের খাঁচা ছিল—যা আজো লোকমুখে বিস্ময় হয়ে বয়ে চলে।

স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ‘রাজা সাহেব’-এর অবদান

এই পরিবারের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ।

বাড়িটির একজন বিশিষ্ট সদস্য নবাব আলী সফদর খান—যিনি স্থানীয়ভাবে ‘রাজা সাহেব’ নামে পরিচিত ছিলেন—মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও নেতৃত্বশীল ব্যক্তিত্ব। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, তাদের খাদ্য ও লজিস্টিক সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং জনসমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পাকিস্তানি বাহিনী তাকে হত্যার জন্য বহুবার চেষ্টা চালালেও ব্যর্থ হয়।

তার বিপরীতে একই পরিবারের এক উচ্ছৃঙ্খল সদস্য পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিল—যার কারণে নবাববাড়ির একটি অংশে সাময়িকভাবে পাক সেনাদের ক্যাম্প স্থাপন করা হয় এবং সংঘটিত হয় কয়েকটি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড।

রাজা সাহেব সংগ্রাম করেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, এমনকি জমিদার পিতার অবিচারেও আপোষ করেননি। দেশপ্রেমিক এই জননেতা ১৯৭৪ সালের ১৬ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন।

পরবর্তী প্রজন্ম ও জনসেবা

নবাব পরিবারের উত্তরসূরিরা পরবর্তী সময়েও জনসেবা, রাজনীতি ও সমাজ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

নওয়াব আলী আব্বাস খান তিনবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে সিলেট-মৌলভীবাজার অঞ্চলের মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন।

নওয়াব আলী নকী খান দীর্ঘদিন ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান ছিলেন।

আজও এই পরিবার দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বিপুল সংখ্যক বংশধর নিয়ে ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

স্থাপত্য, স্মৃতি ও আজকের পৃথিমপাশা

Manual8 Ad Code

পৃথিমপাশা নবাব বাড়ি আজও তার আভিজাত্য ধরে রেখেছে। পুরোনো কারুকাজ, চমৎকার ইমামবাড়া, সুসজ্জিত দীঘি, শানবাঁধানো ঘাট, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বাসভবন—সব মিলিয়ে স্থানটি জমিদার আমলের জীবন্ত জাদুঘর যেন। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ আর পরিবারিক যত্নের কারণে বাড়িটির সৌন্দর্য আজও ঝকঝকে।

ইতিহাসবিদ, গবেষক এবং পর্যটকদের কাছে পৃথিমপাশা নবাববাড়ি একটি আকর্ষণীয় ও শিক্ষণীয় ঐতিহ্যস্থল। বাংলা, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির বহু অধ্যায় এ বাড়িকে ঘিরেই রচিত।

Manual4 Ad Code

শেষকথা

পৃথিমপাশা নবাব বাড়ি শুধু একটি স্থাপনা নয়; ইতিহাসের দীর্ঘপথে সংগ্রাম, আভিজাত্য, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং ঐতিহ্যের ধারাবাহিক সাক্ষী। বাংলার মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে এর সম্পর্ক অচ্ছেদ্য। সেই ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন গবেষণার তথ্য-উপাত্ত থেকে সংগৃহীত সহায়তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে এই পর্বের ইতি টানছি।

(চলবে)

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ