সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান আর নেই

প্রকাশিত: ৯:৫২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২১, ২০২৬

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান আর নেই

Manual6 Ad Code

বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা, ২১ জানুয়ারি ২০২৬ : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, বাংলাদেশের সাবেক মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (ক্যাগ) এবং সুশাসন আন্দোলনের অন্যতম অগ্রপথিক এম হাফিজ উদ্দিন খান আর নেই। আজ বুধবার (২১ জানুয়ারি ২০২৬) সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।

পারিবারিক সূত্র জানায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতায় ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও দুই কন্যাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।

এম হাফিজ উদ্দিন খানের সাবেক ব্যক্তিগত কর্মকর্তা শহীদুল হাসান তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বৃহস্পতিবার বাদ জোহর ঢাকার সিজিএ চত্বরের জামে মসজিদে মরহুমের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।

বর্ণাঢ্য কর্মজীবন

১৯৩৯ সালে সিরাজগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এম হাফিজ উদ্দিন খান। সততা, পেশাদারিত্ব ও প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য তিনি আজীবন পরিচিত ছিলেন। দীর্ঘ সরকারি কর্মজীবনে তিনি আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (ক্যাগ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় রাষ্ট্রীয় হিসাব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও নিরীক্ষা কার্যক্রম জোরদারে তিনি প্রশংসিত হন।
২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এম হাফিজ উদ্দিন খান। উপদেষ্টা পরিষদে তিনি অর্থ, পরিকল্পনা এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।
সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বেসিক ব্যাংক লিমিটেড ও রূপালী ব্যাংকের পরিচালক এবং অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

সুশাসন ও নাগরিক আন্দোলনে ভূমিকা

সরকারি দায়িত্বের বাইরে সুশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও এম হাফিজ উদ্দিন খান ছিলেন সক্রিয়। তিনি সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

শোক ও প্রতিক্রিয়া

এম হাফিজ উদ্দিন খানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বিসিএস অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অ্যাসোসিয়েশন। এক শোকবার্তায় সংগঠনটি জানায়, তাঁর মৃত্যুতে দেশ একজন সৎ, দক্ষ ও আদর্শবান প্রশাসককে হারাল।

Manual8 Ad Code

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পক্ষ থেকেও শোক প্রকাশ করা হয়েছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নূর আহমেদ বকুল এক যৌথ শোকবার্তায় মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

এ ছাড়া ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানও পৃথক শোকবার্তায় এম হাফিজ উদ্দিন খানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এম হাফিজ উদ্দিন খানের অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।”

শেষ বিদায়

একজন নির্লোভ, সৎ ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে এম হাফিজ উদ্দিন খান বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও নাগরিক সমাজে যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর মৃত্যুতে দেশ হারাল একজন অভিজ্ঞ অভিভাবক ও নৈতিক নেতৃত্বের প্রতীককে।

এম হাফিজ উদ্দিন খানকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা —

একজন সৎ মানুষের প্রস্থান

— সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

আজ নীরব হলো সততার কণ্ঠ,
শুদ্ধ হিসাবের দীপ নিভে যায়।
রাষ্ট্রের খাতায় অঙ্ক কষতেন
ন্যায়ের কলমে—ভুলের ঠাঁই নাই।

উত্তরার বুকে সন্ধ্যার আলো
ম্লান হয়ে এলো শীতল হাওয়ায়,
একজন মানুষ বিদায় নিলেন
দেশের বিবেক রইল শূন্যতায়।

ইন্না লিল্লাহি—শব্দে কাঁপে
সময়, সমাজ, স্মৃতির দেয়াল,
চলে গেলেন হাফিজ উদ্দিন খান
নীরবতায় রেখে গেলো প্রশ্নজাল।

সিরাজগঞ্জের মাটি জানে তাঁকে,
জানে যমুনার স্রোতধারা,
সাধারণ ঘরে জন্ম নিয়ে
অসাধারণ ছিলেন সারা।

Manual6 Ad Code

ক্ষমতা তাঁর গর্ব ছিল না,
পদ ছিল না অহংকার,
শুদ্ধতার পথে অবিচল পা
ছিল তাঁর একমাত্র আর।

হিসাবের খাতায় রাষ্ট্র যখন
অন্ধকারে হারায় দিশা,
তিনি জ্বালাতেন স্বচ্ছ প্রদীপ
নির্ভীক হাতে—নিষ্ঠা নিশা।

মহা নিরীক্ষক হয়ে বলেছিলেন
“টাকা মানে জনগণের ঘাম,”
রাষ্ট্রের প্রতিটি পয়সায়
ছিল তাঁর বিবেকের দাম।

ক্যাগের টেবিলে বসে তিনি
শুনতেন নীরব হিসাবের ভাষা,
অসংখ্য ফাইলে লুকানো থাকত
অন্যায়ের দীর্ঘ ইতিহাস।

কিন্তু তাঁর চোখ এড়ায়নি কিছু,
থাকেনি কোনো আপসের সুর,
স্বচ্ছতা ছিল তাঁর শপথ
জবাবদিহি ছিল মুকুর।

তত্ত্বাবধায়ক সময়ের দিনে
যখন অনিশ্চয়তার ছায়া,
তিনি ছিলেন স্থির বাতিঘর
অর্থনীতির দিগন্ত পায়।

পরিকল্পনা, অর্থ আর পাটে
ছিল দূরদর্শী মন,
সংযমী হাতে রাষ্ট্র চালানো
এমন মানুষ বিরল জন।

ব্যাংকের বোর্ডে, চেয়ারের আসনে
তিনি ছিলেন নির্লোভ প্রাণ,
লাভের চেয়ে ন্যায়ের হিসাব
ছিল তাঁর একমাত্র মান।

অগ্রণী, রূপালী, বেসিকের ঘরে
তিনি ছিলেন পাহারাদার,
লুটের চোখে বাধা হয়ে
দাঁড়িয়েছিলেন বারংবার।

Manual8 Ad Code

সরকার ছাড়িয়ে নাগরিক পথে
যখন হাঁটলেন দৃপ্ত পায়ে,
সুজনের কণ্ঠে উঠে এলো
সুশাসনের দৃঢ় ছায়া।

টিআইবির সভাঘরে বসে
তিনি বলতেন স্পষ্ট ভাষা,
“দুর্নীতি মানে রাষ্ট্রের ক্ষয়”—
এই ছিল তাঁর প্রত্যাশা।

তিনি ছিলেন না রাজনীতির
চটকদার কোনো মুখ,
তিনি ছিলেন নীরব সাধক
যাঁর শক্তি ছিল শুদ্ধ সুখ।

Manual5 Ad Code

কোনো পোস্টার, কোনো স্লোগান
তাঁকে করেনি বড়,
তাঁর জীবনই ছিল বার্তা
নীরবে বলা শত কথা ভর।

আজ বিসিএসের হিসাব ঘরে
নেমে আসে শোকের ছায়া,
অডিটের খাতায় এক নাম কমে
বাড়ে দীর্ঘ শূন্যতা।

ওয়ার্কার্স পার্টির কণ্ঠে শোনা
শ্রদ্ধার ভারী উচ্চারণ,
কারণ তিনি ছিলেন সেতু
নৈতিকতা আর রাষ্ট্রের বন্ধন।

জানাজার কাতারে দাঁড়াবে আজ
সাধারণ মানুষ, চেনা মুখ,
কারণ তিনি ছিলেন সবার
অদৃশ্য অভিভাবক সুখ।

কেউ বলবে—“তিনি সৎ ছিলেন,”
কেউ বলবে—“তিনি দৃঢ়,”
সবাই জানবে—এমন মানুষ
ইতিহাসে আসে খুব কম ক্ষীর।

আজ কবর নেবে দেহখানি
কিন্তু নেবে না আদর্শ,
কারণ তাঁর রেখে যাওয়া পথে
চলবে বহু প্রশ্নোত্তর দর্শ।

হাফিজ উদ্দিন—এই নাম মানে
শুদ্ধতার এক ব্যাকরণ,
রাষ্ট্রের খাতায় লেখা থাকবে
তাঁর জীবনের স্বর্ণ-চরণ।

যে দেশ আজো খোঁজে আলোর
অন্ধকার দীর্ঘ পথে,
সেই দেশ মনে রাখবে তাঁকে
নৈতিকতার প্রতিটি ক্ষণে।

ঘুমান আপনি শান্ত কবরে,
হে নির্লোভ রাষ্ট্রমানব,
আপনার জীবনের শিক্ষা হোক
ভবিষ্যতের দৃঢ় সম্বল সব।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ