বরেণ্য রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী পাপিয়া সারোয়ারের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১২, ২০২৫

বরেণ্য রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী পাপিয়া সারোয়ারের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Manual1 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ : একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী পাপিয়া সারোয়ারের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

২০২৪ সালের এই দিনে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। রেখে গেছেন স্বামী সারোয়ার আলম, দুই মেয়ে—জারা ও জিশা—এবং অসংখ্য শ্রোতাপ্রশংসক।

বাংলাদেশের রবীন্দ্রসংগীতের ভুবনে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এক উজ্জ্বল নাম ছিলেন পাপিয়া সারোয়ার। তাঁর ব্যতিক্রমী কণ্ঠশৈলী, সুরসংবেদন ও শিল্পীর মনন তাঁকে সংগীতাঙ্গনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। ‘না সজনী না’, ‘যেতে যেতে চায় না যেতে’, ‘ওহে সুন্দর মম গৃহে’, ‘যদি বারণ কর তবে গাহিব না’, ‘বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি’, ‘ওই মালতি লতা দোলে’—এমন অসংখ্য গান তাঁর অনন্য পরিবেশনায় শ্রোতার স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে আছে।

রবীন্দ্রসংগীতকে ঘিরেই তাঁর শিল্পযাত্রা সবচেয়ে উজ্জ্বল হলেও আধুনিক গানের ক্ষেত্রেও ছিল তাঁর সমান দক্ষতা। একসময় মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে তাঁর গাওয়া জনপ্রিয় আধুনিক গান—‘নাই টেলিফোন নাইরে পিওন, নাইরে টেলিগ্রাম’।

সংগীতচর্চা ও শিক্ষাজীবন

Manual3 Ad Code

১৯৫২ সালের ২১ নভেম্বর বরিশালে জন্ম নেওয়া পাপিয়া সারোয়ার ছোটবেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথের সংগীতে গভীর অনুরাগী ছিলেন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় ভর্তি হন ছায়ানটে। পরে সংগীতচর্চার জন্য বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতেও প্রশিক্ষণ নেন।

Manual5 Ad Code

১৯৬৭ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনে তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে নিয়মিত গান পরিবেশন শুরু করেন। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে তিনি শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রসংগীতে উচ্চশিক্ষা নিতে যান। বৃত্তি নিয়ে বিশ্বভারতীতে স্নাতক করার সুযোগ পাওয়া তিনিই ছিলেন প্রথম বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। সেখানে শান্তিদেব ঘোষ, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ও নীলিমা সেনের মতো কিংবদন্তি গুরুদের কাছে তালিম নেওয়া তাঁর শিল্পজীবনের অন্যতম অর্জন বলে বিবেচিত হয়। এর আগে তিনি ছায়ানটে ওয়াহিদুল হক, সঞ্জীদা খাতুন, জাহেদুর রহিম এবং বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে ধ্রুবতারা যোশীর কাছে সংগীতশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।

সংগঠক ও শিক্ষক পাপিয়া সারোয়ার

সংগীতচর্চার পাশাপাশি সংগঠন ও শিল্পশিক্ষায়ও তাঁর অবদান অনন্য। ১৯৯৬ সালে তিনি গঠন করেন ‘গীতসুধা’ নামের গানের দল, যা রবীন্দ্রসংগীতচর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পায়।

Manual7 Ad Code

এছাড়া তিনি দীর্ঘদিন জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। রবীন্দ্রসংগীতের সঠিক সাধনা ও প্রচারে তাঁর ভূমিকা ছিল জোরালো।

পুরস্কার ও সম্মাননা

বাংলা সংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য পাপিয়া সারোয়ার বহু সম্মাননা পেয়েছেন।

বাংলা একাডেমি রবীন্দ্র পুরস্কার—২০১৩,
বাংলা একাডেমির ফেলোশিপ—২০১৫,
একুশে পদক—২০২১,

শিল্পীর প্রথম অ্যালবাম ‘পাপিয়া সারোয়ার’ প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। সর্বশেষ অ্যালবাম ‘আকাশপানে হাত বাড়ালাম’ প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে।

ব্যক্তিজীবন

১৯৭৮ সালে সারোয়ার আলমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে জারা যুক্তরাষ্ট্রের ‘কলেজ অব নিউ জার্সি’-তে জীববিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক এবং ছোট মেয়ে জিশা কানাডার অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন নির্বাহী কর্মকর্তা।

শিল্পীর চলে যাওয়ায় শোকাহত সংগীতাঙ্গন

পাপিয়া সারোয়ারের মৃত্যুর পর গত এক বছরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিল্পীসমাজ এবং অসংখ্য ভক্ত-শ্রোতা নানা আয়োজনে তাঁকে স্মরণ করেছেন। রবীন্দ্রসংগীতের পরিশীলিত রূপায়ণ, নান্দনিক উপস্থাপনা এবং সুরমাধুর্যের যে ধারা তিনি রেখে গেছেন—তা আগামী প্রজন্মের জন্য হবে মূল্যবান সম্পদ।

আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে পরিবার, সহশিল্পী, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ভক্তদের একটাই আকুতি—পাপিয়া সারোয়ারের সুরধারা বয়ে যাক দীর্ঘদিন, নতুন শিল্পীরা তাঁর গানের আদর্শ ধারণ করুক।

 

Manual8 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ