প্রগতিশীল সমাজচেতনার বাতিঘর কামাল লোহানী: সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও মুক্তির এক অনন্য অভিযাত্রা

প্রকাশিত: ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ, জুন ২০, ২০২৬

প্রগতিশীল সমাজচেতনার বাতিঘর কামাল লোহানী: সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও মুক্তির এক অনন্য অভিযাত্রা

Manual2 Ad Code

সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁদের জীবন ও কর্ম একক কোনো পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি সময়ের প্রতীক, একটি জাতির বিবেক এবং একটি প্রজন্মের প্রেরণা। কামাল লোহানী তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবন সংগ্রাম, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা এবং মুক্তির রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য সমন্বয়। তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা শুধু একজন মানুষকে স্মরণ করি না; স্মরণ করি বাংলাদেশের প্রগতিশীল সমাজচেতনার এক উজ্জ্বল বাতিঘরকে।

২০২০ সালের ২০ জুন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু মৃত্যু তাঁকে থামাতে পারেনি। তাঁর চিন্তা, দর্শন, সাংস্কৃতিক সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজও বাংলাদেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের পথনির্দেশক হয়ে আছে।

ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু

কামাল লোহানীর রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার বীজ রোপিত হয়েছিল শৈশবেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং দেশভাগের মতো ঘটনাগুলো তাঁর কিশোর মনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ১৯৪৮ সালে পাবনায় ফিরে এসে পাবনা জিলা স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর তিনি ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা। ভাষার অধিকারের প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন শোষণ ও বৈষম্যের প্রকৃতি। বায়ান্নর একুশ, বাইশ ও তেইশ ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত দিনগুলো তাঁর রাজনৈতিক চেতনার ভিত নির্মাণ করে।

পরবর্তীকালে তিনি নিজেই বলেছেন, ভাষা আন্দোলন ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়।

কারাগার, সংগ্রাম ও আদর্শের পথে

পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হন। যুক্ত হন অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে। কলেজ নির্বাচন, ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রচারণা এবং গণআন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়।

১৯৫৩, ১৯৫৪ ও ১৯৫৫ সালে ধারাবাহিক গ্রেপ্তার ও কারাজীবন তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরও দৃঢ় করে তোলে। কারাগার তাঁর জন্য শাস্তির জায়গা নয়, বরং রাজনৈতিক শিক্ষার বিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছিল।

রাজশাহী কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর তিনি জীবনের অনিশ্চয়তাকে আলিঙ্গন করে ঢাকায় চলে আসেন। মাত্র পনেরো টাকা নিয়ে শুরু হয় তাঁর নতুন জীবনযুদ্ধ। এই সিদ্ধান্তই পরবর্তীকালে তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম

১৯৫৫ সালে দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা ঘটে। এরপর আজাদ, সংবাদ, পূর্বদেশ, বাংলার বাণী, বঙ্গবার্তা, জনপদ, বার্তাসহ বিভিন্ন পত্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

সাংবাদিকতা তাঁর কাছে পেশা ছিল না; ছিল সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। সংবাদপত্রকে তিনি শোষণ, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মাধ্যম হিসেবে দেখতেন।

ষাট ও সত্তরের দশকে সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে থেকে তিনি সাংবাদিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি কখনো ক্ষমতার কাছে মাথা নত করেননি। সামরিক শাসন, স্বৈরতন্ত্র কিংবা রাজনৈতিক চাপ—কোনোটিই তাঁর নীতিগত অবস্থানকে বদলাতে পারেনি।

সংস্কৃতি ছিল তাঁর মুক্তির রাজনীতি

কামাল লোহানীর জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হলো তাঁর সাংস্কৃতিক আন্দোলন। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক মুক্তি ছাড়া একটি জাতির প্রকৃত স্বাধীনতা সম্ভব নয়।

ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেন। পরবর্তীকালে নীতিগত কারণে ছায়ানট থেকে বেরিয়ে ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ক্রান্তি’ শিল্পী গোষ্ঠী।

তাঁর নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কখনো বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছিল শোষণ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা।

খাজা শাহাবুদ্দিন যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অবমাননা করে বক্তব্য দেন, তখন সামরিক শাসনের ভয় উপেক্ষা করে কামাল লোহানী প্রতিবাদের অগ্রভাগে দাঁড়ান। তাঁর উদ্যোগেই গড়ে ওঠে ‘সাংস্কৃতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা পরিষদ’। এই আন্দোলন বাঙালির সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে আরও সুসংহত করে।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলা বেতার

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কামাল লোহানীর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যা শুরু হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। আগরতলা হয়ে কলকাতায় গিয়ে যুক্ত হন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে।

স্বাধীন বাংলা বেতার ছিল মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। কামাল লোহানী সেখানে সংবাদ বিভাগ সংগঠিত করেন, সংবাদ পাঠ করেন, কথিকা লেখেন, আবৃত্তি করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গণমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বিজয়ের মুহূর্তে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বিজয়ের প্রথম বার্তাটি তাঁরই লেখা এবং তাঁরই কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অমূল্য অধ্যায়।

Manual1 Ad Code

স্বাধীনতার পরও আপসহীন

স্বাধীনতার পরও কামাল লোহানীর সংগ্রাম থেমে যায়নি। তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ না হয়ে রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ করার পক্ষে অবস্থান নেন।

১৯৭৫ সালে সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে জারি করা অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে তিনি অবস্থান নেন। বাকশালে যোগদানের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে মতপার্থক্য হলেও তিনি নিজের আদর্শিক অবস্থান থেকে কখনো সরে আসেননি।

তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতান্ত্রিক মানবিক মূল্যবোধ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা

কামাল লোহানী শুধু আন্দোলনের সংগঠক ছিলেন না; তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠান নির্মাতা।

বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, গণশিল্পী সংস্থা, একুশের চেতনা পরিষদ, স্বাধীন বাংলা বেতার পরিষদ, ব্রতচারী বাংলাদেশ, নব নাট্য সংঘসহ অসংখ্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

রাজশাহী আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবেও তিনি সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির সাংস্কৃতিক ভিত্তি যত শক্তিশালী হবে, তার গণতান্ত্রিক চেতনা তত সুদৃঢ় হবে।

লেখক, চিন্তক ও স্মৃতির ধারক

কামাল লোহানী ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ লেখকও। তাঁর বইগুলো বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের মূল্যবান দলিল।

আমাদের সংস্কৃতি ও সংগ্রাম, আমরা হারবো না, মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার, মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলা বেতার, এদেশ আমার গর্ব প্রভৃতি গ্রন্থে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা, বিশ্লেষণ ও আদর্শিক অবস্থান তুলে ধরেছেন।

তাঁর লেখনীতে ইতিহাস শুধু তথ্য নয়; হয়ে উঠেছে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা।

আজকের প্রেক্ষাপটে কামাল লোহানী

আজ যখন সমাজে সাম্প্রদায়িকতা, অসহিষ্ণুতা, বৈষম্য, ইতিহাস বিকৃতি এবং সংস্কৃতিবিরোধী প্রবণতা নানা রূপে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তখন কামাল লোহানীর জীবন ও কর্ম নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, সংস্কৃতি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি গণমানুষের মুক্তির সংগ্রামের অংশ। তিনি শিখিয়েছেন, সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ পরিবেশন নয়; এটি সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার নৈতিক দায়িত্ব। তিনি দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং সাংস্কৃতিক সংগ্রাম একে অপরের পরিপূরক।

কামাল লোহানীর জীবন ছিল প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং প্রগতির এক দীর্ঘ যাত্রা। তিনি ছিলেন বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক দৃঢ় প্রহরী। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অকুতোভয় সৈনিক। তিনি ছিলেন সংস্কৃতির মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নদ্রষ্টা।

প্রগতিশীল সমাজচেতনার বাতিঘর ও পথ প্রদর্শক কামাল লোহানীকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা—

“প্রগতির দীপশিখা”

লাল সালাম, কমরেড কামাল লোহানী।

যে মানুষটি ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন দৃপ্ত,
যে মানুষটি ইতিহাসের পাতায় আজও লিপ্ত,
যে মানুষটি উচ্চারণে জাগিয়েছেন জনপদ,
অন্যায়েরই অন্ধকারে তুলেছেন প্রতিবাদ—

তাঁকেই আজ স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধাভরে,
তাঁরই নামে জ্বালি প্রদীপ বাংলার অন্তরে।
মৃত্যু এসে থামাতে কি পারে সংগ্রামগান?
মানুষ বাঁচে মানুষেরই হৃদয়ে অবিরাম।

যমুনাপাড়ের মাটির ঘ্রাণ, নদীভাঙনের ক্ষত,
সেই শিশুটি দেখেছিল জীবনের কত শত।
খান সনতলার আকাশজোড়া ধানের সোনার ঢেউ,
সেইখান হতে উঠেছিল এক আলোর অভিযেউ।

মায়ের স্নেহ হারিয়েও সে থেমে যায়নি কভু,
দুঃখ তাকে ভাঙেনি, করেছে আরো প্রভু।
কলকাতার যুদ্ধদিনে সাইরেন-বিধ্বস্ত রাত,
শিশুচোখে দেখেছিল সে মৃত্যুর কালো ঘাট।

মন্বন্তরের হাহাকার আর দাঙ্গার বিষবাষ্প,
মানুষ কত নিষ্ঠুর হতে পারে—পেয়েছে স্পর্শ।
তাই তো পরে মানুষেরই মুক্তির পথে গিয়ে,
জীবনভর জেগে রইল শোষণের বিরুদ্ধে দিয়ে।

বায়ান্নর সেই ফেব্রুয়ারি, রক্তে ভেজা পথ,
বাংলা ভাষার দাবিতে যে জেগেছিল সমগ্র জাত।
পাবনার পথে কিশোর তখন মিছিলে দিল সুর,
বুকের ভেতর জন্ম নিল বিদ্রোহী এক নূর।

রাষ্ট্রভাষার অধিকারের লড়াই যখন জ্বলে,
কামাল তখন বুঝেছিল ইতিহাস কেমন চলে।
ভাষার সাথে জড়িয়ে আছে মানুষের সম্মান,
সেই বিশ্বাসই হয়ে উঠল তাঁর জীবনজ্ঞান।

এডওয়ার্ড কলেজ প্রাঙ্গণে তরুণদের সমাবেশ,
স্বপ্ন ছিল অসাম্প্রদায়িক নতুন দিনের পরিবেশ।
ছাত্র ইউনিয়নের পতাকা হাতে নিয়ে দৃপ্ত,
রাজপথ জুড়ে উচ্চারিত হলো প্রতিবাদলিপ্ত।

কারাগারের অন্ধকূপে কেটেছে কত কাল,
তবু তাঁর কণ্ঠে শোনা যায় মুক্তির জয়গান।
শৃঙ্খল কভু রুখতে পারেনি চেতনার গতি,
কারাবাসে শানিত হয়েছে সংগ্রামেরই স্মৃতি।

মাত্র পনেরো টাকা নিয়ে ঢাকামুখী পথ,
নিশ্চয়তার আশ্রয় ছেড়ে অনিশ্চিত রথ।
স্বপ্ন ছিল মানুষেরই মুক্ত সমাজ গড়া,
সেই কারণে দুঃখকেও নিয়েছিলেন ধরা।

মিল্লাত পত্রিকার পাতায় জ্বলে উঠল কলম,
শব্দ যেন আগুন হয়ে ছড়িয়ে দিল দম।
সাংবাদিকতা তাঁর কাছে পেশা ছিল না শুধু,
মানুষেরই অধিকার রক্ষার এক প্রভূত বোধ।

সংবাদ কক্ষে রাত জেগে লিখেছেন যে কথা,
তার প্রতিটি অক্ষরে ছিল জনগণের ব্যথা।
ক্ষমতারই মসনদ যখন সত্যকে করে ক্ষুণ্ন,
তখন তিনি উচ্চারণে হয়েছেন অবিচল ধ্রুব।

নৃত্যের মঞ্চ, গানের সুর, আবৃত্তির আয়োজন,
সংস্কৃতির ভেতর খুঁজেছেন মুক্তির অন্বেষণ।
মানুষ যদি সংস্কৃতিতে হারায় নিজের রূপ,
তবে স্বাধীনতার দাবিও হয় না পূর্ণসূত্র।

ছায়ানটের সংগঠক তিনি, ক্রান্তির পথিক,
গণসংগীতে জাগিয়েছেন সংগ্রামী সঙ্গীত।
“ধানের গুচ্ছে রক্ত জমেছে”—উচ্চারিত গান,
ক্ষেতখামারে প্রতিধ্বনি তোলে জনতার প্রাণ।

রবীন্দ্রনাথকে আঘাত যখন করেছিল অন্ধ শক্তি,
প্রতিরোধে জেগে উঠল তাঁর সাংস্কৃতিক ভক্তি।
সামরিকতার রুদ্ধদ্বার ভেঙে সাহস ভরে,
বাংলারই আত্মপরিচয় রক্ষা করলেন করে।

উনসত্তরের গণজাগরণ, উত্তাল রাজপথ,
স্বাধিকারের দাবিতে যখন জেগে ওঠে রথ,
সাংবাদিকের কলম হাতে ছিলেন তিনি সাথি,
শোষণমুক্ত ভবিষ্যতের আঁকছিলেন গাথা।

একাত্তরের অগ্নিবর্ষা, মার্চের কালরাত্রি,
পাক হানাদার নেমে এলো মৃত্যু হাতে মাতি।
তখন তিনি বুঝেছিলেন, সময় এসেছে আজ,
স্বাধীনতার পক্ষে নিতে হবে দৃপ্ত সাজ।

সীমান্ত পেরিয়ে আগরতলা, তারপর কলকাতা,
মুক্তিযুদ্ধের সংগীতে দিলেন প্রাণের ব্যথা।
স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র হলো তাঁর ঘর,
শব্দসৈনিক রূপে তিনি জ্বালালেন অগ্নিশিখর।

কখনো সংবাদ পাঠ করেছেন, কখনো কথিকা,
কখনো আবার কণ্ঠে তুলেছেন বিজয়ের বারতা।
বিদ্রোহীরই কবিতা পড়ে জাগিয়েছেন মন,
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি দিন ছিল তাঁর সাধন।

বিজয়ের সেই মহান দিনে ডিসেম্বরের আলো,
স্বাধীনতার প্রথম বার্তা কণ্ঠে উঠল ভালো।
বিশ্ববাসী শুনেছিল যে বাংলার জয়ধ্বনি,
সেই ইতিহাসে উজ্জ্বল নাম—কামাল লোহানী।

দেশ স্বাধীন, তবু শেষ কি মানুষের লড়াই?
শোষণ যদি থাকে বেঁচে, সংগ্রাম থামে নাই।
সেই কারণে স্বাধীনতার পরও নিরন্তর,
অন্যায়েরই বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি অগ্রসর।

সংবাদপত্র, শিল্পকলা, সংগঠন আর মঞ্চ,
সবখানেতে ছড়িয়ে দিলেন প্রগতিরই সঞ্চ।
সাংবাদিকের অধিকার আর সংস্কৃতির মান,
রক্ষায় তিনি এগিয়ে গেছেন নির্ভীক অবিরাম।

Manual6 Ad Code

বাকশালের সেই সংকটে যখন নত বহুজন,
তিনি তখন আপসহীন উচ্চারণে গড়েন মন।
ক্ষমতারই প্রলোভনকে করেননি স্বীকার,
নীতির কাছে রেখেছেন সব ব্যক্তিগত ভার।

স্যুট-কোটের নির্দেশ যখন এল সামরিক শাসন,
নিজের পোশাক, নিজের সত্তা করেননি বিসর্জন।
পাজামা আর পাঞ্জাবিতে বাংলারই পরিচয়,
সেই মর্যাদা রক্ষায় তিনি দেখিয়েছেন জয়।

বাংলাদেশের শিল্পকলায়, সংগীতে, নাটকে,
লোকজ ঐতিহ্য রক্ষায় ছিলেন নিবিড় মাতে।
উদীচীর পথ, গণশিল্পী, ব্রতচারীর গান,
তাঁরই হাতে পেয়েছে নতুন সংগ্রামের প্রাণ।

একুশের চেতনা নিয়ে এগিয়েছে যে পথ,
তাঁর পদধ্বনি মিশে আছে সেই অভিযাত্রার রথ।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিগাথা, ভাষা আন্দোলন,
তাঁর লেখাতে জীবন্ত হয়ে পায় নতুন জীবন।

“আমরা হারবো না”—বইয়ের পাতায় শুধু নয়,
তাঁর সমস্ত জীবনজুড়ে সেই উচ্চারণময়।
“মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার”—কথাটি ছিল সত্য,
কারণ তাঁর প্রতিটি দিন ছিল দেশপ্রেমে যুক্ত।

দীপ্তি লোহানী পাশে ছিলেন দীর্ঘ সংগ্রামপথে,
দুঃসময়ের সাথী হয়ে জীবনসুরের রথে।
সঙ্গিনী হারানোর পরে নিঃসঙ্গতার ক্ষণ,
তবু থামেনি মানুষেরই অধিকারের সাধন।

একুশে পদক এসেছে তাঁর অবদানের তরে,
অগণিত সম্মাননাও এসেছে ঘরে তাঁর।
কিন্তু সবচেয়ে বড় যে পুরস্কার পেয়েছেন,
জনতারই ভালোবাসায় অমরত্ব গড়েছেন।

করোনার সেই ভয়াল দিনে থেমে গেল শ্বাস,
কিন্তু থামল না তাঁর রেখে যাওয়া ইতিহাস।
বিশে জুনের সেই সকাল শুধু শোকের নয়,
সংগ্রামেরই শপথ নেবার আরেক নতুন সময়।

আজও যখন সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ায় পথে,
আজও যখন মিথ্যার বাজার সাজে রাষ্ট্ররথে,
আজও যখন সংস্কৃতিকে আঘাত করে ভয়,
কামাল লোহানী শেখান তখন—প্রতিরোধই জয়।

Manual6 Ad Code

আজও যখন শ্রমিক-কৃষক বঞ্চনারই শিকার,
আজও যখন বৈষম্যের দেয়াল অটল ভার,
তাঁর জীবনই পথের দিশা, জাগরণী ডাক,
মানুষ হবার সংগ্রামে দেয় নতুন আলোর ফাঁক।

হে শব্দসৈনিক, তোমার কাছে ঋণী বাংলাদেশ,
তোমার কণ্ঠে জেগেছিল যে মুক্তির পরিবেশ।
তোমার লেখা, তোমার স্বপ্ন, তোমার অগ্নিবাণ,
প্রজন্ম হতে প্রজন্মে দিক সংগ্রামের জ্ঞান।

তুমি ছিলে পথপ্রদর্শক, তুমি ছিলে দীপ,
অন্ধকারের বিরুদ্ধে এক নির্ভীক প্রতিচ্ছবি রূপ।
বাংলার মাঠে, বাংলার ঘাটে, বাংলার জনপদে,
তোমার নামই উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধার স্বরলিপিতে।

যতদিন এই বাংলাভাষা, যতদিন এ দেশ,
যতদিন মানুষ খুঁজবে মুক্তির পরিবেশ,
ততদিন তোমার কণ্ঠস্বর বাজবে অনিবার,
প্রগতিরই লাল পতাকায় থাকবে অম্লান ধার।

তাই আজ আবার উচ্চারণ করি অবিরাম—
সংগ্রামের পথিক তুমি, জনতারই নাম।
শোষণহীন মানবসমাজ গড়ার দৃপ্ত স্বপ্নে,
অমর হয়ে থাকো তুমি ইতিহাসের অন্তরে।

লাল সালাম, কমরেড কামাল লোহানী।
লাল সালাম, প্রগতির অগ্নিশিখা।
লাল সালাম, শব্দসৈনিক।
লাল সালাম, বাংলার এক অবিনাশী বিবেক।
—(প্রগতির দীপশিখা,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

উপসংহার

কামাল লোহানীর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ইতিহাসের বড় পরিবর্তন আসে দৃঢ় আদর্শ, সাংগঠনিক শক্তি এবং অবিচল মানবিক অঙ্গীকার থেকে। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই শোষণ, অন্যায় এবং পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে লড়েছেন। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, সাংবাদিকতার সংগ্রাম থেকে সাংস্কৃতিক আন্দোলন—সবখানেই তিনি ছিলেন সামনের সারির যোদ্ধা।

তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এই মহান সংগ্রামীকে। তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এখনও অসমাপ্ত। সেই সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়াই হবে তাঁর প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Manual3 Ad Code

লাল সালাম কমরেড কামাল লোহানী।
প্রগতিশীল সমাজচেতনার এই বাতিঘর যুগে যুগে পথ দেখাবেন।

#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট (ইংরেজি দৈনিক) ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯
Bikash number : +8801716599589 (personal)
২০ জুন ২০২৬#

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ