কমরেড হাজেরা সুলতানা আর নেই

প্রকাশিত: ১১:১১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৫, ২০২৬

কমরেড হাজেরা সুলতানা আর নেই

Manual2 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ : বাংলাদেশের বামপন্থি রাজনীতি, নারী মুক্তি আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম কমরেড হাজেরা সুলতানা আর নেই।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য, বাংলাদেশ নারী মুক্তি সংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি, পার্টির রাজনৈতিক মুখপত্র সাপ্তাহিক নতুন কথা–এর সম্পাদক, সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড হাজেরা সুলতানা বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি ২০২৬) রাত ১০টায় ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

মৃত্যুকালে তিনি একমাত্র কন্যা রানা সুলতানা, জামাতা মনিরুজ্জামানসহ আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী, সহযোদ্ধা এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

আজীবন সংগ্রামের প্রতীক

কমরেড হাজেরা সুলতানা ছিলেন বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির এক নির্ভীক ও আপসহীন মুখ। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলন, নারী অধিকার ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং স্বাধীনতার পরও আজীবন সাম্য, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের আদর্শে অবিচল ছিলেন।

তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি জাতীয় সংসদে শ্রমজীবী মানুষ, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা রাখেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নারী মুক্তি সংসদের সভাপতি হিসেবে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা ও পিতৃতান্ত্রিক শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রণী সংগঠক।

সম্পাদক ও চিন্তাশীল রাজনীতিক

পার্টির রাজনৈতিক মুখপত্র সাপ্তাহিক নতুন কথা–এর সম্পাদক হিসেবে কমরেড হাজেরা সুলতানা প্রগতিশীল রাজনীতির তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর লেখনী ও সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি বামপন্থি রাজনীতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে স্পষ্ট ও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরতে সহায়ক হয়েছে।

ওয়ার্কার্স পার্টির শোক

কমরেড হাজেরা সুলতানার মৃত্যুতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নূর আহমেদ বকুল গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক যৌথ শোকবার্তায় তাঁরা বলেন, “কমরেড হাজেরা সুলতানা ছিলেন দলের পরীক্ষিত নেতা, জনগণের সংগ্রামের বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা ও নারী মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক। তাঁর মৃত্যুতে পার্টি এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হলো।”
নেতৃবৃন্দ শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানের শোক

কমরেড হাজেরা সুলতানার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান। তিনি শোকবার্তায় বলেন, “কমরেড হাজেরা সুলতানা ছিলেন সাহসী, সৎ ও আদর্শনিষ্ঠ এক বিপ্লবী নারী। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও মানবিক নেতৃত্ব আমাদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।”

Manual4 Ad Code

তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

শেষ বিদায়

কমরেড হাজেরা সুলতানার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নারী সংগঠন ও সামাজিক সংগঠন তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে।

সংগ্রামী এই নেত্রীর মৃত্যুতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। আদর্শ, সংগ্রাম ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে তিনি যে পথ দেখিয়ে গেছেন, সেটিই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
#

কমরেড হাজেরা সুলতানা

সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

আরেকটি দীপ নিভে গেল নীরব রাতে,
অন্ধকার ভারী হলো দেশের প্রান্তে।
ঢাকার আকাশ স্তব্ধ হয়ে কাঁদে আজ,
কমরেড হাজেরা আর নেই—হায় সমাজ!

যে নারী এসেছিলেন আগুন বুকে,
শোষণের শিকল ভাঙার দৃপ্ত ঝোঁকে,
ছাত্রাবস্থায় পথে নামা সেই কণ্ঠ,
আজ নিস্তব্ধ—তবু রেখে গেল মন্ত্র।

মুক্তির স্বপ্নে বোনা ছিল তার দিন,
রক্ত-মাটি-মানুষে গাঁথা ঋণ।
একাত্তরের রণাঙ্গনে যোদ্ধা তিনি,
নারী-পুরুষে ভেদ জানেনি চিনি।

গুলি আর ভয় করেনি কখনো পথ,
আপসহীন ছিল তার দৃঢ় শপথ।
রাষ্ট্র যখন পিছিয়েছিল বহুবার,
তিনি বলেছিলেন—মানুষই দরকার।

সংসদের মেঝেতে দাঁড়িয়ে নির্ভীক,
শ্রমিকের ভাষা করলেন তিনি ঠিক।
নারী, প্রান্তিক, কৃষক আর মজুর,
তাঁর কণ্ঠে পেতো দাবি, পেতো জোর।

নারী মুক্তি সংসদের অগ্রদূত,
পিতৃতন্ত্রে আঘাত ছিল অব্যাহত।
ঘরের শেকল ভাঙার যে লড়াই,
তার অগ্রভাগে ছিলেন তিনি তাই।

কলম ধরলে কম্পিত হতো সময়,
“নতুন কথা” হতো নতুন সংগ্রয়।
সম্পাদকীয়তে জ্বলে উঠতো প্রশ্ন,
কীভাবে গড়ব শোষণহীন স্বপ্ন?

Manual4 Ad Code

দলের ভেতর পরীক্ষিত সহযোদ্ধা,
বাইরে জনগণের নির্ভরতা।
নেতৃত্ব মানে সুবিধার আসন নয়,
তিনি শিখিয়েছেন—এ এক দায়।

আজ সেই কণ্ঠ থেমে গেল হঠাৎ,
রাত দশটায় স্তব্ধ হলো প্রতিবাদ।
হাসপাতালের দেয়াল জানে সেই ব্যথা,
দেশ হারালো এক সংগ্রামী নেতা।

Manual2 Ad Code

রানা আজ কন্যার চোখে নীরব জল,
সহযোদ্ধার বুকে ভারী শোকদল।
কিন্তু তুমি তো শুধু রক্তের নও,
তুমি আছো লড়াইয়ের প্রতিটি ছোঁয়াও।

ওয়ার্কার্স পার্টি আজ শোকে নত,
এক অপূরণীয় ক্ষতি স্বীকারত।
মানিক–বকুলের কণ্ঠে সেই কথা,
“এ শূন্যতা পূরণ হবে না ব্যথাহীনতা।”

রাজনীতি আজও কঠিন ও কুটিল,
মিথ্যার ভিড়ে সত্য বড়ই দুর্বল।
তবু তোমার রেখে যাওয়া পথচিহ্ন,
ভবিষ্যৎ যোদ্ধাদের দেবে দিশা চিরদিন।

তুমি নেই—এই কথা সত্য হলেও,
তুমি আছো সংগ্রামের প্রতিটি ঢেউয়ে।
লাল পতাকা যখন উঠবে আবার,
তোমার নামেই শপথ নেবে হাজার।

Manual7 Ad Code

হে কমরেড, বিদায় নয়—এ এক অঙ্গীকার,
তোমার অসমাপ্ত স্বপ্ন হবে আমাদের ভার।
মাটির গভীরে তুমি বিশ্রামে থাকো,
উপরের পৃথিবী লড়াই চালাক অবিরত।