বন্দুকের ভাষার কূটনীতির দিন শেষ: ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার নিন্দায় গেনাডি জিউগানভ

প্রকাশিত: ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ৬, ২০২৬

বন্দুকের ভাষার কূটনীতির দিন শেষ: ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার নিন্দায় গেনাডি জিউগানভ

Manual6 Ad Code

কূটনৈতিক প্রতিবেদক | মস্কো (রাশিয়া), ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ : ভেনেজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন রাশিয়ান ফেডারেশনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআরএফ) চেয়ারম্যান কমরেড গেনাডি জিউগানভ। তিনি বলেছেন, জোর-জবরদস্তি ও বন্দুকের ভাষায় কূটনীতি চালানোর যুগ শেষ হয়ে গেছে, এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলো আর আগের মতো অসহায় নয়।

নতুন বছরের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ববাসীর সামনে তার আগ্রাসী নীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন কমরেড জিউগানভ। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ৩ জানুয়ারি মার্কিন বিমানবাহিনী ভেনেজুয়েলার একাধিক সামরিক স্থাপনা এবং রাজধানী কারাকাসের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিমান হামলা চালায়। কমরেড জিউগানভ এই ঘটনাকে একটি সার্বভৌম ও জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে “সরাসরি সশস্ত্র আগ্রাসন” হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের অভিযোগ

কমরেড জিউগানভ বলেন, এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিমালা, জাতিসংঘ সনদ এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ধারণাকে চরমভাবে লঙ্ঘন করেছে। তার ভাষায়, “কোনো আন্তর্জাতিক অনুমোদন ছাড়াই একটি স্বাধীন দেশের ভূখণ্ডে বোমাবর্ষণ করা সাম্রাজ্যবাদী দম্ভ ছাড়া আর কিছু নয়।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শান্তিরক্ষার কথা বললেও বাস্তবে তিনি নিজেকে একজন ‘কঠোর নেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘যুদ্ধ মন্ত্রণালয়’ করার সিদ্ধান্তকেও তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের মানসিকতার প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেন।

‘মাদকবিরোধী অভিযান’ ও সমুদ্র আইনের প্রশ্ন

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের আগে দীর্ঘদিন ধরে ‘মাদক পাচারবিরোধী অভিযান’-এর অজুহাতে দেশটির চারপাশে সামরিক চাপ বাড়ানো হচ্ছিল। জিউগানভের অভিযোগ, এই অভিযানের সময় আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে এবং সন্দেহভাজন জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাজ্যকেও ভেনেজুয়েলার উপকূলে নাবিক নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রকাশ্যে উদ্বেগ ও নিন্দা জানাতে হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

Manual5 Ad Code

মূল লক্ষ্য: মাদুরো সরকার উৎখাত

Manual7 Ad Code

গেনাডি জিউগানভের মতে, এই আগ্রাসনের মূল উদ্দেশ্য হলো হুগো চাভেজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। তিনি বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও ওয়াশিংটন এই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

“ভেনেজুয়েলার জনগণ পশ্চিমাপন্থী বিরোধীদের প্রত্যাখ্যান করে মাদুরোর পাশে দাঁড়িয়েছে। এখন সেই ব্যর্থতার প্রতিশোধ নিতে ট্রাম্প সরাসরি সামরিক শক্তির আশ্রয় নিচ্ছেন,”—বলেন জিউগানভ।

মনরো নীতি ও চীন প্রসঙ্গ

রুশ কমিউনিস্ট নেতার বক্তব্যে হামলার পেছনে আরও গভীর ভূরাজনৈতিক কারণের কথাও উঠে আসে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ২০০ বছর পুরনো ‘মনরো নীতি’ কার্যকর করতে চাইছে—যার মাধ্যমে পুরো লাতিন আমেরিকাকে বাইরের শক্তির, বিশেষ করে চীনের প্রভাবমুক্ত রাখার চেষ্টা চলছে।

বর্তমানে চীন ভেনেজুয়েলার অন্যতম প্রধান তেল ক্রেতা এবং দেশটির সঙ্গে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দ্রুত জোরদার হচ্ছে। জিউগানভের মতে, “ট্রাম্প এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইছেন—ভেনেজুয়েলাকে দমন করা এবং একই সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থে আঘাত হানা।”

সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংহতি

Manual8 Ad Code

এই হামলাকে “সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে জঘন্য রূপ” আখ্যা দিয়ে জিউগানভ বলেন, রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি ভেনেজুয়েলার জনগণের সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করছে। তার মতে, বহু বছর ধরেই ভেনেজুয়েলার জনগণ যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত পুতুল সরকার চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে।
তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “লাতিন আমেরিকা এখন আর দুই শতাব্দী আগের মতো দুর্বল নয়। ভেনেজুয়েলার মুক্তিকামী জনগণকে দমন করার চেষ্টা এবারও ব্যর্থ হবে। বন্দুকের ভাষার কূটনীতির দিন শেষ—এ বাস্তবতা ট্রাম্পকে শিগগিরই মেনে নিতে হবে।”

Manual3 Ad Code

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলায় হামলার অভিযোগ সত্য হলে তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। জাতিসংঘ, রাশিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগের দিকে এখন বিশ্ববাসীর দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ