নারী–শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি চায় ১৫৬ সংগঠন

প্রকাশিত: ৪:১৫ অপরাহ্ণ, মে ২৩, ২০২৬

নারী–শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি চায় ১৫৬ সংগঠন

Manual1 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৩ মে ২০২৬ : দেশে নারী ও শিশুর প্রতি বাড়তে থাকা সহিংসতা, ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে এসব ঘটনাকে ‘জাতীয় জরুরি ইস্যু’ হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছে নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা ১৫৬টি সংগঠন ও প্ল্যাটফর্ম।

একই সঙ্গে ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ (শূন্য সহনশীলতা) নীতি গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নেরও আহ্বান জানিয়েছে তারা।

আজ শনিবার (২৩ মে ২০২৬) দুপুরে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি তুলে ধরা হয়। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটসহ দেশের ৬৪ জেলার নারী ও শিশু অধিকারভিত্তিক ১৫৬টি সংগঠন ও প্ল্যাটফর্ম যৌথভাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।

সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যাসহ বেশ কয়েকটি ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করা, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক।

তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে।

জিনাত আরা হক বলেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, বাস্তবে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি। বিচার চলাকালে নির্যাতনের শিকার নারী, শিশু ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

Manual2 Ad Code

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন, স্বাধীন অভিযোগ গ্রহণব্যবস্থা চালু এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে হাইকোর্টের ২০০৯ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান জিনাত আরা হক।

Manual3 Ad Code

সাইবার সহিংসতা, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল ও ডিজিটাল যৌন হয়রানি ঠেকাতে বিশেষ সাইবার মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর দাবিও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। পাশাপাশি থানা পর্যায়ে নারী ও শিশুবান্ধব ডেস্ক আরও কার্যকর করা এবং অভিযোগ গ্রহণে হয়রানি বন্ধের আহ্বান জানানো হয়।

সংগঠনগুলোর দাবি, নারী ও শিশু নির্যাতন বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি সামাজিক নিরাপত্তা, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির গভীর সংকট। এ কারণে স্থানীয় সরকার, শিক্ষক, নারী সংগঠন, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে যুক্ত করে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

Manual5 Ad Code

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, নির্যাতনের তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রকাশে সমন্বিত জাতীয় ডেটাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত–দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কেন্দ্রীয় ট্র্যাকিং ডেটাবেজ তৈরির দাবি জানানো হয়।

সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১৫টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনায় ১৭৮ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৫০টি ছিল দলবদ্ধ ধর্ষণ। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে। একই সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে ১৯৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়; এর মধ্যে ১২৬টিতে মামলা হয়েছে। শিশু ধর্ষণের ঘটনা ছিল সবচেয়ে বেশি, ১১৮টি; ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ৪৬টি।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে বক্তব্য দেন নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করা ১০১ সহযোগী সংগঠন ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম।

তিনি বলেন, দেশে শিশু ধর্ষণ ও সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এবং বিচারহীনতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে। তাঁর মতে, অপরাধীরা শাস্তি এড়াতে পারবে বলেই এসব ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।

Manual7 Ad Code

শাহীন আনাম শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সরকারের কাছে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকরের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শুধু ঘোষণা নয়, কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে এমন নজির তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো ধর্ষক পার না পায়।

সাংবাদিকদের ধর্ষণ মামলা নিয়মিত অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ নয়, মামলার পরিণতি ও বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতিও সামনে আনা প্রয়োজন। সামাজিক দায়বদ্ধতা ও পাড়া-মহল্লাভিত্তিক শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন সেন্টার ফর ওমেন অ্যান্ড চিল্ড্রেন স্টাডিজের অধ্যাপক ইশরাত শামীম, প্রাগ্রসরের নির্বাহী পরিচালক ফওজিয়া খন্দকার এবং বিএনপিএসের পরিচালক শাহনাজ সুমি। এ ছাড়া কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় একটি মাদ্রাসায় নিপীড়নের শিকার এক শিশুর বাবা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে দ্রুত বিচার দাবি করেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ