সিলেট ১২ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:২২ পূর্বাহ্ণ, মে ১২, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | চট্টগ্রাম, ১২ মে ২০২৬ : দেশের বামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক উজ্জ্বল নাম কমরেড শরদিন্দু দস্তিদার।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, আজীবন নিবেদিত প্রাণ বিপ্লবী ও মুক্তিসংগ্রামী এই নেতা আজ থেকে ২২ বছর আগে ২০০৪ সালের ১২ মে মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছে।
মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় নেতাকর্মীরা তাঁর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ তাঁর রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রাম এবং বিপ্লবী আদর্শের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। একইসঙ্গে বিভিন্ন বাম, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক সংগঠন তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করে আলোচনা সভা ও স্মরণসভার আয়োজন করেছে।
শৈশব থেকেই রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ
কমরেড শরদিন্দু দস্তিদার ১৯১৯ সালের ৮ নভেম্বর চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি রাজনৈতিক চেতনা ও প্রগতিশীল ভাবধারার পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। তাঁর পরিবারের অনেক সদস্যই বামপন্থী ও প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ফলে কৈশোরকালেই তিনি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম ও স্বাধীনতার আন্দোলনের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন।
চট্টগ্রাম মিউনিসিপাল স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সংগঠন ‘যুগান্তর’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। সেই সময় ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের উত্তাল আবহ তরুণ শরদিন্দু দস্তিদারের রাজনৈতিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। মাস্টারদা সূর্যসেনের আত্মত্যাগ ও বিপ্লবী চেতনা তাঁর জীবনব্যাপী রাজনৈতিক সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
মাস্টারদার মৃত্যুর পর পুনর্গঠনের উদ্যোগ
মাস্টারদা সূর্যসেনের ফাঁসির পর ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী সংগঠনগুলো কঠিন সংকটের মুখে পড়ে। কিন্তু সেই দুঃসময়ে তরুণ শরদিন্দু দস্তিদার এবং তাঁর সহযোদ্ধারা বিপ্লবী সংগঠনকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কমরেড আব্দুস সাত্তারসহ কয়েকজন তরুণকে নিয়ে তিনি নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালান।
একপর্যায়ে তাঁরা একই দিনে তিনটি সামরিক ক্যাম্পে আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। তবে পরিকল্পনার তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে ব্রিটিশ সরকার তাঁদের বিরুদ্ধে দমন অভিযান শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৩৫ সালের আগস্ট মাসে কমরেড শরদিন্দু দস্তিদার প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তাঁর গ্রেফতারের আগেই পরিবারের আরও তিন সদস্য ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে কারাবন্দী ছিলেন।
কারাবরণ ও নির্যাতনের মধ্যেও অবিচল সংগ্রামী
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল এবং পরবর্তী সময়েও কমরেড শরদিন্দু দস্তিদার বহুবার কারাবরণ করেন। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, জেল-জুলুম, নির্যাতন কিংবা দমন-পীড়ন কোনোটিই তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ও সংগ্রামী চেতনাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বরং প্রতিটি নির্যাতন তাঁকে আরও দৃঢ় ও আপসহীন করে তোলে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। বামপন্থী রাজনীতির সংগঠক হিসেবে তিনি যেমন ত্যাগী ছিলেন, তেমনি ব্যক্তিজীবনে ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে, দায়িত্বশীল ও নীতিবান। রাজনৈতিক সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন সততা, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের প্রতীক।
বাংলাদেশের বাম রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কমরেড শরদিন্দু দস্তিদারের জীবন বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন এক প্রজন্মের সংগ্রামী চেতনার প্রতীক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির রাজনীতিকে তিনি আজীবন ধারণ করেছেন।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বলেন, কমরেড শরদিন্দু দস্তিদারের রাজনৈতিক দর্শন, দায়িত্ববোধ এবং সংগঠন পরিচালনার দক্ষতা নতুন প্রজন্মের কর্মীদের জন্য এখনও অনুকরণীয়। তাঁরা মনে করেন, আদর্শভিত্তিক রাজনীতি, ত্যাগ এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন বিরল ব্যক্তিত্ব।
ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় নেতাদের শ্রদ্ধা
২২তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নূর আহমেদ বকুল এক যৌথ বিবৃতিতে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, “কমরেড শরদিন্দু দস্তিদার ছিলেন বাংলাদেশের বাম আন্দোলনের এক সাহসী ও আপসহীন সংগঠক। তাঁর রাজনৈতিক জীবন নতুন প্রজন্মের কাছে সংগ্রাম, আদর্শ ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”
তাঁরা আরও বলেন, “দেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। গণমানুষের মুক্তি এবং শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা আমাদের অনুপ্রাণিত করে যাবে।”
প্রগতিশীল মহলে স্মরণ ও শ্রদ্ধা
আজীবন নিবেদিত প্রাণ এই বিপ্লবী নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান। এক স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্যে তিনি বলেন, “আমার রাজনৈতিক জীবনে অনেক বাম প্রগতিশীল নেতার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু কমরেড শরদিন্দু দস্তিদারের মতো দায়িত্ববোধসম্পন্ন নেতা খুব কমই দেখেছি। তাঁর জীবন, সংগ্রাম এবং আদর্শ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অপরিহার্য অংশ।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমান সময়ে যখন আদর্শভিত্তিক রাজনীতি নানা সংকটের মুখোমুখি, তখন কমরেড শরদিন্দু দস্তিদারের জীবন ও সংগ্রাম নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। তাঁর রাজনৈতিক সততা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং আত্মত্যাগের চেতনা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।”
নতুন প্রজন্মের কাছে প্রাসঙ্গিক এক নাম
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় যখন আদর্শিক রাজনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন কমরেড শরদিন্দু দস্তিদারের মতো নেতাদের স্মরণ নতুন তাৎপর্য বহন করে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তাঁরা বলেন, জনগণের অধিকার আদায়ে আপসহীন অবস্থান, ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সংগঠনের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
কমরেড শরদিন্দু দস্তিদারের দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন শুধু একটি রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়; বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারার গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশজুড়ে বামপন্থী কর্মী-সমর্থক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ এবং প্রগতিশীল সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ গভীর শ্রদ্ধায় তাঁকে স্মরণ করছেন।
লাল সালাম কমরেড শরদিন্দু দস্তিদার।
আজও ভোরের চট্টগ্রামে কাঁপে লাল পতাকা, আজও জাগে বন্দরে সেই অগ্নিদীপ্ত ডাক, আজও পাহাড়, কর্ণফুলী, বন্দর, জনপদ, স্মরণ করে বিপ্লবীর রক্তলেখা পাঠ।
শরদিন্দু দস্তিদার, ইতিহাসের নাম, সংগ্রামেরই অভিধানে জ্বলে অবিরাম, শৃঙ্খল ভাঙা মানুষের এক দুর্জয় গান, নিঃস্বজনের বুকের ভিতর উচ্চারণ প্রাণ।
আঠারো শত ঝড় পেরিয়ে ঔপনিবেশিক রাত, বুকের উপর নেমে এলো লৌহশাসন ঘাত, সেই আঁধারে কিশোর চোখে জ্বলে উঠল দীপ, স্বাধীনতার আহ্বানেতে উত্তাল হল নীপ।
উনিশ শত উনিশ সালে জন্ম নিল শিশু, ভাগ্যের কাছে মাথা নত করেনি সে কিছু, চট্টগ্রামের বাতাস তখন রক্তমাখা দিন, মাটির নিচে গুমরে ওঠে বিদ্রোহী সংগীন।
পরিবারে জেগে ছিল বামপন্থী আলো, শোষণহীন সমাজগড়ার অঙ্গীকার এক, একটি ঘরে কত জনের সংগ্রামী পরিচয়, দেশের তরে কারাবরণ গৌরবময় গাঁথা।
মিউনিসিপাল স্কুল ঘিরে ছাত্রজীবন কালে, সূর্যসেনের বজ্রডাকে কিশোর এল দলে, যুগান্তরের গোপন পথে শপথ নিল প্রাণ, দেশমাতার মুক্তির তরে উৎসর্গ অবদান।
মাস্টারদার চোখের ভিতর দাউদাউ যে আগুন, সেই আগুনে জেগে উঠল শত তরুণ ফাগুন, শরদিন্দুর বুকের মাঝে জন্ম নিল শপথ, বিপ্লব যদি মাথা তোলে করবে তারই রথ।
তারুণ্যেরই দুরন্ত ক্ষণ, রাত্রির গোপন সভা, কাঁধে কাঁধে স্বাধীনতার রণসংগীত লেখা, ব্রিটিশশাসন কাঁপিয়ে দিতে প্রস্তুত তরুণ দল, রক্তদানের প্রত্যয়ে সব হয়েছে উন্মল।
মাস্টারদার ফাঁসির পরে স্তব্ধ হলো ক্ষণ, কাঁদল শুধু চট্টগ্রামের প্রতিটি আপনজন, কিন্তু যারা বিপ্লবী তারা থামে কি আর তায়, রক্তস্রোতে নতুন করে বিদ্রোহ উঠে যায়।
বন্ধু আব্দুস সাত্তার সাথে শপথ নিল আবার, ছিন্ন দলকে সংগঠনের ডাক দিল নির্ভার, তিনটি মিলিটারি শিবির আঘাত করার তরে, রাত্রিজুড়ে পরিকল্পনা গোপন অন্ধকারে।
কিন্তু হায়, বিশ্বাসঘাতক ফাঁস করিল কথা, চারদিকেই নেমে এলো ঔপনিবেশিক ব্যথা, উনিশশো পঁয়ত্রিশ সালের আগস্ট মাস ঘোর, প্রথমবারের মতো তখন বন্দী হল ভোর।
লোহার গরাদ, নির্যাতনের কণ্টকময় দিন, তবু মাথা নত করেনি দুর্জয় সেই ঋণ, কারাগারের অন্ধ কক্ষে জেগে ছিল গান, মানুষ জাগার লাল স্বপ্নে দীপ্ত অবিরাম।
পরিবারের আরো আগে তিনজন ছিল বন্দী, স্বাধীনতার অভিযাত্রায় কারাগারও সন্ধি, যে ঘরে জন্ম বিপ্লবীর সেই ঘরেরই ধ্বনি, অন্যায়েরই বিরুদ্ধে ছিল জাগ্রত প্রতিধ্বনি।
বহুবারই জেল খেটেছেন শোষণবিরোধী পথে, বহুবারই শাসক এল রুদ্ররূপের রথে, নির্যাতনের প্রতিটি ক্ষণ ক্ষয় করেনি মন, বরং আরো দৃঢ় করেছে সংগ্রামেরই পণ।
বাম রাজনীতির দীর্ঘ পথে ছিলেন অকুতোভয়, শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি জন ছিল তাঁরই পরিচয়, ক্ষমতার লোভ স্পর্শ করেনি মনপ্রাণ, আদর্শই ছিল তাঁর একমাত্র সম্মান।
ওয়ার্কার্স পার্টির পতাকাতলে দৃপ্ত পদচারণ, জনমানুষের অধিকারে অবিরাম উচ্চারণ, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হয়ে থেকেছেন সদা, দল মানে তাঁর মানুষেরই রক্তমাখা পথচলা।
চট্টগ্রাম জেলা জুড়ে তিনি আলোকিত নাম, সাধারণ সম্পাদক হলেও ছিলেন নিরাভিমান, মাঠে মাঠে, শ্রমিকঘাটে, সভায় কিংবা গ্রামে, শুনিয়েছেন মানুষেরই অধিকারের বাণে।
কমরেড মানে কেবল নয় স্লোগানেরই ঢেউ, কমরেড মানে মানুষেরে আপন করে নেয়, শরদিন্দু সেই মানুষই যাঁর জীবনজুড়ে, অন্নহীনের বেদনা ছিল প্রতিটি সুরে সুরে।
বিপ্লব কোনো অলংকার নয়, নয় মিছিলে ছবি, বিপ্লব মানে ক্ষুধার বিরুদ্ধে জেগে ওঠা কবি, বিপ্লব মানে শোষিতেরই ন্যায্য অধিকার, শরদিন্দু সেই কথাটাই বলেছেন বারবার।
কত নেতা এলো-গেলো সময়েরই স্রোতে, কত নামই হারিয়ে গেল কালের ধুলোর রথে, কিন্তু যারা মানুষেরই রক্তে লেখে নাম, ইতিহাসে অমর হয়ে জ্বলে অবিরাম।
তাঁর দায়িত্ববোধ ছিল পর্বতেরই মতো, নিজের আগে মানুষেরই ভাবতেন অবিরত, সহযোদ্ধার দুঃসময়ে থেকেছেন পাশে গিয়ে, বুকের রক্ত দিয়েছেনও মানুষেরই নিয়ে।
কত সভা, কত মিছিল, পুলিশেরই ধাওয়া, কত রাতেই পালিয়ে গেছেন বজ্র আঁধার ছাওয়া, তবু ভয়ের কাছে কোনো দিন দেননি আত্মসমর্পণ, শপথ ছিল মানুষ জাগার সংগ্রামী উচ্চারণ।
চট্টগ্রামের বন্দরে যখন শ্রমিক নামে পথে, শরদিন্দু থাকতেন গিয়ে তাদেরই পাশে রথে, ক্ষুধার জ্বালা, ন্যায্য মজুরি, বেঁচে থাকার লড়াই, সেই সংগ্রামে অগ্রসেনা ছিলেন তিনি সদাই।
কৃষকেরই ঘামে ভেজা মাঠের সবুজ ধান, জমিদারের লুণ্ঠন দেখে কেঁদেছে তাঁর প্রাণ, মেহনতি জন বাঁচবে যেদিন মুক্ত আকাশ তলে, সেই দিনেরই স্বপ্ন ছিল তাঁর চোখের জলে।
তিনি জানতেন বিপ্লব মানে দীর্ঘ অগ্নিপথ, হঠাৎ করে বদলে যায় না শোষণবাঁধা রথ, তবু যদি মানুষ জাগে সংগঠনের ডাকে, দুর্গম পথ ভাঙতে পারে ঐক্যেরই ফাঁকে।
তাঁর কণ্ঠে ছিল ইতিহাসের কঠিন সত্যবাণী, সাম্রাজ্যবাদ, শোষকগোষ্ঠী মানুষেরই শত্রু জানি, ধনতন্ত্রের বিষদাঁত যদি গেঁথে বসে প্রাণে, মানুষ তবে হারিয়ে যাবে দুঃসহ অবসানে।
কত নবীন শিখেছে এসে তাঁর কাছ থেকে, কীভাবে মানুষ ভালোবাসে বিপ্লবী এক ডাকে, কীভাবে নিজের সুখ বিসর্জন দিতে হয় নির্ভয়ে, কীভাবে দাঁড়াতে হয় শোষিত জনের হয়ে।
তিনি ছিলেন চলমান এক রাজনৈতিক পাঠশালা, শ্রমিক-কৃষক ঐক্যেরই জাগাতেন জয়ধ্বজা, সত্য বলার সাহস ছিল বজ্রের মতো কঠিন, অন্যায় দেখলে নীরব থাকা ভাবতেন মহাপাপ ঋণ।
তাঁর জীবন এক নদীর মতো বহমান সংগ্রাম, দুঃখ, জেল আর নির্যাতনের অবিরাম অবধাম, তবু কোথাও ভাঙেনি তাঁর আদর্শেরই শিখা, রাত্রি জুড়ে জ্বলেছে যেন মুক্ত ভোরের দিশা।
আজ মৃত্যুর বাইশ বছর পেরিয়ে গেছে ঠিক, তবু তাঁরই উচ্চারণে জেগে ওঠে দিক, যে মানুষটি ইতিহাসে রেখে গেছেন দাগ, তাঁর স্মৃতি আজ জনমানসে দীপ্ত অনুরাগ।
মাহমুদুল হাসান মানিক শ্রদ্ধাভরে কয়, কমরেডের আত্মত্যাগ আমাদেরই জয়, নূর আহমেদ বকুলও দেন লাল সালামের বাণী, বিপ্লবীদের জীবনকথা জাতির গর্ব জানি।
লাল সালাম, কমরেড তুমি নিভে যাওনি কভু, মানুষ জাগার প্রত্যয়ে আজও আছ প্রভু, যতদিন এই বাংলাতে শোষণ থাকবে বেঁচে, ততদিনই তোমার কথা উঠবে আগুন মেখে।
আজকের এই প্রজন্ম যখন বিভ্রান্তির ঢেউ, স্বার্থলোভী রাজনীতিতে পথ খুঁজে না কেউ, তখন তোমার জীবন যেন দিকনির্দেশ আলো, আদর্শহীন ক্ষমতালোভে না হয় দেশ কালো।
যারা শুধু রাজনীতিকে ব্যবসা ভাবে আজ, জনগণের রক্তচোষা ক্ষমতালোভী সাজ, তাদের মুখে চপেটাঘাত তোমার জীবনগাথা, নিঃস্বার্থই সংগ্রামীদের সত্য ইতিহাস কথা।
তুমি শিখিয়েছ দেশ মানে কেবল মাটির মানচিত্র নয়, দেশ মানে শ্রমিকের মুখে অন্নের ন্যায্য জয়, দেশ মানে কৃষকের ঘরে হাসির সোনার ধান, দেশ মানে বঞ্চিত জনের মুক্ত জীবনের গান।
তুমি শিখিয়েছ রাজনীতি মানে মানুষেরই পাশে, শীতের রাতে ক্ষুধার্ত শিশু কাঁদলে বুকটা ভাসে, অন্যায় যদি চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে ঘিরে, প্রতিরোধের মশাল তবে ধরতে হবে নীরে।
তুমি শিখিয়েছ সংগঠন মানে ভালোবাসার বাঁধন, কমরেড মানে দুঃসময়ে সাহস দেওয়ার সাধন, কারাগারের অন্ধকারেও স্বপ্ন রাখা জাগ্রত, রক্ত দিয়েও মানুষ রাখার প্রত্যয় অবনত।
আজও যদি চট্টগ্রামের অলিগলি ধরে, শ্রমিকঘাটে কিংবা কোনো মিছিলেরই ভরে, কেউ উচ্চারণ করে যদি লড়াইয়েরই নাম, তোমার ছায়া ভেসে ওঠে লাল পতাকার ধাম।
আজও যদি পাহাড়তলীর শ্রমিক ডাকে হাহাকার, আজও যদি কৃষক মরে শোষকেরই অত্যাচার, আজও যদি বেকার তরুণ পথের ধুলো খায়, তোমার শেখানো সংগ্রাম তখন নতুন শক্তি পায়।
তুমি ছিলে মানুষেরই সাহসী উচ্চারণ, ভীরু সময় ভেঙে দেবার দৃপ্ত ঘোষণা ধ্বনন, বুকের ভিতর লাল আগুন জ্বালিয়ে রাখা নাম, কমরেড শরদিন্দু তুমি বাংলারই দাম।
মৃত্যু কেবল দেহের শেষে থেমে যাওয়া নয়, যারা মানুষের হৃদয়ে থাকে তারাই সত্য জয়, তোমার জীবন তেমনি এক দীপ্ত ইতিহাস, শোষিতেরই মুক্তির তরে অবিনশ্বর শ্বাস।
এই বাংলার প্রতিটি ঘরে জাগুক সেই শিক্ষা, অন্যায়েরই বিরুদ্ধে হোক সত্যের দৃঢ় দীক্ষা, যুব সমাজ শিখুক এসে ত্যাগেরই মহান পথ, স্বার্থ ভুলে মানুষেরই পাশে থাকার রথ।
কমরেড, তোমার রক্তমাখা সংগ্রামী আহ্বান, আজও দেয় শপথ নেবার দুর্জয় অভিমান, শোষণহীন সমাজগড়ার অঙ্গীকারের গান, তোমার স্মৃতির মশাল বুকে এগিয়ে যাবে প্রাণ।
যেদিন হবে মানুষেরই সত্য মুক্ত ভোর, ক্ষুধা-দারিদ্র্য হারিয়ে যাবে দূর অন্ধকার ঘোর, সেদিনও এই বাংলাতে উচ্চারিত নাম, শরদিন্দু দস্তিদার—অমর বিপ্লবধাম।
লাল সালাম কমরেড তোমায়, শতকোটি প্রণাম, তোমার ত্যাগে উজ্জ্বল হোক মানুষেরই নাম, আজীবন যে সংগ্রাম তুমি বুকে ধরে ছিলে, সেই পতাকা নতুন প্রজন্ম হাতে তুলে নিলে।
জয় হোক সব মেহনতি জনের ন্যায্য অধিকারে, জয় হোক সব মুক্তিকামী মানুষেরই দ্বারে, জয় হোক সেই বিপ্লবীর যিনি জীবনভর, শোষণহীন পৃথিবীরই স্বপ্ন বুনেছেন ঘর।
লাল সালাম কমরেড শরদিন্দু দস্তিদার, বাংলার বুকে জ্বলবে তুমি রক্তিম অগ্নিধার, ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায় লেখা থাকবে নাম, মানুষ জাগার সংগ্রামে তুমি অনির্বাণ ধাম।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি