স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে পারে না ৭৩% মানুষ

প্রকাশিত: ১২:৫৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৫, ২০২২

স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে পারে না ৭৩% মানুষ

Manual3 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাকা, ১৫ জুলাই ২০২২ : বাংলাদেশে একজন মানুষের দৈনিক স্বাস্থ্যকর খাবারের জন্য খরচ পড়ে প্রায় ২৭৬ টাকা। জনসংখ্যার ৭৩ শতাংশেরই এ টাকা খরচ করে স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। জাতিসংঘের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

Manual6 Ad Code

এ সপ্তাহের শুরুতে ‘বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি’ শীর্ষক এ প্রতিবেদন যৌথভাবে প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন সংস্থা (ইফাদ), ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। জাতিসংঘের সদস্য প্রায় সব দেশের তথ্য এ প্রতিবেদনে আছে।

স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে পারে না ৭৩% মানুষ
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে মোট জনসংখ্যার হারে স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্যের দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে নেপাল, তারপরই পাকিস্তানের অবস্থান। ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের কিছুটা ভালো। ভালো অবস্থানে আছে শ্রীলঙ্কা ও ভুটান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষুধা নির্মূল, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব ধরনের অপুষ্টি দূর করার চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। কোভিড-১৯ মহামারি বৈশ্বিক কৃষি খাদ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, ভঙ্গুরতা ও সমাজের বিরাজমান বৈষম্যকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে।

Manual5 Ad Code

এ মহামারি বৈশ্বিক ক্ষুধা ও খাদ্য অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। অনেক উন্নতির পরও শিশুদের অপুষ্টি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। মায়েদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে স্থূলতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

স্বাস্থ্যকর খাবারের একটি লম্বা বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। তাতে বিভিন্ন ধরনের তালিকা থেকে সুষমভাবে নানা খাদ্য নেওয়ার কথা যেমন বলা হয়েছে, তেমনি বিশুদ্ধ পানির কথাও বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিস্থিতি

জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার ওই প্রতিবেদনে দেশে খাদ্য অনিশ্চয়তায় থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৪-১৬ সময়কালে তীব্র থেকে মাঝারি ধরনের খাদ্য অনিশ্চয়তায় ছিল ৫ কোটি ৪ লাখ মানুষ। তিন বছর পর ২০১৯-২১ সময়কালে একই ধরনের খাদ্য অনিশ্চয়তায় ছিল ৫ কোটি ২৩ লাখ মানুষ। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ এ অনিশ্চয়তায় ছিল।

এ হিসাবে ৬৮ শতাংশ মানুষের খাদ্য বিষয়ে অনিশ্চয়তা নেই। তবে তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ স্বাস্থ্যকর খাবার খায় না বা খেতে পারে না। পাঁচটি সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, ২০১৯ সালে স্বাস্থ্যকর খাবারের জন্য একজন মানুষের দৈনিক প্রয়োজন হতো ২৭২ টাকা ১৬ পয়সা।

ওই সময় দেশের ১১ কোটি ৯৮ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য ছিল না। ২০২০ সালে দৈনিক স্বাস্থ্যকর খাবারের জন্য খরচ বেড়ে হয় ২৭৫ টাকা ৭৬ পয়সা। কিন্তু দেশের ১২ কোটি ১১ লাখ মানুষের দৈনিক ওই পরিমাণ টাকা খরচ করার সামর্থ্য নেই। এই সামর্থ্যহীন মানুষ মোট জনসংখ্যার ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশ।

২০১২ সালে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৩৬ শতাংশের মধ্যে রক্তস্বল্পতা ছিল। ক্রমে এ হার কমে আসার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি।
খাদ্য অনিশ্চয়তায় থাকা এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে না পারার প্রভাব পড়ে স্বাস্থ্যে, বিশেষ করে পুষ্টি পরিস্থিতির ওপর। দেশের ১১ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। দেড় দশক আগে এ হার ছিল ১৪ দশমিক ২ শতাংশ।

প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১০ শতাংশ শিশু কৃশকায় অর্থাৎ এরা তীব্র অপুষ্টির শিকার। পাশাপাশি একই বয়সী ৩০ শতাংশ শিশু খর্বকায়, অর্থাৎ বয়সের তুলনায় এদের উচ্চতা কম। অন্যদিকে ২ শতাংশের বেশি শিশুর ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। বিভিন্ন সময়ের শিশু পুষ্টির যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, কৃশকায় ও খর্বকায় শিশুর হার দিন দিন কমছে, তবে অস্বাভাবিক বেশি ওজনের শিশুর হার বাড়ছে।

Manual3 Ad Code

বয়স্ক মানুষের মধ্যেও বেশি ওজনের প্রবণতা বাড়ছে। ২০১২ সালে অস্বাভাবিক ওজনের মানুষ ছিল মোট জনসংখ্যার ২ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়ায়।

নারীদের পুষ্টি পরিস্থিতির অবনতির কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ২০১২ সালে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৩৬ শতাংশের মধ্যে রক্তস্বল্পতা ছিল। ক্রমে এ হার কমে আসার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। ২০১৯ সালে একই বয়সী নারীদের ৩৭ শতাংশের এ সমস্যা ছিল।

জন্মের পর শুধু মায়ের দুধ খেলে শিশুর স্বাস্থ্য ভালো থাকে। ২০১২ সালে জন্মের প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ খাওয়া শিশুর সংখ্যা ছিল ১৯ লাখ। ২০২০ সালে সেই সংখ্যা কমে হয় ১৮ লাখ। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে দেখা গেছে।

বৈশ্বিক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপদ পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার পাওয়া প্রত্যেক মানুষের অধিকার। স্বাস্থ্যকর খাবার ও টেকসই কৃষি–খাদ্যব্যবস্থায় বিনিয়োগ করার অর্থ আগামী প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগ করা। এ কাজে জাতিসংঘের এ পাঁচ সংস্থা সরকারগুলোকে সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছে।

 

Manual2 Ad Code

এ ব্যাপারে এক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, সাপ্তাহিক নতুন কথার বিশেষ প্রতিনিধি, অারপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ অামিরুজ্জামান বলেন, “খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষিতে উন্নতি ও মাথাপিছু গড় আয় ইতোমধ্যে ২৮২৪ ডলারে উন্নীত হওয়া সত্ত্বেও দেশের জনসংখ্যার ৭৩ শতাংশেরই স্বাস্থ্যকর খাবারের জন্য দৈনিক ন্যূনতম প্রায় ২৭৬ টাকা খরচ করার সামর্থ্য না থাকাটা বিদ্যমান অার্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থায় চরম বৈষম্যের চিত্রই তীব্রভাবে প্রকাশ পেয়েছে; যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা রাষ্ট্র পরিচালনার ৪ মূলনীতির সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে প্রায় ৭১ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে, ৪১ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত খাবার কেনার ক্ষমতা হারিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়।
করোনাকালীন সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ১৭ হাজার নতুন কোটিপতি বেড়েছে বলে জানা যায়। বৈষম্য, শোষণ, বঞ্চনাহীন গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যকে সামনে রেখে ৩০ লক্ষ শহীদানের আত্মদানের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ৫১ বছর পার হলেও শোষণ, বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা অর্জন এখনো সম্ভব হয়ে উঠেনি। এখানে প্রতিনিয়ত বৈষম্যের পাহাড় তৈরী হচ্ছে।
স্বাস্থ্যকর খাবার ক্রয়ের সক্ষমতা সহ সামগ্রিকভাবে জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে, যেহেতু শোষণ-বঞ্চনা-অনুন্নয়ন তথা জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পর ‘৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ ও সশস্ত্র জনযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানমতে “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ” এবং যেহেতু “প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র” (অনুচ্ছেদ ১১), সেহেতু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থনীতি হতে হবে জনগণতান্ত্রিক।”

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, দেশের কৃষিতে উন্নতি হয়েছে ঠিকই। কিন্তু অনেক কৃষক প্রধান খাদ্য উৎপাদনের চেয়ে অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
এ ছাড়া প্রতিবছর প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি কৃষি খাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। পাশাপাশি করোনা মহামারি এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে খাদ্য আমদানির ওপরও প্রভাব পড়েছে। এসব কিছুর সম্মিলিত প্রভাব পড়ছে খাদ্যনিরাপত্তা তথা পুষ্টির ওপর।

এ ব্যাপারে জাতীয় পুষ্টিসেবা কর্মসূচির বিষয়ভিত্তিক পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে পুষ্টির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। করোনা মহামারি বৈশ্বিকভাবে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ইউক্রেন-রুশ যুদ্ধ এ পরিস্থিতিকে আরও খারাপ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে।’

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ