শিশু-কিশোরদের মিলনমেলায় শেষ হলো ‘দোলন বর্ষা আর্ট এক্সিবিশন’

প্রকাশিত: ৯:০০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬

শিশু-কিশোরদের মিলনমেলায় শেষ হলো ‘দোলন বর্ষা আর্ট এক্সিবিশন’

Manual5 Ad Code
  • দোলন বর্ষা আর্ট এক্সিবিশনের পুরস্কার গ্রহণ করছে সৈয়দ জাওয়াদ মোহাইমিন

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতা, শিল্পচর্চা ও প্রকৃতিপ্রেমকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে শিশু-কিশোরদের পত্রিকা দোলন আয়োজিত ‘দোলন বর্ষা আর্ট এক্সিবিশন–২০২৬’-এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সারাদেশের শিশু-কিশোরদের বর্ষা বিষয়ক চিত্রকর্ম নিয়ে আয়োজিত এ প্রদর্শনী শেষ হয়েছে শিশু-কিশোর শিল্পী, অভিভাবক, শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বিকেলে রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় প্রদর্শনীর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অংশ নেওয়া শিশু-কিশোরদের আঁকা ছবিতে উঠে এসেছে বাংলার বর্ষার বিচিত্র রূপ। বৃষ্টিভেজা পথ-ঘাট, নদী-নালা, নৌকা, কাশবন, সবুজ মাঠ, গ্রামবাংলার জীবন, জলমগ্ন প্রকৃতি এবং বর্ষার নানা অনুভূতি শিশুদের তুলিতে পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। তাদের সরল অথচ কল্পনাময় দৃষ্টিভঙ্গিতে চিরচেনা বর্ষা যেন নতুন করে ধরা দিয়েছে দর্শকদের সামনে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ চঞ্চল। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক মজিদ মাহমুদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের অধ্যাপক এ এ এম কাওসার হাসান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক (ডিজি) ও কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন।

অনুষ্ঠানে দোলন-এর সম্পাদক ও প্রকাশক কামাল মুস্তাফা শিশুদের শিল্পচর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘শিশুদের হাতে রং-তুলি তুলে দেওয়া মানে তাদের কল্পনা ও স্বপ্নকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।’ শিশু-কিশোরদের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চাকে এগিয়ে নিতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

Manual2 Ad Code

পুরস্কার ও সম্মাননা

সমাপনী অনুষ্ঠানে ‘দোলন বর্ষা আর্ট এক্সিবিশন–২০২৬’-এর নির্বাচিত ও বিজয়ী শিশু-কিশোর শিল্পীদের হাতে পুরস্কার, ক্রেস্ট ও সার্টিফিকেট তুলে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী সকল শিশু-কিশোর শিল্পীর জন্য ছিল সম্মাননা ও সার্টিফিকেট প্রদানের আয়োজন।

পুরস্কার ও সম্মাননা গ্রহণের সময় শিশুদের মধ্যে ছিল উচ্ছ্বাস ও আনন্দ। অভিভাবকরাও সন্তানদের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত ছিলেন। অনেকের হাতে ছিল নিজেদের আঁকা ছবির স্মৃতি, আবার অনেকেই নতুন করে শিল্পচর্চার অনুপ্রেরণা নিয়ে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।

পুরস্কার ও সম্মাননা গ্রহণের পর এক প্রতিক্রিয়ায় সৈয়দ জাওয়াদ মোহাইমিন বলেন, “আমি অনুপ্রাণিত ও আনন্দিত। সৃজনশীলতা, শিল্পচর্চায় এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকুক—সেই প্রত্যাশা রইলো। অংশগ্রহণকারী সকল শিশু কিশোরদের প্রতিও আমার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।”

‘বায়োস্কোপে বাংলার বর্ষা’

সমাপনী অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিশেষ আয়োজন ‘বায়োস্কোপে বাংলার বর্ষা’। প্রদর্শনীতে সেরা নির্বাচিত শিশু-কিশোরদের চিত্রকর্ম বায়োস্কোপের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয়।

প্রচলিত প্রদর্শনীর পাশাপাশি এমন ভিন্নধর্মী উপস্থাপনায় শিশুদের আঁকা ছবিগুলো যেন নতুন একটি গল্প বলার সুযোগ পায়। শিশুদের চোখে দেখা বাংলার বর্ষা, প্রকৃতি ও মানুষের জীবন বায়োস্কোপের দৃশ্যপটে উপস্থাপিত হলে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয় বিশেষ আগ্রহ। প্রযুক্তি ও লোকজ ঐতিহ্যের আবহে শিশুদের শিল্পকর্ম উপস্থাপনের এই উদ্যোগ প্রদর্শনীকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।

শিশুদের চোখে বাংলার বর্ষা

বাংলার সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রায় বর্ষার রয়েছে গভীর প্রভাব। বৃষ্টি যেমন কৃষি ও প্রকৃতির প্রাণসঞ্চার করে, তেমনি নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গেও বর্ষার সম্পর্ক নিবিড়। সেই বর্ষাকেই শিশু-কিশোরদের নিজস্ব কল্পনা ও অনুভূতির মধ্য দিয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রদর্শনীতে।

কোথাও বৃষ্টির পানিতে ভেসে যাওয়া গ্রামের পথ, কোথাও নদীতে পাল তোলা নৌকা, কোথাও সবুজে ঘেরা মাঠ—আবার কোনো ছবিতে দেখা গেছে বৃষ্টিতে ভেজা মানুষের দৈনন্দিন জীবন। শিশুদের আঁকা এসব ছবিতে বাস্তবতার পাশাপাশি ফুটে উঠেছে তাদের কল্পনার জগৎও।

আয়োজকদের মতে, শিশুদের চোখে দেখা প্রকৃতি অনেক সময় বড়দের চেনা বাস্তবতাকেও নতুনভাবে দেখার সুযোগ করে দেয়। ‘দোলন বর্ষা আর্ট এক্সিবিশন–২০২৬’ সেই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আনার একটি প্রয়াস।

Manual8 Ad Code

শিল্পচর্চায় নতুন প্রজন্মকে উৎসাহ

আয়োজকরা জানান, এই প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্য শুধু শিশুদের ছবি প্রদর্শন বা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা নয়; বরং নতুন প্রজন্মের মধ্যে শিল্পের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখানো এবং তাদের সৃজনশীল চিন্তাকে বিকশিত করার সুযোগ তৈরি করা।

শিশু-কিশোরদের হাতে যখন রং-তুলি তুলে দেওয়া হয়, তখন তারা শুধু একটি ছবি আঁকে না; বরং তাদের চারপাশের পৃথিবীকে নিজের মতো করে দেখার এবং প্রকাশ করার সুযোগ পায়। ফলে শিল্পচর্চা শিশুদের নান্দনিক বোধ, কল্পনাশক্তি, পর্যবেক্ষণক্ষমতা ও আত্মপ্রকাশের সক্ষমতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই বিবেচনায় শিশুদের জন্য নিয়মিত শিল্পচর্চার ক্ষেত্র তৈরি করা এবং তাদের কাজকে বৃহত্তর দর্শকের সামনে তুলে ধরা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Manual2 Ad Code

উৎসবমুখর সমাপনী

শিশু-কিশোর শিল্পী ও তাদের অভিভাবকদের উপস্থিতিতে সমাপনী অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় এক আনন্দঘন মিলনমেলায়। অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনাসহ ছিল নানা আয়োজন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি শিল্পী, সাহিত্যিক, অভিভাবক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের অংশগ্রহণে জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

শিশুদের নিজেদের আঁকা ছবি ঘিরে আলোচনা, পুরস্কার গ্রহণের আনন্দ এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা—সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতার উদযাপন।

প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া শিশু-কিশোরদের জন্য ছিল আরও একটি বিশেষ মুহূর্ত। অনুষ্ঠান শেষে তাদের আঁকা বাঁধাই করা চিত্রকর্মগুলো তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের স্মৃতি হিসেবে নিজেদের শিল্পকর্ম সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফেরে তারা।

শিল্পের মাধ্যমে প্রকৃতি ও বাংলাদেশের সঙ্গে পরিচয়

আয়োজকদের ভাষ্য, শিশুদের আঁকা ছবির মধ্য দিয়ে বাংলার বর্ষা, প্রকৃতি ও জীবনকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বইয়ের পাতায় বা পাঠ্যক্রমে বর্ষার যে পরিচয় শিশুরা পায়, রং-তুলির মাধ্যমে তা আরও অনুভবযোগ্য হয়ে ওঠে। প্রকৃতির সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক গভীর করার ক্ষেত্রেও এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতাকে বিকশিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সমাজেরও ভূমিকা রয়েছে। শিশুদের সৃষ্টিশীল কাজকে মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দেওয়া তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো কিছু করার অনুপ্রেরণা জোগায়।

Manual1 Ad Code

‘দোলন বর্ষা আর্ট এক্সিবিশন–২০২৬’ সেই লক্ষ্যেই একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ বলে মনে করছেন আয়োজকরা। ভবিষ্যতেও শিশু-কিশোরদের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চাকে এগিয়ে নিতে এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তারা।

শিশুদের তুলিতে আঁকা বর্ষার বাংলাদেশ তাই শুধু একটি শিল্পপ্রদর্শনীর বিষয় হয়ে থাকেনি; বরং এটি হয়ে উঠেছে নতুন প্রজন্মের কল্পনা, প্রকৃতিপ্রেম ও সৃজনশীলতার এক সম্মিলিত প্রকাশ। রাজধানীর জাতীয় চিত্রশালায় অনুষ্ঠিত এই শিল্প-উৎসবের মধ্য দিয়ে শিশু-কিশোরদের শিল্পভাবনাকে আরও বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচিত হয়েছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ