কাজী রাশেদ |
নির্বাসিত কবি, লেখক, উপন্যাসিক, স্পষ্টবাদী ও সত্য বলার নির্ভীক সৈনিক তাসলিমা নাসরিন হঠাৎ করেই অসুস্থ্য হয়ে গেলেন। শুধু অসুস্থ্যই নন তার ভাষ্য মতে তিনি অচল হয়ে গেলেন। সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে তার সর্দির জন্য নাক কেটে ফেলার চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। আমার কাছে এই ঘটনাটি একেবারে অপ্রত্যাশিত এবং ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে মনে হয়েছে। মৌলবাদ বিরোধী, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিপক্ষে অবস্থান এবং নারীর বিভিন্ন যৌক্তিক দাবী দাওয়া নিয়ে সোচ্চার এই সব্বসাচী লেখক ভারত বাংলাদেশের বিদ্যমান সকল ক্ষমতাসীন আর ক্ষমতালোভী দলগুলোর চক্ষুসুলে পরিনত হয়েছিলেন। আর তাই আমাদের আরেক সব্বসাচী লেখক প্রিয় স্যার অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে যেভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে ঠিক তেমনি ভাবে তাসলিমা নাসরিনকেও পংগু করে দিয়ে আস্তে আস্তে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে।
এখানে তাসলিমা নাসরিন এর পোস্ট থেকে কিছু অংশ তুলে ধরলাম প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য।
সেই আমি জানুয়ারির ১৩ তারিখে হাসপাতালে গেলাম হাঁটুর লিগামেন্টে কিছু হয়েছে কিনা দেখতে, পরদিন দুপুরেই আমার শরীরের হিপ জয়েন্ট আর ফিমার কেটে বাদ দিয়ে দেওয়া হলো। আমি ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই ঘটিয়ে দেওয়া হলো দুর্ঘটনাটি । দুর্ঘটনাটি ঘটলো এপোলো হাসপাতালের অপারেশান থিয়েটারে। যে ডাক্তার আমাকে হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে যাওয়ার পরই থাবা দিয়ে ধরেছিলেন তিনি জিতেন্দার খারবান্ডা। অন্য কিছুর নয়, তিনি হিপ এবং হাঁটু রিপ্লেসমেন্টেরই ডাক্তার। হাঁটুতে ব্যথার কথা বলেছি ডাক্তারের কাছে, তিনি কোনও রকম পরীক্ষা করলেন না হাঁটু ছাড়াও অন্য কোথাও ব্যথা আছে কি না দেখার জন্য। পা এদিক ওদিক নাড়িয়ে দেখলেন না। দাঁড় করিয়ে দেখলেন না, হাঁটিয়ে দেখলেন না। তিনি বরং এক্সরে করতে পাঠালেন, এক্সরের পর সিটি স্ক্যান করতে পাঠালেন। ওসব হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বললেন আমার নেক ফিমার ফ্র্যাকচার হয়েছে। দুটো চিকিৎসার অপশান, ফিক্সেশান অথবা রিপ্লেসমেন্ট। আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই ফিক্সেশান ছাড়া অন্য কিছুতে রাজি নই। তিনি বললেন, আমার ওজন কম, সুতরাং ফিক্সেশান ভালো কাজ করবে। এও বললেন, ফিক্সেশান আশি ভাগ কাজ করে, কুড়ি ভাগ করে না। যদিও তিনি বিস্তর ভালো কথা বললেন রিপ্লেসমেন্টের পক্ষে, আমি কান দিলাম না। ফিক্সেশান করবেন বলে আমাকে ভর্তি করালেন। কিন্তু পরদিন সকালেই আমার মাথা খারাপ করে দেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে এলেন। কী, তিনি ফিক্সেশান করবেন না, হিপ রিপ্লেসমেন্ট ছাড়া আর কিছু করবেন না। বললেন হাড়গুলো সরে গেছে, ডিসলোকেশান হয়ে গেছে, ডিসপ্লেসড হয়ে গেছে, রিপ্লেসমেন্ট ছাড়া অন্য কিছু সম্ভব নয়। বললাম আমি সেকেন্ড অপিনিয়ন নেবো। তিনি বললেন তিনি নাকি তাঁর লোকদের কাছ থেকে সেকেন্ড থার্ড ইত্যাদি অপিনিয়ন নিয়েছেন। সবাই নাকি ওই রিপ্লেসমেন্ট করতেই বলেছেন। আমি বললাম আমি সময় চাই। তিনি বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, কাল তিনি হাসপাতালে আসবেন না। তাহলে পরশু? পরশু পর্যন্ত ফেলে রাখলে আপনার ক্ষতি হবে, সফট টিস্যু ড্যামেজ ইত্যাদি। প্যানিক সিচুয়েশান ক্রিয়েট করা হয়ে গেল। আমি প্রাণ বাঁচাতে এপোলোরই এক বাঙালি ডাক্তারকে ফোন করলাম। তিনি তো খারবান্দাকে ভগবান মানেন। আমাকে চোখ বুজে তিনি খারবান্দার উপদেশ মেনে নিতে বললেন আর হিপ রিপ্লেসমেন্টের গুণগান গাইতে লাগলেন। তাঁর এমন হলে নাকি তিনি এটাই করতেন, তাঁর ফ্যামিলির সবাইকে করাতেন। এই রিপ্লেসমেন্টের মতো ভালো জিনিস নাকি আর হয় না। অপারেশানের পরদিনই নাকি আমি হেঁটে বাড়ি ফিরবো। ওঁদের কথায় মনে হলো মানুষের নিজের হাড়ের চেয়ে ওই রিপ্লেসমেন্টের মেটালগুলো বেটার। তাড়া দিলেন, অপারেশান থিয়েটার রেডি। হ্যাঁ রেডি তো ছিল ফিক্সেশানের জন্য, কিন্তু রিপ্লেসমেন্টের জন্য এত জলদিবাজি কেন? কেন সময় দেওয়া হবে না আমাকে, কেন আমাকে আমার মতো করে এই হাসপাতালের বাইরে কোনও ডাক্তারের সঙ্গে আমাকে কথা বলতে দেওয়া হবে না? কেন আমিই বা দেখতে চাইছি না এক্সরে বা সিটি স্ক্যান? জীবন বদলে দেওয়া ভয়ংকর এক অপারেশান করার আগে কেন ওঁরাই বা আমাকে দেখাচ্ছেন না এক্সরে তে কী ভুল ওঁরা পেয়েছেন। খারবান্দা আর মুখার্জি আমাকে বোধবুদ্ধিহীন জড়বস্তু বানিয়ে ফেলেলেন। ধর্মান্ধরা যেমন ইমাজিনারি সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বাস করে, ঠিক তেমনই অন্ধের মতো আমি ওঁদের বিশ্বাস করলাম।
আমার টনক নড়লো ”জীবন” হারানোর তিন দিন পর। আমি হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারলাম ওই হিপ রিপ্লেসমেন্ট আমার জন্য নয়। যারা জয়েন্টের অসহ্য ব্যথায় ভোগে, কোনও ব্যথার ওষুধই আর ব্যথা কমাতে পারে না, জয়েন্ট যাদের জমে গেছে, জয়েন্টে ক্যানসার হয়েছে, টিউমার হয়েছে, রিউমাটয়েড বা অস্টিও আর্থ্রাইটিস ভুগতে ভুগতে যারা চলৎশক্তিহীন হয়ে গেছে, বয়স আশির ওপর, তাদের এই রিপ্লেসমেন্ট দেওয়া হয়, যেন অল্প যে কদিন বাঁচে, সে কদিন সামান্য হাঁটা চলা করে বাঁচতে পারে।
না, আমি তখনও এক্সরে দেখিনি, যে এক্সরের ওপর ভিত্তি করে, আমার হিপ জয়েন্টে কোনও ব্যথা না থাকলেও, কোনও অসুখ না থাকলেও, হিপ রিপ্লেসের মতো একটা ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দেওয়া হল।
এক্সরে দেখেছি অপারেশানের ৫ দিন পর। দেখে আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারি নি, রিপোর্টে লেখা, পুরোনো কোনো ফ্র্যাকচার ছিল, যেটা জোড়া লেগে গেছে।
খারবান্দাকে এরপর আমি বলেই ফেললাম, আপনি তো জঘন্য একটা ক্রাইম করেছেন। কমপ্লিট নেক ফিমার ফ্র্যাকচার, ডিসলোকেশান, ডিসপ্লেস্মেন্ট ইত্যাদি হয়েছে বলে আমাকে ভয় দেখিয়ে, চাপ দিয়ে হিপ রিপ্লেসমেণ্টের মতো অপারেশান করে নিলেন। জীবনটাই ধ্বংস করে দিলেন, আয়ু কমিয়ে দিলেন, নব্বই বছর বয়সীদের জীবন দিয়ে দিলেন। চমৎকার মিথ্যে বললেন তিনি, আমাকে নাকি অনেক অপশান দিয়েছিলেন, আমি নাকি হিপ রিপ্লেসমেন্ট ছাড়া অন্য কোনও অপশান নিইনি। বললাম, আমার তো ফিমারে কোনও ফ্র্যাকচার ছিল না, আমি তো এক্সরে দেখেছি। রিপোর্টও দেখেছি। তিনি এপোলোর ডিরেক্টরকে নিয়ে এসে বললেন, ওই রিপোর্টে নাকি টেকনিক্যাল ত্রুটি আছে। সিনিয়ার রেডিওলজিস্টের রিপোর্টে টেকনিক্যাল ত্রুটি!!
পরদিন আমি ডিসচার্জ নিয়ে নিলাম এই বলে, যে, আপনাদের হাসপাতালে আমি আর এক মুহূর্ত ভরসা পাচ্ছি না। বড্ড বিপজ্জনক জায়গা। ডিসচার্জ দিন। ডিসচার্জে যে সামারি লিখে দিয়েছেন, তা বাড়ি গিয়ে পড়ে আমি কেঁপে উঠলাম। সামারিতে আমার হাঁটুর ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার কথা না লিখে লিখে দিয়েছে আমি নাকি হিপ জয়েন্টের ব্যথায় চিৎকার করে কেঁদেছি, আমাকে নাকি নানাভাবে পা নাড়িয়ে, পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে, আমি নাকি চেঁচিয়ে হাসপাতাল মাথায় করেছি। আমাকে নাকি নানা অপশান দেওয়া হয়েছিল, আমি নাকি ওই রিপ্লেসমেন্টই বেছে নিয়েছি। তারপর এক্সরের নতুন একখানা রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে জুনিয়র কোনও রেডিওলজিস্টকে দিয়ে লিখিয়ে। আমার মনে হলো যারা তাদের অপারেশানের পক্ষে এমন সুন্দর বানানো কাহিনী লিখে দিতে পারে, এই ডিজিটালের যুগে তাদের পক্ষে ফেক এক্সরে আর ফেক সিটি স্ক্যান দিতেও তো কোনও অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।
মানুষকে বিশ্বাস করে আমি চিরকালই ঠকেছি। এবারের ঠকাটি বিশাল, শরীরের ওপর দিয়ে গেল। আয়ু ছিনিয়ে নিয়ে গেল।
বাড়ি ফিরে অন্য হাসপাতালের একজন রেডিওলজিস্টকে আর একজন নামী অর্থোপেডিক সার্জনকে দেখালাম এক্সরে প্লেট আর সিটি স্ক্যান। এসব প্লেট আদৌ আমার, নাকি ফেক কে জানে। তারপরও দেখালাম। ফেক হলেও, ওঁরা জানালেন, এক্সরেতে কোনও কমপ্লিট নেক ফিমার ফ্র্যাকচার নেই, কোনও ডিসপ্লেসমেন্ট নেই, কোনও ডিসলোকেশান নেই। তবে ইম্প্যাক্টেড ফ্র্যাকচার একখানা দেখা যাচ্ছে এক্সরেতে। হাঁটুতে জোরে লেগেছে, ওতে ফিমারের মাথায় চাপ পড়েছে কিছু। ওরকম ফ্র্যাকচারের চিকিৎসা হলো কিছুদিন বেড রেস্ট অথবা কিছুদিন বেড রেস্ট আর ফিজিওথেরাপি। আহ! আমি যদি বাড়িতেই রেস্ট নিতাম, হাসপাতালে না যেতাম সে রাতে। তাহলে তো বেঁচে যেতাম।
এত কঞ্জারভেটিভ ট্রিট্মেন্ট বাদ দিয়ে কেউ যায় অমন রিপ্লেসমেন্টে? যায় না। ধরা যাক আমার সত্যিকার কোনও ফ্র্যাকচার হয়েছে, তারপরও তো ট্রিট্মেন্ট হিপ রিপ্লেসমেন্ট নয়। যদি ফার্স্ট লাইন অফ ট্রিট্মেন্ট কাজ না করতো, যদি সেকেন্ড লাইন অফ ট্রিট্মেন্ট কাজ না করতো, যদি থার্ড, ফোর্থ, ফিফথ লাইন অফ ট্রিটমেন্ট কাজ না করতো, তারপর যদি অগত্যা একদিন ওই ভয়ংকর রিপ্লেসমেন্ট করা হতো, স্বস্তি পেতাম। যদি কোনও সড়ক দুর্ঘটনায় আমার হাড়গোড় গুঁড়ো হয়ে যেত, বুঝতাম আমার ঠিক ট্রিট্মেন্ট হয়েছে। যদি আমার জয়েন্টে কোনও দুরারোগ্য রোগ থাকতো, বুঝতাম। কিন্তু ঘটনা তো তা নয়।
নিজের শরীরের অত্যন্ত জরুরি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ হারানোর দুঃখ কি আমার কোনওদিন যাবে? কোনওদিন যাবে না। শুনেছি প্রাইভেট হাসপাতালগুলোয় টার্গেট মার্কেটিং চলে। হাসপাতালের মালিক সার্জনদের বলে দেন, এতগুলো সার্জারি চাই। এতগুলো সার্জারি তখন তাদের যে করেই হোক করতে হয়। আমার মতো বোকা যদি মিলে যায়, যার দরকার না থাকলেও যাকে শুধু আরও খানিকটা বোকা বানিয়ে সার্জারি করে নেওয়া যায়।, তাহলে টার্গেট পুরণে সুবিধে হয়। অথবা এ বাংলাদেশি আনকুথ, টের পেলে মামলা টামলা নিশ্চয়ই করবে না, একে অনায়াসে শুইয়ে দেওয়া যায়। আমি যে লেখক এবং ডাক্তার, সেই পরিচয় কি সার্জন জানতেন? যতটুকু জেনেছি, জানতেন না। আমাকে যেহেতু নাম শুনলেই সাধারণত ডাক্তাররা চেনেন, তাই ভেবেছিলাম তিনি হয়তো জানতেন আমি কে। নিজ থেকে নিজের পরিচয় দেওয়ার অভ্যেস তো আমার আবার কোনওকালেই নেই।
এখন অনাকাঙ্ক্ষিত, অনাহুত যে জিনিসটি আমার হাড়ের জায়গায় অবস্থান করছে তার কাজ কী? তার কাজ আমাকে বদার করা। ইনফেকশান করা, নড়ে যাওয়া, সরে যাওয়া, ঢিলে হয়ে যাওয়া, ক্ষয় হয়ে যাওয়া, ভেঙে যাওয়া, মরে যাওয়া। ওটির সঙ্গে আমার প্রাণভোমরাও যুক্ত। দ্বিতীয়বার কোনও রিপ্লেসমেন্ট কাজ করে না।
ওইযে শুরুতে বলেছিলাম, আমার পরিবারের লোকদের আয়ু ষাটের কাছাকাছি। আমরা বেশির ভাগই সত্তর পর্যন্ত যেতে পারিনি। আমারও সময় ঘনিয়ে এসেছে। এই ইমপ্ল্যান্টই আজরাইল হয়ে আমার আয়ু কেড়ে নিতে এসেছে। সবই জিনের ইচ্ছে। আমার ডায়বেটিস না থাকা, ব্লাড প্রেশার না থাকা, ফাইব্রোসিস না থাকা, চমৎকার ফিট শরীর নিয়েও ফাঁদে পড়ে গেলাম। অনেকটা গ্রীক নাটকের মতো। সর্বশক্তিমান জিন ভবিষ্যতবাণী করে দিয়েছিল, এ ষাটের কাছাকাছি পর্যন্ত বাঁচবে। এই বাণীর বিরুদ্ধে নানা রকম যুদ্ধ করে দেখা গেল, জিনের বাণীই সত্য প্রমাণিত হয় শেষে।
সময় বেশি নেই বুঝতে পারছি। সে কারণেই হাতে অল্প যেটুকু সময় আছে, তার সদ্ব্যবহার করার জন্য আমি এখন একশ ভাগ প্রস্তুত। যতদিন মাথা কাজ করবে, লিখবো । একশ রকম অকাজ অনেক করেছি, আর নয়।
প্রিয় তাসলিমা নাসরিন এর সুস্থ্যতা কামনা করি। আপনার কলম যেনো না থামে এইটুকু আস্থা রেখে শেষ করছি।।
Post Views:
১,৩২৫